‘বড়ো পুঁজি রাজনীতিকে এখন পকেটে পুরেছে। টাকা ছাড়া ভোট হয় না। টাকার জোরে ভোটবাক্স দখল করা হচ্ছে, যুবকদের গুন্ডায় পরিণত করা হচ্ছে। চেতনার বিকৃতি ঘটছে। ক্ষুদিরাম, কানাইলাল, সূর্য সেনেদের যুগে রাজনীতি করে নেওয়ার কোনো চিন্তা ছিল না। তখন রাজনীতি মানে ছিল দেশের সেবা। আমরা ছিলাম বিপ্লববাদী। বিপ্লব মানে মানুষের মধ্যে একটা জাগরণ সৃষ্টি করা। তখন যে জাগরণের কথা ভেবে কাজ করেছি তার ফল কী হয়েছে দেখুন। রাজনীতিকরা দেশটাকে লুটেপুটে খাচ্ছে।’
রেবা দাঁড়িয়ে পড়ে এধার-ওধার তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছে। কী ভেবে শ্রীমন্ত গাড়ি থেকে নেমে গেটের দিকে এগিয়ে গেল।
‘আরে রেবা!’
‘ফাংশান শুনতে এসেছি।’
‘দারুণ শাড়িটা আগে কখনো তো পরতে দেখিনি!’
‘তোলা থাকে, একখানাই তো।’
‘সাজলে তোমায় খুব সুন্দর দেখায়।’
‘আহহা, সেজেছি আবার কই। চুলটা একটু বেঁধেছি শুধু। মুখে ঠোঁটে কিছু কী দিয়েছি?’
‘না দিয়েই এই, দিলে যে কেমন দেখাত সেটা আর ভাবতে পারছি না।’
‘থাক আর ভাবতে হবে না…কত যে ভাবেন।’
পুলকে আনন্দে রেবার চোখ ঝকঝক করে উঠল। হঠাৎই কিশোরীর মতো কণ্ঠস্বর, শরীরের মোচড়, ঠোঁটের কুঁকড়ে যাওয়া দেখে শ্রীমন্তর মনে হল, মজাটা এই পর্যন্ত রাখাই ভালো। এত লোক এখান দিয়ে যাতায়াত করছে, তাদের সামনে বাড়ির সুশ্রী ঝিয়ের সঙ্গে দুটোর বেশি তিনটে কথা বললেই লোকে তাকাবে আর একটা অনুমান মাথায় ঢুকিয়ে ফেলবে।
‘দাদু বক্তৃতা দিচ্ছে, শোনো।’
‘ওমমা, আমাদের দাদু নাকি?’ রেবা লাউডস্পিকারের দিকে মুখ তুলল। শ্রীমন্ত ব্যস্ততা দেখিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল।
‘গাছেরও প্রাণ আছে, জগদীশ বসুর এই আবিষ্কারটা মিথ্যা নয়। অথচ এই গাছকে আমরা নিষ্ঠুর নির্মমভাবে হত্যা করি। পরের বাচ্চচাকে দেখলেও আমরা আদর করি, আমাদের মায়ামমতা উথলে ওঠে; পোষা পাখি বা বেড়াল কুকুরকেও কত যত্ন করি অথচ যে গাছ আজকের এই পরিবেশ দূষণ থেকে আমাদের অনেকখানি বাঁচাতে পারে কার্বন ডাইঅক্সাইড শুষে নিয়ে, বাতাসকে যে নির্মল করে, জমিকে উর্বর করে, মরুকে দূরে হঠিয়ে রাখে, আমাদের চোখকে জুড়িয়ে দেয় তার শোভা দিয়ে, আমাদের প্রাণের জন্য যে মায়ের মতো কাজ করে তার প্রতি আমরা, তার ছেলেরা খুনির মতো ব্যবহার করি। আমরা মাতৃঘাতী….মাফ করবেন আমি আর কিছু বলতে পারব না, শরীরটা কেমন যেন খারাপ লাগছে।’
পর্দা টেনে দেওয়া হয়েছে। সভাস্থলে হই-হট্টগোল চলছে। ধৈর্য ধরে দর্শকরা অপেক্ষা করছিল যেজন্য এবার সেই ফাংশন শুরু হবে। ছুটে গিয়েই পিছনের কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে শ্রীমন্ত মঞ্চে ঢুকে পড়ল। অকাদাদু সোফায় হেলান দিয়ে মিটমিট হাসছেন। পকেট থেকে একটা ওষুধের বড়ি বার করে তার মোড়কটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে বললেন, ‘একটু খাওয়ার জল।’
একজন ছুটে গেল জল আনতে। শ্রীমন্ত বলল, ‘ওষুধ খাচ্ছেন যে, আবার কোথায় ব্যথা হল?’
‘সেই ঘাড়ের ব্যথাটা আবার।’
‘এই মুঠো মুঠো বড়ি খাওয়াটা আপনার এক বাতিক হয়ে উঠেছে। নিজেই নিজের ডাক্তারি করাটা এবার বন্ধ করুন। এসব ওষুধ, কাগজে দেখেছেন তো বহু দেশেই ব্যানড করে দিয়েছে।’
‘এতক্ষণ কী বাজে কথাটাই না বললাম। পৃথিবীর দূষণ বন্ধ করা দরকার বলেই নিজেকে দূষিত করার ওষুধ খাচ্ছি। এই হচ্ছে বিপ্লবী!’ অক্ষয়ধন মিত্র হাত বাড়িয়ে জলের গ্লাস নিলেন।
এবার রিপোর্টার তিনজনকে পাঠাবার ব্যবস্থা করতে হয় আর অসীমা পাল যদি ওদের সঙ্গে যায় তো ভালোই। শ্রীমন্ত মঞ্চ থেকে নেমে প্রেস টেবলে এল।
‘কী ব্যাপার, গাড়ির ব্যবস্থা করতে গিয়ে আপনি তো মহাপ্রস্থানে চলে গেছলেন!’
‘কী করব, একখানাই গাড়ি। আর্টিস্ট আনতে গিয়ে এইমাত্র ফিরল, মাফ করে দেবেন, আসুন, একটু মিষ্টিমুখ করিয়েই পৌঁছে দেব।’
তিনজন উঠে ভিড় ঠেলে বেরিয়ে আসছে, অসীমা পাল বসেই রইল। নাচ-গান ম্যাজিক দেখার জন্যই বোধ হয়, তবু ভদ্রতা করে একবার জিজ্ঞাসা করা উচিত ভেবে শ্রীমন্ত বলল, ‘যাবেন না দেখবেন? অবশ্য গাড়ি আপনার জন্য থাকবে।’
‘আমি একটু অক্ষয়ধনবাবুকে মিট করতে চাই, কিছু প্রশ্ন আছে আর কিছু জানারও আছে।’
‘আমি মিট করিয়ে দেব, আপনি বসুন।’
মোটরে দু-মিনিটে ব্রজরাখালের বাড়ি। প্লেট ভরা রাধাবল্লভি, ফিশ-ফ্রাই আর মিষ্টি খেয়ে, দেড়শো টাকা দামের একটি বস্ত্রখণ্ডের প্যাকেট হাতে নিয়ে তিনজন গাড়িতে ওঠার পর শ্রীমন্ত হেঁটেই ফিরে আসছিল আর তখন ভাবছিল, দুটো প্যাকেট তো রয়ে গেছে, কিন্তু কোনো মেয়েকে প্যান্ট লেংথ উপহার দিলে সে কী তাকে উজবুগ বা এটাকে নিম্নস্তরের রসিকতা বলে ধরে নিতে পারে? বাড়িতে প্যান্ট পরার মতো পুরুষ নিশ্চয় আছে, তাদের কাউকে দিয়ে তো দিতে পারবে! তার থেকে বরং একটা শাড়ি যদি কিনে দিই তা হলে কেমন হয়?
ব্রজরাখালের নতুন আকাশি রঙের মারুতি শ্রীমন্তর পাশ দিয়েই বাড়ির দিকে চলে গেল। অকাদাদু পিছনের সিটে একা হেলান দিয়ে। আর একটু এগিয়ে শ্রীমন্ত দেখতে পেল অসীমা বাস-রাস্তার দিকে হেঁটে চলেছে। তার একটু পিছনে সত্য মিশ্র ও দুটি লোক।
‘এই যে শুনছেন, এই যে, একটু দাঁড়ান….অসীমা একটু দাঁড়ান।’
শ্রীমন্তর ডাকে অসীমাসহ সত্য মিশ্ররাও দাঁড়িয়ে পড়ল। সে হনহনিয়ে এগোল।
