‘আমি বক্তৃতা দেওয়ায় অভ্যস্ত নই তাই কথার খেই হারিয়ে ফেলি। আমি অন্য এক জেনারেশনের লোক তো, এখনকার লোকেদের চিন্তার সঙ্গে নিজেকে বহু ব্যাপারে মানাতে পারি না। আমার কাছে দেশের, দেশের মানুষের ভালোমন্দের চিন্তাটা অন্যভাবে দেখা দেয়।
‘আমার মনে হচ্ছে খুব বোকার মতো আমরা বাঁচার কাজগুলো করছি। ধরুন, সিগারেট খেলে ক্যানসার হতে পারে জেনেও ওই জিনিসটা ত্যাগ করছি না। বিয়েতে পণ বা যৌতুক নেওয়া অন্যায় জেনেও আমরা তা নিয়ে থাকি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সর্বনাশ হয় জেনেও দাঙ্গা করে যাচ্ছি। যথার্থ শিক্ষা দেওয়া হয়নি বলেই তো আমরা বোকামিগুলো করছি।
‘পরিবেশ দূষণ কথাটা আপনারা নিশ্চয় শুনেছেন বা পড়েছেন। আমাদেরই দোষে, আরাম-বিলাস পাওয়ার লোভে, টাকার লোভে আমরা এই পৃথিবীটার ক্ষতি করছি, একে দূষিত করছি নানান ধরনের রাসায়নিক আবর্জনা দিয়ে, ধোঁয়া দিয়ে। যার ফলে এর পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হতে শুরু করেছে। ব্রিটেন শীতকালেও গরম থাকছে, আল্পস পাহাড়ে তুষার কমে গেছে, সমুদ্র তেতে উঠছে, আফ্রিকায় খরার কারণও এজন্য। পৃথিবীর তাপ আধ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বেড়ে গেছে, চল্লিশ বছর পর এটা চার ডিগ্রিতে দাঁড়াবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন একশো বছর পর সমুদ্র চোদ্দো ফুট উঁচু হয়ে যেতে পারে। ভেবে দেখুন মানুষের ভবিষ্যতের কথা। সমুদ্র তিন ফুট উঁচু হলেই তিরিশ কোটি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে, বাংলাদেশের তিন ভাগের এক ভাগ জলের নীচে চলে যেতে পারে।’
শ্রীমন্ত বিভ্রান্ত বোধ করছে। রামরাখাল স্কুলের রজতজয়ন্তীতে অকাদাদু এসব কী আবোল-তাবোল বকতে শুরু করেছেন? ওঁর তো বন্ধু, ভগ্নীপতি, সহযোদ্ধা রামরাখালের স্মৃতিচারণ করার; তাঁর ছেলে, এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ব্রজরাখালের শিক্ষানুরাগের, দানশীলতার খুদিনগরের উন্নয়নের জন্য সতত চিন্তার-এই সব নিয়ে বলার কথা! অকাদাদুকে তো সে তাই শিখিয়ে পড়িয়ে এনেছে। পরিবেশ দূষণ নিয়ে কথা বলার জন্য কী ওঁকে মঞ্চে তোলা হয়েছে নাকি?
‘পৃথিবী যতই গরম হয়ে উঠবে, বৃষ্টিপাতের ধরনটাও বদলে যাবে, শস্য জন্মাবে না, তার ফলে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। এমন অবস্থার খুব দেরি নেই। পঞ্চাশ কী একশো বছর তো দেখতে-দেখতে কেটে যাবে। আমিই তো মনে হচ্ছে এই সেদিন জন্মালাম অথচ দেখছি নাতিনাতনিদের ছেলেপুলে হয়ে গেছে। তারা বড়ো হয়ে কেমন পৃথিবীতে বাস করবে সেটাই এখন আমাকে ভাবায়। ওদের নাতিপুতিরা নিশ্বাস নিতে কষ্ট পাবে, তাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, গরমে হাঁফাবে, তাদের ক্যানসার হবে, অন্ধ হয়ে যাবে, ফসল জন্মাবে না, সমুদ্রের জলে ভিটেমাটি ভেসে যাবে, সাইক্লোন-টাইফুন ঘনঘন আছড়ে পড়বে-এমন একটা পৃথিবী তাদের আমরা দিচ্ছি তার কারণ ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা ভাবি না, তার কারণ আমরা সেভাবে শিক্ষিত করিনি আমাদের চেতনাকে, তার কারণ এই পৃথিবীটাকে নষ্ট করেছি আমরাই আমাদের লোভের, অশিক্ষার পাপে। পৃথিবীকে সুস্থ, নির্মল, বাসযোগ্য করে তোলার দায় তাই আমাদেরই। এটাও তো একটা বিপ্লব।’
কথাগুলো শুনতে-শুনতে শ্রীমন্তর মনে হল, অকাদাদুর মাথায় যে এই সব ভাবনা ঘুরছে তার বিন্দুবিসর্গও সে জানত না। অথচ প্রায় পাশাপাশি ঘরেই তারা থেকেছে। মামার বাড়ি আর দর্জিপাড়ায় পৈতৃক বাড়ি, দু জায়গাতেই ইদানীং, যখন যেমন দরকার সেইমতো সে বাস করছে। এখন সে খুদিনগরে রয়েছে গত তিন সপ্তাহ যাবৎ। ব্রজমামার ইলেকশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত এখান থেকে তার নড়া চলবে না। অকাদাদুর সঙ্গে তার খোলাখুলি বন্ধুর মতোই কথাবার্তা হয় অথচ পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বুড়ো যে এত ভাবে, সেটা তাকে একবারও জানায়নি। আশ্চর্য, বিপ্লবীর ট্রেনিং একেই বলে!
‘কোনো দেশে ভূমিকম্প হলে কী বন্যা হলে বা গৃহযুদ্ধ হলে আর্ত, নিরাশ্রয়, অভুক্তদের সাহায্যের জন্য সারা পৃথিবী সাহায্যের হাত বাড়ায়। এখন সারা পৃথিবী বিপন্ন, এখন আমাদের এই খুদিনগরের ঘাড়েও দায় চেপেছে পৃথিবী রক্ষায় সাহায্য করার। মনে রাখবেন খুদিনগরও রক্ষা পাবে না যদি পৃথিবী না বাঁচে। পরমাণু যুদ্ধের ভয় থেকে বেরিয়ে এসে এখন কিন্তু তার থেকেও হাজার গুণ বড়ো ভয়ের মধ্যে এবার আমরা ঢুকে গেছি।
‘আপনারা বলবেন একটা স্কুলের রজতজয়ন্তীতে এসব কথা কেন বলছি। কারণ, আমার কথা শোনানোর জন্য নানান বয়সের এতগুলো লোক আমি আর জীবনে কখনো পাব না। ব্রজরাখাল আমার সম্পর্কে প্রচুর ভালো-ভালো কথা বলল। বেশ লাগছিল শুনতে। বলল, আমার মস্তিষ্ক সতেজ ও সুস্থ রয়েছে এই বয়সেও। আরও বলল, আমার বিপ্লবী চেতনাকে নাকি বিনাশ করা যায়নি। কেন যে বলল তা আমি জানি না। তবে কথাগুলো এক অর্থে ঠিকই। আমার মস্তিষ্ক আর চেতনা ঠিকঠাক কাজ করে বলেই আমি রাজনীতি থেকে দূরে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পেরেছি। এখন কোনো ভদ্রলোক রাজনীতি করে না। এখন রাজনীতি করা মানেই ক্ষমতা দখলের লড়াই। রাজনীতি এখন ব্যাবসা।’
শ্রীমন্ত সভয়ে লাউডস্পিকারের দিকে তাকাল। ব্রজমামার মুখটা এখন যদি ওই চোঙার মধ্য দিয়ে দেখা যায়। তার চোখ পড়ল স্কুল ফটকে। ছাপা শাড়ি পরা রেবা, চটি ফটফটিয়ে ব্যস্ত পায়ে ভিতরে ঢুকছে। বছর ত্রিশের এই বিধবা, এক ছেলের মা, ব্রজরাখালের বাড়িতে ঠিকে কাজ করে। মালিপুকুরের নেতাজিপল্লিতে থাকে। মিষ্টি মুখ, সুডৌল স্বাস্থ্য, মাজা গায়ের রং। অকাদাদুর ঘরে সাদাকালো টিভি আছে। রেবা তার নিয়মিত দর্শক, বিশেষত সিনেমার। তাকে দেখলেই রেবা যে একটু বিহ্বল হয়ে যায় শ্রীমন্ত তা লক্ষ করেছে। ভালোই লাগে।
