শ্রীমন্ত এইবার নিশ্চিন্ত হল। অসীমা পাল বেকারই, খুব ক্ষীণভাবে তার মতোই। তাদের দু-জনকেই হাজিরা খাতায় সই করতে হয় না। তবে এখানে ওখানে টুকটাক লিখে বাংলা খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিন থেকে যা পাওয়া যায় তার থেকে সে বেশিই পায়।
‘লিচুতলায় কোথায় থাকেন?’ শ্রীমন্ত প্রশ্নটা করল, যেহেতু এই সময় এটাই করা উচিত মনে করে।
‘বাসস্টপের কাছেই, মিনিট চারেক হাঁটতে হয়।’
উত্তরের ভঙ্গিতে ও সুরে আলাপটাকে পাশ কাটানোর ইচ্ছা স্পষ্ট। শ্রীমন্ত মনে-মনে বলল, রিপোর্টটা ছাপা হলে তুমি কিছু টাকা পাবে সুতরাং মাথাব্যথা করাটা একা আমারই কাজ নয়। বাড়ি ফিরবে হেঁটে না বাসে সেটা তোমার মর্জি, আমার কর্তব্য গাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা।
‘গাড়ি আপনাকে বাড়িতে দিয়ে আসবে। আপনি বসুন আমি বরং ততক্ষণ এঁদের-‘ শ্রীমন্ত বাকি তিনজনের দিকে অনুমোদন চাওয়ার মতো করে তাকাল।
‘যান, আপনি গাড়ির জোগাড় দেখুন। বক্তৃতা তো প্রায় সব হয়েই গেছে।’
শ্রীমন্ত ভিড়ের থেকে বেরিয়ে স্কুলের ফটকের কাছে এল। এখন তাকে কিছুক্ষণ গা-ঢাকা দিয়ে রিপোর্টারদের বসিয়ে রাখতে হবে। অকাদাদুর ভাষণ থেকে দু-চারটে কথা ওদের রিপোর্টে থাকা দরকার। ভাষণ না শুনিয়ে তো ছাড়া যাবে না। ব্রজরাখালের অ্যাম্বাসাডারটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে এগিয়ে গেল।
‘হ্যাঁরে সমীর, গাড়িটা এখন কোথাও যাবে নাকি?’
ড্রাইভার দরজায় ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। তালুর মধ্যে সিগারেটটাকে চট করে মুড়ে ফেলে বলল, ‘এই তো তবলা-হারমোনিয়াম নিয়ে এলুম, এখন আর কোথাও যেতে পারব না। রেস্ট নোব।’
‘তাই নে। আমি একটু গাড়িতে বসছি।’
শ্রীমন্ত ড্রাইভারের আসনে বসে সামনে তাকিয়ে রইল। প্রায় চল্লিশ গজ দূরে কাঠের খুঁটিতে দুটো বালব ময়লা আলো জ্বালিয়ে পুরসভার মান রাখছে। লাউডস্পিকার দুটো ফটকের দুদিকে দুই মুখে। হেডমাস্টার মশাইয়ের বক্তৃতা চলছে। শ্রীমন্তর কানে ঢুকছে না একটা কথাও। সে ভাবছে, এই পুরসভায় ব্রজমামাকে আবার নির্বাচিত করাতে হবে। তেরোটা ওয়ার্ড থেকে কারা কারা দাঁড়াবে এখনও তা জানা যায়নি। তবে যারা কমিশনার রয়েছে তারা অবশ্যই যে প্রার্থী হবে তা তো নিশ্চিতই।
মামা জিতে ঠিকই বেরিয়ে আসবে কিন্তু চেয়ারম্যান হতে পারবে কিনা সেটা এবার বামফ্রন্টের ভিতর আকচাআকচির বহর কতটা তার উপর নির্ভর করবে। বিমল চক্রবর্তীকে সুপারমার্কেটে একটা ঘর বিনা সেলামিতে দেবার জন্য মামাকে বলবে। মামা শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে ঠিকই উঠবে কিন্তু বোঝাতে হবে। তেরো কমিশনারের পুরসভায় কমপক্ষে সাতটা ভোট না পেলে মামার অপমানের ঘা শুকোবে না।
গতবার নিশ্চিত সাত হয়ে গেল ছয়। এবার একটু সাবধান হয়ে কমপক্ষে আটটা ভোট নিশ্চিত করতে হবে। কংগ্রেস কী নির্দল থেকে একটাকে ভাঙিয়ে আনা দরকার। আগে সবাই নমিনেশন সাবমিট করুক তারপর কে কে জিততে পারে হিসেব করে একজনকে টার্গেট করতে হবে। ভোটের ফল বেরোলেই কথাবার্তা, দর কষাকষির জন্য মামার ভরসা সে-ই।
‘আমি আর কী বলব। যা বলার সবই তো তোরা বলেছিস।’
শ্রীমন্তর চটকা ভাঙল। লাউডস্পিকার থেমে মঞ্চের কথাবার্তা আর মাইক ঠিক করার ঘড়াং ঘড়াং শব্দ বেরিয়ে আসছে।
অকাদাদুর গলা ওটা। নিশ্চয় সোফার কাছে মাইক নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্য দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দেওয়ার মতো পায়ের জোর ওঁর এখনও আছে। শ্রীমন্তই বলেছিল, ‘মামা, দাদুকে বসিয়েই বক্তৃতা দেওয়াবেন, এতে ওঁর সম্পর্কে আপনার দরদ, যত্ন আর শ্রদ্ধাই শুধু প্রকাশ পাবে না, দৃশ্যটা দেখতে ভালো লাগবে, সহানুভূতি টানবে।’ মামা তখন পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘গুড আইডিয়া।’
‘আমরা আর কী বললাম। এই স্কুলের জন্ম বলতে গেলে আপনার হাতেই হয়েছে, আমি তো নিমিত্ত মাত্র।’ ব্রজরাখালের কণ্ঠস্বর খুব জোরেই শোনা গেল। শ্রীমন্তর বুঝতে অসুবিধা হল না, মামা কথাগুলো বললেন দাদুর দিকে নয়, মাইকের দিকে মুখ ফিরিয়ে।
‘উপস্থিত সুধীবৃন্দ, ছোটো ছোটো ভাইবোনেরা, মায়েরা।….স্কুলটা জন্মায় পঁচিশ বছর আগে, তখন দিনকাল মানুষজন যা ছিল এখন তো আর তা নেই, অবশ্য থাকার কথা নয়, উচিতও নয়। আমরা একরকম পরিবেশে স্কুলে পড়েছি মাস্টারমশাইরা একরকমের পদ্ধতিতে ক্লাস নিতেন, পাঠ্য বইও ছিল একরকমের….এখন সেটা অন্যরকম হয়ে গেছে। পরাধীন দেশের ছেলেদের কাছে বড়ো হবার লক্ষ্য যা ছিল, দেশ সম্পর্কে চিন্তা যা ছিল এখন সেটা বদলে গেছে। স্বাভাবিকই।’
শ্রীমন্তর কানে অকাদাদুর গলার স্বর সামান্য গম্ভীর, শান্ত শোনাল। সরু খনখনে ভাবটা বোধ হয় থেমে-থেমে বলার জন্যই ধরা পড়ছে না।
‘বদলটা সবার সঙ্গে-সঙ্গে আমারও ঘটেছে। স্বাধীনতা পাবার পর থেকেই ঘটেছে। বোমা পিস্তল রাইফেল নিয়ে বিদেশি শাসক তাড়ানোর জন্য। বিপ্লবের দিন শেষ হয়ে আর এক ধরনের বিপ্লবের সময় এসে গেল। সামাজিক বিপ্লব, দেশবাসীর উন্নতির, সমৃদ্ধির জন্য বিপ্লব। এজন্য হাতিয়ার হিসেবে যা যা দরকার তার একটা হল শিক্ষা। সেই লক্ষ্য নিয়েই এই রামরাখাল উচ্চচ শিক্ষায়তনের জন্ম। কিন্তু সেই লক্ষ্য কী-।’
অকাদাদুর কথার স্বচ্ছন্দ গতি হোঁচট খেয়ে থেমে গেল। ব্যাপার কী! শ্রীমন্ত লাউডস্পিকারটার দিকে জিজ্ঞাসু চাহনি রাখল।
