শ্রীমন্ত কাচুমাচু মুখ করে প্রতিবারই বলে, ‘কী করব রামাদা, বুকের সেই ব্যথাটা সম্পর্কে ভয় দেখিয়ে ডাক্তারে যা বলল তাতে বাড়ির সবাই এমন-‘
‘বাড়ি মানে তো তোর মামাটা। আমার সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলে বেড়ায়, আমি নাকি যোগের কিছুই জানি না।’
এই রামানন্দ যোগব্যায়ামের স্কুল খুলে দু-বেলায় সত্তর-আশি জন নানান বয়সি নরনারীকে অভ্যাস করায়, শিক্ষা দেয়। অম্বল, আমাশা, গেঁটেবাত নাকি সারিয়ে দিতে পারে। গত বছর তার স্কুলের শাখা খুলেছে ইছাপুরে ও মধ্যমগ্রামে।
শ্রীমন্তর ‘মামাটা’কে ঘোল খাওয়াবার জন্যই রামানন্দ জমির কিছুটা বেড়া দিয়ে ঘিরে নিয়েছে। ব্রজরাখালের ওই জমির বিঘে প্রতি দাম এখন চার লাখ টাকার উপর এবং মাসে মাসেই দাম বেড়ে উঠছে। জমি উদ্ধারের জন্য শ্রীমন্তকে মাথা ঘামিয়ে বুদ্ধি বার করার দায়িত্ব দিয়েছে ব্রজরাখাল। মামাকে তার প্রথম পরামর্শ ছিল: তোমাকে চেয়ারম্যান হতে হবে আর সেজন্য অকাদাদুকে সামনে খাড়া করে তোমাকে এগোতে হবে।
‘অক্ষয়ধন মিত্রর মতো মানুষ, যিনি একদা স্বাধীনতার জন্য বিপ্লবের মশাল হাতে নিয়ে ছুটে বেড়িয়েছিলেন বাংলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত, যদি আপনারা ভাবেন আজ তিনি রণক্লান্ত তাহলে ভুল করবেন…সমাজসেবার জন্য, এই খুদিনগরের জনগণের মঙ্গলের জন্য, আবার তিনি নিভে যাওয়া মশাল….।’ স্কুল কমিটির সেক্রেটারির গলা দাউ দাউ করে লাউডস্পিকার থেকে বেরিয়ে আসছে। শ্রীমন্ত জানে ইনি মামার হাতের লোক।
কিন্তু এখন টেলিফোন করে তাকে জেনে নিতে হবে অসীমা পাল আসলে কে?
হেডমাস্টারের ঘর তালাবন্ধ তবে দরজার সামনে বেয়ারাকে দেখতে পেয়ে বলল, ‘তালা দেওয়া কেন? একটা জরুরি ফোন করতে হবে যে।’
‘ফোন তো আজ এগারো দিন হল অচল। খবর দেওয়া হয়েছে।’
কাছাকাছি ফোন ব্রজরাখালের বাড়িতে। সেটা অচল নয়। কিন্তু এখন তার যাওয়া সম্ভব নয়। সে দূর থেকে প্রেস টেবলে বসা অসীমার দিকে তাকাল। ব্যাগটা টেবলে রাখা। নোটবইয়ে কিছু একটা লিখতে গিয়েও লিখল না। শ্রীমন্তর মনে হল, বোধ হয় সত্যি রিপোর্টারই। অসীমার উপর দিয়ে সে চাহনিটা দু-বার বোলাল। মুখ শুকনো, থুতনির কাছটা ছুঁচলো, চওড়া কপাল, চোখা নাক, কেশ উপড়ানো সরু বাঁকানো ভ্রূ, পাতলা ঠোঁট, মুখের গড়ন ডিমের মতো, মঙ্গোলীয়দের মতো চোখ ও গায়ের রং, কাঁধ চওড়া কিন্তু রোগাই, চোয়ালের হাড় সামান্য প্রকট হয়ে সারা মুখটাকে শক্ত কাঠামো দিয়েছে যে জন্য চোখ দুটোয় একটা কড়াধাত এসেছে। বাম বগলের কাছে কাপড়, তাঁতের, বেশি দামি নয়, সরে রয়েছে। বুকে স্বাস্থ্য আছে। মাঝ দিয়ে সিঁথি করা চুল খোঁপায় বাঁধা। বাঁ হাতের কবজিতে ঘড়ি ছাড়া কোনো অলংকার নেই। হাতটার গড়ন ভালো। কিন্তু মেয়েটি সম্পর্কে কোনো ধারণা তার তৈরি হল না।
ফোটোগ্রাফদের একজনকে ভিড় ঠেলে বেরোতে দেখে শ্রীমন্ত এগিয়ে গেল। ‘এখন কোথায় চললে?’
‘রোলটা শেষ, নতুন ভরতে হবে।’
‘যেমন বলেছি, প্রত্যেক ফ্রেমে মামা যেন-।’ শ্রীমন্তর চোখ মঞ্চে পড়ল। ব্রজরাখালের ‘নিবেদন’ ছিঁড়ে সরু করে পাকিয়ে অকাদাদু কানে ঢুকিয়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছেন। চোখ দুটো আরামে বোজানো। মঞ্চের একদিকে পঁচিশটা প্রদীপ জ্বালিয়ে জেলাশাসক রজতজয়ন্তীর যে উদবোধন করেছিলেন, তার গোটা দশেক নিভে গেছে। জ্বালিয়ে দেওয়া দরকার। কথক, ম্যাজিক আর শ্যামার জন্য দায়িত্ব তার নয়। ওটা ব্রজরাখালের বড়ো ছেলে, তার মামাতো ভাই অঞ্জনের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে।
প্রেস টেবল থেকে একজন তাকে দেখতে পেয়ে হাতছানি দিচ্ছে। শ্রীমন্ত ব্যস্ত হয়ে প্রায় ছুটেই ভিড় ঠেলে চেয়ারের পিছনে গিয়ে ঝুঁকে বলল, ‘কিছু বলছেন?’
‘হ্যাঁ। বক্তৃতায় তো সেই একই কথা।… গাড়ির ব্যবস্থা করুন। যা নেবার নেওয়া হয়ে গেছে। কী দিলীপ তুমি থাকবে নাকি?’
‘না দাদা, আমিও যাব। কত আর লিখব, কাগজে জায়গা কোথায়।’
শ্রীমন্ত আর একটু ঝুঁকে বলল, ‘দু-মিনিটেই ব্যবস্থা করছি। কিন্তু তার আগে ব্রজরাখালবাবুর বাড়িতে গিয়ে একটু মিষ্টি মুখ আর যৎসামান্য উপহার….।’ এই ড্রামাটিক পজটা ইচ্ছাকৃত নয়। হঠাৎই তার খেয়াল হল রিপোর্টার মানেই পুরুষ এটা ধরে নিয়েই সে উপহার কিনেছে প্যান্টের কাপড়। কিন্তু একটা মেয়ে এসে পড়ে গোলমালে ফেলে দিল। ওকে কী প্যান্টলেংথ দেওয়া যায়?
‘আবার উপহার কেন।’ তিনজনের মধ্যে যিনি বয়স্ক, উদাসীন স্বরে যেন অনুযোগ করলেন। ‘অফিসে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।’
‘কিচ্ছু দেরি হবে না, কুড়ি থেকে তিরিশ মিনিটে পৌঁছে দেবে।’
‘ঠিক বলছেন, পারবেন?’
‘নিশ্চয়। আমরা তো রেগুলার কলকাতা যাই।’ এরপর শ্রীমন্ত অসীমার দিকে ফিরে বলল, ‘আপনার কোনো তাড়া নেই তো?’
‘না না, আমার এখন অফিস যাওয়ার কী এখনি লিখে দেওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। তা ছাড়া আমি তো কাছেই লিচুতলায় থাকি। বাসে চলে যেতে পারব।’
‘লিচুতলা!’ শ্রীমন্ত অবাক হল। বাসে কলকাতার দিকে তৃতীয় স্টপ, হেঁটেও যাওয়া যায়। এত কাছে একজন কাগজের রিপোর্টার!
বয়স্ক জন অসীমাকে লক্ষ করে বললেন, ‘আপনি কী সমাচারে রিসেন্ট জয়েন করেছেন? আগে কখনো দেখিনি তো!’
‘আমি স্টাফ নই, ফ্রি ল্যান্সার। এখানে ওখানে টুকটাক লিখি। বিদ্যুৎদা মাঝেমাঝে কাজ দিয়ে পাঠান, এখানেও কভার করতে পাঠালেন।’
