ভাড়া করে দু-জন ফোটোগ্রাফারকে শ্রীমন্ত কলকাতা থেকে আনিয়েছে। ওরা ফুটবল ক্রিকেট মাঠে ছবি তুলে বিক্রি করে। শিখিয়ে পড়িয়েই সে এনেছে আর ব্রজরাখালকে বলেছে, আনন্দবাজার আর স্টেটসম্যান থেকে এসেছে। শুনে খুশি না হয়ে ব্রজমামা বলেছিলেন, ‘এখানে সাত নম্বর ওয়ার্ডে সবথেকে বেশি লোক পড়ে সমাচার, এ কথা তুই-ই আমায় বলেছিলি। আর নিয়ে এলি কিনা-‘
‘সাত নম্বর ওয়ার্ডের লোকেরা মানে ভোটাররা কাজকর্ম করে, লোকজনের সঙ্গে কথা বলে, আলোচনা করে, মতামত শোনে যেখানে, সেখানে কী সবাই সমাচারের পাঠক? বেশিরভাগ লোক ভোট দেয় অন্যের কথা শুনে আর সেই অন্য লোকেদের কথা ভেবেই এই দুটো কাগজের ফোটোগ্রাফার এনেছি। এতবড়ো কাগজ থেকে এসেছে এটাই তো বলার মতো ব্যাপার, তুমি পাবলিসিটির এই দিকটাও দ্যাখো!’
‘ছাপা কী হবে?’
শ্রীমন্ত কপালে হাত ঠেকিয়ে মুখ উপরে তুলে শুধু বলেছিল ‘উনিই জানেন।’
কিন্তু এখন তাকে জানতে হবে এই অসীমা পাল সত্যিই সমাচারের স্টাফ রিপোর্টার কি না। জানার সহজ পদ্ধতি বিদ্যুৎ ঘোষকে টেলিফোন করা। স্কুলের টেলিফোনটা হেডমাস্টারের ঘরে। শ্রীমন্ত টেলিফোন করার উদ্দেশ্যে প্যান্ডেলের বাইরে দিয়ে ঘুরে এগোচ্ছিল তখন দেখা হয়ে গেল পুরসভার চেয়ারম্যান সত্য মিশ্রর সঙ্গে। ব্যস্ত হয়ে তিনি গেট দিয়ে ঢুকছেন।
‘সত্যবাবু! এত দেরি করে?’
‘আর বলো না। কলকাতায় গেছলুম, ফেরার পথে কেষ্টপুরের কাছে গাড়ি বিগড়ে….খুব নাকি পাবলিসিটির ফায়দা তোলার ব্যবস্থা করেছ, টিভি এসেছে নাকি?’
শ্রীমন্ত হাতঘড়ি দেখে ধীরগলায় বলল, ‘গাড়ি পাঠিয়েছি, এখনও ওদের আসার সময় হয়নি।’
‘আমি গিয়ে বসি। বক্তৃতা টক্তৃতা কিছুক্ষণ তো চলবে?’
‘আদ্দেকের বেশি হয়ে গেছে, দাদুরটা বাকি। তারপর একটা কত্থক নাচ, ম্যাজিক শো, রবীন্দ্রনাথের শ্যামা দিয়ে শেষ হবে। আপনি-‘ শ্রীমন্ত ওকে একটা ‘নিবেদন’ দেবার জন্য ঝোলায় হাত ঢোকাল এবং খালি হাত বার করল। দরকার নেই নষ্ট করে। ‘আপনি এই ডান দিক দিয়ে এগিয়ে যান।’
সত্য মিশ্রর জন্য মঞ্চে বসার ব্যবস্থা নেই। ব্রজরাখালের ঘোরতর আপত্তির বাধাটা শ্রীমন্ত টপকাতে পারেনি।
‘ওকে মঞ্চে বসানো উচিত। মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান, তার একটা মর্যাদা আছে। ওর এলাকাতেই এই স্কুল। ওকে না হোক ওর চেয়ারটাকে তো-।’
‘সেই জন্যই ওকে মঞ্চে চেয়ার দেব না।’ ব্রজরাখালের চাহনি আর শক্ত হয়ে ওঠা চোয়ালের পেশি জানিয়ে দিচ্ছে এই ব্যাপারে তাঁর সিদ্ধান্ত অটল। ‘ওই চেয়ারটা আমারই পাবার কথা ছিল, সারা খুদিনগর তাই জেনেছিল। সত্য মিশ্রর দল তলায়-তলায় যে কী চক্রান্ত করেছিল সেটা তো আর এখন অজানা নয়।’
‘মামা, রাজনীতি কখনো চক্রান্ত বাদ দিয়ে করা যায় না। সিপিএমের এক কমিশনার আপনাকে ভোট না দিয়ে কংগ্রেসকে দিল কেন তাও আপনি জানেন। মনে করে দেখুন, বাজার তুলে দিয়ে সুপারমার্কেট করতে গিয়ে তখন যে আন্দোলনের সামনে পড়েছিলেন তাতে আপনি একটা ইটও গাঁথতে পারতেন না। বিমল চক্রবর্তী বলেছিল সুপারমার্কেটে একখানা ঘর তাকে ফ্রি দিলে আন্দোলন বন্ধ করিয়ে দেবে। আপনি রাজি হলেন, সুপারমার্কেটের বাড়ি উঠল কিন্তু ঘর কী তাকে দিয়েছেন?….তাহলে সে কেন বদলা নেবে না?’
‘ফ্রি আমি মোটেই দেব বলিনি। ওদের লোকাল কমিটির সেক্রেটারিকে, কংগ্রেসের দু-জনকে যে দামে দিয়েছি সেটাই চেয়েছিলাম। তুই জানিস, ক্রসভোটিংয়ের জন্য বিমল চক্রবর্তীকে পার্টি থেকে বার করে দেওয়ার সুপারিশ জেলা কমিটি করেছিল কিন্তু লোকটা রয়ে গেছে রাজ্য কমিটিতে খুঁটির জোর আছে বলে। এখন ওর কথাতেই সত্য মিশ্র ওঠাবসা করে আর সেই সত্যকে আমি মঞ্চে তুলে পাবলিকের কাছে দেখাব? এতে ও কতটা পাবলিসিটি পেয়ে যাবে জানিস? এর উপর টিভি-র ছবির মধ্যে যদি চলে আসে-‘ ব্রজরাখাল এক কাল্পনিক টিভি স্ক্রিনে সেই ছবি দেখতে পেয়ে শিউরে উঠলেন।
শ্রীমন্ত জানে, ব্রজমামার পক্ষে চেয়ারম্যান না হতে পারার শোক কাটিয়ে ওঠা তখনই সম্ভব হবে যদি এবারের নির্বাচন জিতে সাতটা ভোটের ব্যবস্থা করতে পারেন। শুধু মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্যই নয়, আট বিঘা পৈতৃক জমিটা বাঁচাবার জন্যও তাঁকে চেয়ারম্যান হতে হবে।
খুদিনগর স্পোর্টিং ক্লাব তৈরি করে রামরাখাল মুখুজ্জেই তাঁর আট বিঘে জমিতে ক্লাবকে শুধু ব্যবহারের অনুমতিই দিয়ে যাননি, মায়ের নামে কৃষ্ণভামিনী স্মৃতি চ্যালেঞ্জ শীল্ড ফুটবল প্রতিযোগিতাও চালু করে দিয়েছিলেন যাতে উদ্বাস্তুরা জমিটা দখল করে ঘর বানিয়ে ফেলতে না পারে। সেই ক্লাব এখন পাকা ঘর তুলে তো ফেলেছেই, তাদের সেক্রেটারি রামানন্দ সরখেল বলতে শুরু করেছে, এই জমি নাকি ক্লাবেরই সম্পত্তি। তারা অধিকার ছাড়বে না।
খুদিনগর ক্লাবে শ্রীমন্ত চার বছর ব্যায়াম করেছে। সবাইকে চেনে, রামানন্দ তো খুবই পরিচিত। কিছুদিন ওর যোগাসন শেখার ক্লাসে শ্রীমন্ত তালিম নিয়েছিল। কিন্তু রামানন্দর শিক্ষাদান পদ্ধতিতে হাত দুটোর অযথা অবাঞ্ছিত স্থানে গমনের প্রয়োগ থাকায় সে ক্লাস করা বন্ধ করে দেয়। এজন্য রামানন্দ এখনও দুঃখ করে বলে, ‘বেনারস থেকে ভারত যোগশ্রীটা তোকে দিয়ে বাংলায় আনাতুম। মিছিমিছি ছেড়ে দিলি।’
