কিন্তু এই মুহূর্তে, রামরাখাল উচ্চচ শিক্ষায়তনের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যে বিপত্তির আশঙ্কায় সে রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছছিল, সেটিই ঘটল। একটা অ্যাম্বাসাডর তার সামনেই এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নামল শুধু একটিমাত্র মেয়ে।
ক্যামেরা হাতে টিভি-র লোক কই? দু-জন রিপোর্টারও আসার কথা, তারাই বা কই? শ্রীমন্ত গাড়ির ড্রাইভারের কাছে গিয়ে ঝুঁকে গলা নামিয়ে বলল, ‘যাদের আসার কথা, তারা কই?’
‘টিভি-র লোকের বাড়িতে গেছলুম। তিনি বললেন, তাঁর ক্যামেরাটা আজ সকালেই গন্ডগোল করেছে, ফ্লিম ঠিকমতো রোল করছে না, সারাতে দিয়েছেন তাই আসতে পারবেন না। আর যে দু-জন রিপোর্টারকে তুলতে বলেছিলেন তার একজনের জন্য মানিকতলায় ছায়া সিনেমার সামনে কুড়ি মিনিট দাঁড়িয়ে ছিলুম। আর এনাকে উলটোডাঙার মোড় থেকে এনেছি।’ ড্রাইভার মুখ ফেরাল মেয়েটির দিকে।
পলকের জন্য শ্রীমন্তর মুখ শুকিয়ে গিয়েই সঙ্গে সঙ্গে হাসিতে ভরে গেল। নমস্কার জানাতে জানাতে মেয়েটিকে বলল, ‘আসুন, আসুন, একটু দেরি করে ফেলেছেন অবশ্য দোষটা আপনার নয়।’
‘দেরি হত না যদি বিদ্যুৎবাবু আগেই আমাকে জানাতেন…আমার নাম অসীমা পাল, সমাচার থেকে-।’
‘ওহোও, বিদ্যুৎদা মানে বিদ্যুৎ ঘোষ….এইদিক দিয়ে আসুন….কিন্তু আমি তো সাত-আট দিন আগে ওঁকে বলে এসেছি, কার্ডও দিয়েছি! বলেছিলেন ভবনাথ গুপ্তকে পাঠাবেন।’
‘আজ দুপুরে সমাচার অফিসে যেতেই বিদ্যুৎদা বললেন, তোমার বাড়ির দিকেই একটা স্কুলের সিলভার জুবিলি ইয়ারের ইনঅগুরেশন আছে, ভবনাথকে কভার করতে বলেছিলাম কিন্তু ফোন করে জানাল আজ অফিসে আসতে পারবে না, ছেলেকে স্কুলে ভরতি করানোর ব্যাপারে ব্যস্ত থাকবে। ওর জন্য গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকবে উলটোডাঙায়, তা তুমিই চলে যাও।’ কাঁধ থেকে ঝোলা ফোমলেদার ব্যাগটা থেকে উঁকি দেওয়া ছাতার মাথাটা চেপে বসিয়ে অসীমা হাসল।
প্রেস লেখা টেবলে সাত-আটটা চেয়ার রাখা এবং সবগুলোতেই লোক বসে। শ্রীমন্ত তাদের মুখগুলো দেখে তিন জনকে চিনল। বাকিদের একজনকে খুব বিনীত স্বরে বলল, ‘আপনি কোন কাগজ থেকে?’
লোকটি থতমত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘না না আমি কাগজের নই, খালি দেখে বসেছিলাম।’
‘বসুন।’ শ্রীমন্ত খালি চেয়ারটা অসীমাকে দেখাল। কাঁধের ঝোলা থেকে ব্রজরাখালের এককপি ‘নিবেদন’ বার করে দিল অসীমার হাতে। পাশের তিনজন ভ্রূ কুঁচকে কৌতূহলে অসীমার দিকে আড়ে তাকাল।
শ্রীমন্তর ভ্রূও একবার নড়ে উঠেছিল। সমাচারে মেয়ে রিপোর্টার! অনেকবারই সে ওদের অফিসে গেছে কিন্তু কোনো মেয়েকে তো চোখে পড়েনি! এখন অনেক কাগজেই মেয়েরা রিপোর্টিং করছে, ডেসকে কাজ করছে কিন্তু সমাচার তো ততটা আধুনিক নয়। ব্রজমামার প্রহসন দেখতে কলকাতা থেকে রিপোর্টার সেজে এখানে আসতে পারে শুধুমাত্র বদ্ধ উন্মাদ নয়তো অকাদাদুর কোনো বাল্যবন্ধু। কিন্তু এই অসীমা পাল যে তার কোনোটাই নয়, সেটা তো ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
প্রধান অতিথি বক্তৃতা দিচ্ছেন। শ্রীমন্ত দাঁড়ানো দর্শকদের পিছনে চলে এসে নিজেকে ব্রজমামার দৃষ্টির বাইরে রাখল। টিভি ক্যামেরা দেখতে না পেয়ে ওঁর মানসিক ভারসাম্য যে হেলে পড়বেই শ্রীমন্ত তা জানে। আজ সকালেও মামা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ কিন্তু এটাই, ফেভারেবল প্রেস রিপোর্টিং। কোনো ত্রুটি যেন না হয়….টিভি থেকে আসছে তো?’
‘আসবে। তাকে আনার জন্য গাড়িও রেডি আছে। সেই সঙ্গে দু-জন রিপোর্টারও আসবে।’
ব্রজরাখালের মুখ দেখে শ্রীমন্তর মনে হয় তার কথা বিশ্বাস করতে পারছেন না তাই যোগ করেন, ‘অকাদাদুর নাম করেছি, তাঁর বিষয়ে যা যা বলার বলেছি। উনি সভায় থাকবেন, এটা যে একটা বিরল ঘটনা, তাও বলেছি।’
‘তোকে যা বলে রেখেছি সেইমতো ক্যামেরাম্যানের সঙ্গে সঙ্গে থাকবি।….ওসব অকাদাদুফাদু ছাড়, আমার ছবি যাতে নেয় সেই ব্যবস্থা করবি।’
‘কিন্তু মামা আমি চাইলেই কী ওরা, মানে….নিউজের গুরুত্ব বুঝেই তো ওরা ছবি তুলবে।’
‘আহাহা তুলুক না, সে তো একশোবার তুলবে, সেটাই তো নিউজম্যানের কাজ। কিন্তু তোর কাজটাও তো তুই করবি। খরচের কথা তো তোকে ভাবতে বলিনি….খাওয়া, যত টাকা লাগে খাওয়া। টিভি-তে একবার একটুখানি মুখ দেখাতে পারলে আমার কাজ কতটা এগিয়ে যাবে বল তো? লোকে এখন টিভি-কে ভক্তি করে, শ্রদ্ধা করে, মানে। স্ক্রিনে ফুটে উঠলেই লোকে বুঝে নেয়, হেঁজিপেজি নয় নিশ্চয় একজন সেলিব্রেটি। শ্রীমন্ত আমার এখন ওই সেলিব্রেটি ইমেজটা দরকার।’
‘কিন্তু মামা, খুদিনগরের সাত নম্বর ওয়ার্ডের ভোটাররা তো সেলিব্রেটি-ফ্রেটি বোঝে না। তুমি দাঁড়িয়ে থেকে রাস্তার কাঁচা নর্দমা সাফ করাবে কিনা, জলের পাইপ বসাবে কিনা সেই ইমেজটাই আগে তৈরি করো।…স্থানীয় সংবাদে দু সেকেন্ড তোমাকে স্ক্রিনে দেখালেই কী ঝপাঝপ তোমার সিম্বলে ছাপ পড়বে ভেবেছ? লোকে কী এতই বোকা?’
কথাটা শুনে ব্রজরাখাল খুব বিরক্ত হয়ে এরপর বলেছিলেন, ‘মনে হচ্ছে টিভি-র জন্য তুই চেষ্টা করিসনি, তাই এই সব বোঝাচ্ছিস।’
এখন শ্রীমন্ত প্রায় শিউরে উঠল, টিভি ক্যামেরা না-দেখা ব্রজমামার প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে। রগচটা মানুষ। টাকাপয়সা বাড়ানোর বুদ্ধিটার বাইরে, নিজের স্বার্থের গণ্ডির বাইরে দুনিয়ার হালচাল বোঝার বা দেখার দরকার আছে বলে মনে করেন না। এবং এইভাবেই তিনি দিব্যিই মসৃণভাবে চলে যাচ্ছেন হোঁচট না খেয়ে।
