এই মুহূর্তে সে একটু সংকটে। টিভি থেকে তাদের একজন স্ট্রিঙ্গার আসার কথা। তাকে বউবাজারের বাড়ি থেকে আনার জন্য গাড়ি পাঠিয়েছে কিন্তু এখনও এসে পৌঁছয়নি। ওই গাড়ি কলকাতা থেকে দু-জন রিপোর্টারকেও আনবে। রিপোর্টার না হোক, টিভি-র লোক না এলে ব্রজমামার কাছে তার মাথা কাটা যাবে, কিছু কড়া কথা শুনতেই হবে।
মামার কাছে তার উপযোগিতা কমে গেলে শ্রীমন্ত মুশকিলেই পড়বে। ব্রজরাখালের কাছে সে চাকরি করে না বটে তবে নানান ধরনের কাজ করে দেওয়ার জন্য মাসোহারা পায়। কোনোক্রমে উচ্চচমাধ্যমিক এবং কলেজে মাত্র এক বছর পড়েই মামার আশ্রয়ে এসে, বাসের আর সুপার মার্কেটের দেখাশোনার কাজ দিয়ে শুরু করেছিল। এখন সে মামার কাছের লোক। আপার ডিভিসন ক্লার্কের মতোই তার আয়।
রামরাখাল তাঁর মেয়ে সুপ্রভার বিয়ে দিয়েছিলেন উত্তর কলকাতায় তাঁর শ্বশুরবাড়ির কাছাকাছি দর্জিপাড়ায়, বংশ-কৌলিন্য দেখে। জামাই সনৎ তাস আর ক্যারাম খেলা ছাড়া দক্ষতা অর্জন করেছিলেন আধুনিক গান গাওয়ায়। শরিকানি বিষয়-সম্পত্তির অংশ থেকে পাওয়া টাকায় তাঁদের সংসার চলত। বিয়ের সময় সনতের নিয়মিত কোনো রোজগার ছিল না। তখন রেডিয়োয় বছরে তিনি তিনবার গান গাইতেন, পুজোর পর কিছু জলসায় গান গেয়ে কয়েকটা টাকা পেতেন, দুটো রেকর্ডও হয়েছিল। একটা গানের স্কুলে সপ্তাহে একদিন গান শেখাতেন।
শ্রীমন্তর জন্মের পর সনৎ একটা ফিল্মে কোরাসে গলা দেবার সুযোগ পান, তারপর সহকারী সংগীত পরিচালক হবার প্রতিশ্রুতি পেয়ে স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে প্রযোজকের হাতে টাকা তুলে দেন। সেই ফিল্ম আর তৈরি হয়নি কিন্তু সনৎ চোটটা আর সামলে উঠতে পারেননি। পারিবারিক সম্পত্তিগুলো বহুদিন ধরেই বিক্রি হতে হতে যখন জানা গেল বিক্রির জন্য আর কিছু অবশিষ্ট নেই, তখন সনতের সাংসারিক অবস্থাও শোচনীয়। এই সময় রামরাখাল সাহায্য না করলে তাঁর মেয়ে এবং নাতিদের প্রকৃতই ভিক্ষা করতে হত। জামাইকে তিনি নিমতলায় তাঁর ছাপাখানায় বসিয়ে কাজকর্ম তদারকির ভার দেন।
সন্ধ্যায় হেঁটে নিমতলা থেকে দর্জিপাড়ায় ফেরার পথে সনৎ, একঘেয়ে, মন্থর জীবনে বৈচিত্র্যের ও উত্তেজনার স্বাদ পাওয়ার জন্য গরানহাটার মধ্য দিয়ে কয়েকটা গলি বেছে নিয়েছিলেন যেখানে মেয়েরা মুখে চড়া প্রসাধন করে, কেউ বা খোঁপায় মালা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদেরই একজনের ঘরে অবশেষে একদিন তিনি প্রমোদের জন্য যান। তিনি তাঁর সঙ্গ উপভোগ করেন এবং প্রায়ই যেতে শুরু করেন।
বালক শ্রীমন্তকে তার পাড়ারই এক বন্ধু এই খবরটি দেয়। ‘কাকার বন্ধুর চপ-কাটলেটের দোকান, মাঝে মাঝে কাকা খেয়ে আসে। কাল কাকা খেতে গেছল। বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে, তখন দেখল তোর বাবা দোকানের সামনের, একটা খুব খারাপ বাড়িতে ঢুকল।’
‘খারাপ বাড়ি মানে?’
‘বেশ্যাবাড়ি।’
‘তাতে কী হয়েছে?’ শ্রীমন্ত বেশ্যা শব্দটি শুনেছে কিন্তু জানত না বেশ্যাবাড়িতে ঠিক কী ঘটে।
‘তোর বাবার লুজ ক্যারেক্টার।’
‘কে বলল?’
‘কাকা বাড়িতে বলছিল।’
শ্রীমন্ত কাউকে কিছু বলেনি। তবে কৌতূহলের তাড়নায় পরদিন সে ছাপাখানার কাছে সন্ধ্যার সময় দাঁড়িয়ে থাকে। বাবা বেরোতেই সে অনুসরণ করে। দূর থেকেই সে দেখল বাবা একটা বাড়িতে ঢুকল যার দরজায় পাঁচ-ছটি মেয়ে, বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে যাওয়ার মতো সাজগোজ করে দাঁড়িয়ে। কিন্তু বাড়িটাকে তার মোটেই খারাপ বলে মনে হল না। তাদের পাড়াতেও এরকম দেখতে অনেক বাড়ি আছে। সে এগিয়ে এসে দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে ভিতরটা দেখার জন্য উঁকি দিয়েছিল তখন ওদের মধ্যে মোটাসোটা সবথেকে বয়স্ক মেয়েটি খিঁচিয়ে উঠে বলেছিল, ‘অ্যাই এখানে কী কোত্তে এয়েচিস, কান ছিঁড়ে দোব, য্যা পালা, পুলিশ ডেকে নইলে ধরিয়ে দেব।’ শ্রীমন্ত ফেরামাত্র তার কান ধরে মা বলেছিল, ‘সন্দের পর বাড়ির বাইরে কোনো ভদ্দরবাড়ির ছেলে থাকে?’
ভদ্দরলোক হওয়ার ঝামেলা যে কী কঠিন ব্যাপার বাল্য বয়স থেকে সেটা জানতে জানতে শ্রীমন্ত বড়ো হয়েছে। সংসার খরচের জন্য যে পরিমাণ টাকা দিতেন, তা কমতে শুরু করে। মাসের কুড়ি দিনের পর আধপেটা খেতে হত। একদিন রামরাখাল এসে মেয়েকে জানালেন, তিনি আর জামাইকে কাজে রাখবেন না। টাইপের সিসে চুরি করে বিক্রি করছে। শ্রীমন্ত দেখেছিল দাদামশাইয়ের পা জড়িয়ে ধরে মায়ের কান্না আর অনুনয়। চাকরিটা যায়নি কিন্তু তিন মাসের মধ্যে ইহলোক ছেড়ে চলে গেলেন রামরাখাল। চিকিৎসা না করিয়ে সিফিলিস পুষে রাখার ফল সনৎ পেলেন, শ্রীমন্ত যখন মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। মস্তিষ্ক বিকৃতির নানান লক্ষণ অনেক দিন ধরেই সবার নজরে পড়ছিল। অবশেষে এক মাঝরাতে নগ্ন হয়ে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান এবং পরদিন সকালে সেই অবস্থায়ই তাঁকে ধরে পাড়ার কয়েকজন লোক বাড়িতে ফিরিয়ে আনে।
সনৎ সাত মাস আগে মারা গেছেন। শ্রীমন্ত অবশ্য দশ বছর আগে থেকেই পাগল বাবার সঙ্গে তার মা, তিন ভাই ও একটি বোনের সংসারকে টানতে শুরু করে দিয়েছিল। কৈশোর ফুরোবার আগেই তার ঘাড়ে এই বোঝাটা তুলে দেওয়ার জন্য সে বাবার উপর কখনো রাগ করেনি। কখনো কপাল চাপড়ে নিজের ভাগ্যকে পোড়া বলেনি। বরং সে প্রবলভাবে সামাজিক হওয়ার চেষ্টা করেছে, রঙ্গরসিকতার জন্য সবার প্রিয় হয়েছে, মেয়েদের সঙ্গে ফস্টিনস্টির সুযোগ পেলে তা ছাড়েনি এবং এক ধরনের নির্মমতাকে সে আয়ত্ত করে নিয়েছে, যেটা তাকে সাহায্য করে বাধাবিঘ্ন ঠেলে উপরে উঠে আসতে।
