ব্রজরাখাল রিকশাগুলো বেচে দিয়ে এখন চারখানি বাসের মালিক। ছাপাখানায় লাইনোর বদলে অফসেট মেশিন বসেছে। বাজারটা রূপান্তরিত হয়েছে চারতলা সুপার মার্কেটে। বস্তি দুটো অবশ্য আগের মতোই রয়ে গেছে। এক গুজরাতি প্রোমোটারের সঙ্গে কথাবার্তা চালাচ্ছেন চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি বানাবার ইচ্ছা নিয়ে।
কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি ব্যস্ত এবং উদবিগ্ন পুর নির্বাচন সম্পর্কে। গতবার বাম ও দক্ষিণ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পার্টিই তাঁকে কথা দিয়েছিল যদি ‘টাই’ হয় তা হলে তাঁকেই চেয়ারম্যান করে বোর্ড গড়বে। তেরোজন কমিশনারের জন্য নির্বাচনে, কংগ্রেসের ছয়জন, বামফ্রন্টের ছয়জন এবং নির্দল প্রার্থী হয়ে তিনি জিতেছিলেন। দশ দিন ধরে দুই পক্ষের প্রস্তাবগুলি বিবেচনা করে অবশেষে তিনি যান বামফ্রন্টে। চেয়ারম্যান পদের জন্য প্রতিশ্রুতিমতো বামফ্রন্ট তাঁকেই মনোনয়ন দেয়, কংগ্রেস দেয় সত্য মিশ্রকে।
সাত-ছয় ভোটে তাঁর জেতা হয়েই গেছে ধরে নিয়ে মিছিলের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। ফল হয়েছিল ঠিক বিপরীত। ব্রজরাখাল ছয়-সাত ভোটে হেরে গেছলেন। ক্রস ভোটিংয়ের ফলে সত্য মিশ্র জিতে যায়। বামফ্রন্টের কেউ একজন গোপন ব্যালটে নেওয়া ওই নির্বাচনে ডিগবাজি খেয়ে, ব্রজরাখালকে হাসির লক্ষ্যবস্তু করে দিয়ে, নিজেদের মধ্যের ঝগড়াটা খবরের কাগজে তুলে দিয়েছিল।
এবারের নির্বাচনে তিনি অতীব হুঁশিয়ার হয়ে শ্রীমন্তকে পাবলিসিটির দায়িত্বে রেখেছেন। ছেলেটা ঘাঁতঘোত জানে এবং বোনের ছেলে। রক্তের সম্পর্ক আছে বলেই তাঁর বিশ্বাস, পিছন থেকে ছুরি মারবে না। শ্রীমন্তর পরামর্শেই তিনি-
‘…আমাদের সৌভাগ্য, এই বয়সেও সতেজ এবং সুস্থ মস্তিষ্কে অকামামা, মানে অক্ষয়ধন মিত্র আমাদের মধ্যে উপস্থিত রয়েছেন।’
অকামামাকে সামনে রেখে নির্বাচনী অভিযান চালানোর প্ল্যানটা শ্রীমন্তরই। বলেছিল, ‘আপনিই ওকে বাড়িতে এনে রেখেছেন, খাওয়াচ্ছেন, পরাচ্ছেন, চিকিৎসা করাচ্ছেন। যখন যা চায় বছরের পর বছর দিয়ে আসছেন। এবার ওকে ভাঙিয়ে কিছুটা উশুল করুন।’
শ্রীমন্ত সাফ সাফ কথা বলে। এটাই ব্রজরাখালের পছন্দ। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বাড়িয়ে সময় নষ্ট করে না। কিন্তু অস্বস্তিও ধরে। ‘উশুল করুন’ কথাটা তাঁর কানে ভালো শোনায়নি। অন্যরকম ভাবে বক্তব্যটা পৌঁছে দিলে মনের মধ্যে খচখচানি ভাবটা আর আসত না। অকামামার কাছে তাঁর বাবা রামরাখাল কোন এক সময় চরম বিপদে নাকি সাহায্য পেয়েছিলেন বলেই বিপদটা যে কী ধরনের ছিল, সেটা কেউ জানে না, ব্রজরাখালও নন। অক্ষয়ধন তখন রাজি হননি। রামরাখাল মারা যাওয়ার পর তাঁর বিধবা স্ত্রী সুরুচি, কলকাতার শ্যামপুকুরের বাপের বাড়ি থেকে কান্নাকাটি করেই তাঁর ছোড়দাকে নিয়ে আসেন খুদিনগরে।
‘আমার বাবা, যার নামে এই বিদ্যায়তন, আজকের রজতজয়ন্তী বর্ষের উদবোধন হচ্ছে যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, এই শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠার প্রেরণা আমি পেয়েছিলাম আমার বাবা আর এনার কাছ থেকে।’
আবার ড্রামাটিক পজ। দর্শক-শ্রোতারা মঞ্চের ডান দিকে বিশেষভাবে রাখা, ঢাউস একটা সোফার জঠরে ঢুকে থাকা ছোটোখাটো লোকটির দিকে আর একবার তাকাল। মাথাটা কাঁচা-পাকা আধ ইঞ্চি উচ্চচতার চুলে ভরা। কামানো গাল, বয়সোচিত বলিরেখা পড়েনি। শীর্ণ গলায় কণ্ঠনালির কাছে চামড়া সামান্য ঝুলে পড়েছে। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যাম। চোখের রং ঈষৎ ধূসর। গেরুয়া ফুলহাতা খদ্দরের পাঞ্জাবি ও ধুতি, পায়ে চটি। ওঁকে দেখে বোঝা যায় না যে অষ্টআশি চলছে।
ব্রজরাখালের বক্তৃতা ওঁর কানে ঢুকছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। মেরুদণ্ড কখনো সোজা রেখে, কখনো সামনে ঝুঁকে, কখনো মাথাটা পিছনে হেলিয়ে অক্ষয়ধন অধৈর্যতা প্রকাশ করছেন।
‘এই বিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠা করি তখন খুদিনগর পুরসভা এলাকায় একটাও হাইস্কুল ছিল না। কী কষ্ট করে যে তখন একে চালিয়েছি, বাঁচিয়েছি তা জানেন শুধু তখনকার শিক্ষকমশাইরা। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন এখনও শিক্ষকতা করে যাচ্ছেন, তাঁদের জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন, ওই যে সামনেই বসে রয়েছেন বিমলবাবু, অনুকূলবাবু ওঁরা বলতে পারবেন…তখন পুরসভা, সরকারি শিক্ষা বিভাগ, কোথাও থেকে একটা টাকাও সাহায্য পেতাম না। কিন্তু আপনাদের শুভেচ্ছা, শিক্ষার জন্য আপনাদের আগ্রহ, সমর্থন যা না থাকলে কোনো পাবলিক কাজ করা যায় না তা আমি পেয়েছিলাম বলেই আজ এই বিদ্যায়তন রজতজয়ন্তী পালন করতে পারছে।’
ব্রজরাখাল এবার মঞ্চের নীচে, বাঁ দিকে রাখা টেবলটার দিকে তাকালেন। টেবলের তক্তার জোড়ে গোঁজা একটা পেস্টবোর্ডে লাল কালিতে মোটা হরফে বাংলায় লেখা ‘প্রেস’। তিনটি পুরুষ টেবলে বসে। ব্রজরাখালের ‘নিবেদন’ ছেপে বিলি করা হয়েছে, ওরা তাই পড়ছে। কিন্তু টিভি-র লোকজন কোথায়? বক্তৃতা কতক্ষণ আর চালাবেন! লোকেরা উশখুশ শুরু করেছে। ব্রজরাখালের চোখ সভার এধার-ওধার খুঁজতে লাগল শ্রীমন্তকে।
শ্রীমন্ত ঠিক তখনই স্কুল গেটের বাইরে রাস্তায় এসে দাঁড়াল। বয়স পঁচিশ-ত্রিশের মধ্যে। প্রায় ছয় ফুট, ব্যায়াম করে তৈরি শরীর, চোখা মুখ, ফাঁপানো কোঁকড়া চুল, চওড়া ঝুলফির সিল্কের চুড়িদার পাঞ্জাবির সঙ্গে মানানো গায়ের রং। কাঁধে মণিপুরী কাপড়ের ঝোলা। ওর সারা অবয়বে একটা কাঠিন্য আছে যেটা ঝরে পড়ে সামান্য একটু হাসলেই। শ্রীমন্ত তার হাসিটাকে তুরুপের মতো মাঝেমধ্যে ব্যবহার করে ফল পেয়েছে। দরকার বুঝে কণ্ঠস্বরকে সে উদাত্ত বা মিহি করতে পারে।
