প্রায় ছুটেই বিমল বেরিয়ে গেল। বেলা খালি ব্যাগটা খাটের উপর থেকে তুলতে গিয়ে দেখল, খাবারের বাক্সটা চ্যাপটা হয়ে ফেটে রয়েছে আর তার ফাঁক দিয়ে তন্দুরি চিকেনের একটা ঠ্যাং বেরিয়ে। বাক্সটা নিয়ে সে ছাদে গেল। পগারে ছুড়ে ফেলার পর নীচে নামতে নামতে দরজায় খুট খুট কড়ার শব্দ সে শুনতে পেল।
দরজা খুলেই বেলা বলল: ‘এত দেরি করে ফেরো কেন?’
পরদিন ভোরে বেলা যথারীতি স্কুলে বেরোল। স্কুলে যথারীতি পড়াল। একসময় দেবিকা জিজ্ঞাসা করল: ‘কখন ফিরলেন?’
‘তুমি যাবার মিনিট দশেক পরেই।’
যথারীতি সে, গীতা এবং অর্চনা পাঁচমাথার মোড়ে দাঁড়াল ছুটির পর।
‘হ্যাঁরে বেলা, তোদের ওদিকে একটা দারুণ ডাকাতি হয়েছে নাকি!’
‘বলাবলি করছিল বটে পাড়ার লোক, লাখ টাকা নাকি নিয়ে গেছে রাস্তার ওপর থেকে। আর কিছু জানি না, ভালো লাগে না এসব খবর শুনতে।’
এরপর তারা দেবিকা, গরম, হেডমিস্ট্রেস এবং জিনিসের দাম নিয়ে কথা বলল।
বেলা হেঁটেই বাড়ি ফিরল এবং তখন লটারিওলার দিকে তাকিয়ে সে একবার হেসেও ছিল।
বিমলের দোকান খোলেনি। কোনোদিনই আর খুলবে না। বেলা শুধু একবার মাথা নেড়ে ‘বেচারা’ শব্দটি আপনমনেই বলেছিল।
দাঁড়াবার জমি
‘আজ এখানে ভাষণ দেবে অগ্নিযুগের প্রখ্যাত বিপ্লবী’ যাঁকে দেশবাসী একসময় স্নেহভরে ‘অগ্নিপুত্র’ বলে ডাকতেন, যাঁকে বছরের পর বছর ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল, আমার সেই পরম শ্রদ্ধেয়, আরাধ্যও বলতে পারেন, কেননা ওঁর আদর্শে, বৈপ্লবিক মানবসেবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে, ওঁর সান্নিধ্যে মানুষ হয়েই আমি জনসেবার দীক্ষা গ্রহণ করি।’
বক্তা, ব্রজরাখাল মুখুজ্জে। স্থান, রামরাখাল উচ্চচ শিক্ষায়তনের বাইরের মাঠের মণ্ডপ। উপলক্ষ, শিক্ষায়তনের পঁচিশ বছর পূর্তিতে রজতজয়ন্তীর উদবোধন সভা। সারাবছর ধরে এই জয়ন্তী পালিত হবে।
ব্রজরাখাল একটানা কথাগুলো বলে থামলেন দম নেবার এবং মহলা দেওয়া অংশ মনে মনে ভেঁজে নেবার জন্য। শ্রীমন্ত বলে দিয়েছিল তিন জায়গায় ড্রামাটিক পজ নিতে। প্রথম পজটা ঠিক এই জায়গাতেই নিতে হবে কি না সেটা তার মনে পড়ছে না। নাই পড়ুক, সামনে তাকিয়ে চেয়ারে বসা এবং তার পিছনেও পাশে দাঁড়ানো শ্রোতাদের মুখ দেখে তাঁর মনে হচ্ছে, লেগেছে। কথাগুলো মনে লেগেছে।
ব্রজরাখাল খুশি হলেন শ্রীমন্তর উপর। তিনশো চেয়ার ভাড়া করা হয়েছে। সবই এখন ভরা। দাঁড়ানো ভিড়টাও ভালোই, শ দুয়েক হবে। পাঁচশো লোকের একটা মিটিং খুদিনগর মিউনিসিপ্যালিটির ইলেকশনের দেড় মাস আগে পাওয়া তো কল্পতরু বা চেরাপুঞ্জি লটারির চারটে ফার্স্ট প্রাইজের মতো!
রৌপ্যজয়ন্তীর উদবোধন, স্কুল জন্মের তারিখ ধরে করলে আরও এক মাস পরে হওয়া উচিত। কিন্তু বজ্ররাখাল এই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা-প্রেসিডেন্ট, যেহেতু স্কুলটি তাঁর বাবার নামে এবং স্কুল কমিটির দু-তিনজন বাদে সবাই তাঁর হাতের লোক, তাই ইলেকশনের তারিখ ঘোষণা হওয়ামাত্রই তিনি নির্বাচন অভিযানে পা ফেললেন রৌপ্যজয়ন্তীর উদবোধন করে। এই জয়ন্তীর পরামর্শটা তাঁকে দিয়েছে তাঁর ভাগনে, শ্রীমন্ত। ব্রজরাখাল জনসংযোগ সংক্রান্ত ব্যাপারগুলোয় ভাগনের পরামর্শকে খাতির করেন।
ব্রজরাখাল পজ ভেঙে আবার শুরু করলেন: ‘কারাগারে উনি ব্রিটিশ পুলিশের বহু নির্যাতন বরণ করেছেন, অনশন করেছেন, লাঠি খেয়েছেন, অপমান সয়েছেন কিন্তু ভেঙে পড়েননি, তাঁকে নোয়ানো যায়নি। ওঁকে অন্তরিন করেও রাখা হয়েছিল কিন্তু ওনার বৈপ্লবিক চেতনাকে বিনাশ করা যায়নি। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে এই অষ্টাশি বছর বয়সেও-‘
এইখানে আবার পজ আর বাঁ দিকে ঘুরে ড্রামাটিক্যালি হাত তুলে দেখানোর কথা। ব্রজরাখাল ঠিক তাই করলেন। সভার চোখও সেই দিকে ঘুরে গেল।
লম্বা মঞ্চের একদিক ঘেঁসে টেবল। সেখানে বসে আছে-সভাপতি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, প্রধান অতিথি জেলার প্রধান স্কুল পরিদর্শক, বিশেষ অতিথি স্থানীয় বিধায়ক, উদবোধক এই স্কুলের ছাত্র সিনেমা নায়ক স্বদেশ চট্টোপাধ্যায়, বিশিষ্ট দুই অতিথি রবীন্দ্র পুরস্কার পাওয়া অভিজিত ঘোষ আর ভারতের ফুটবল অধিনায়ক সুধেন্দু প্রামাণিক। এরপর একটা তিন ফুট উঁচু মঞ্চে বসানো রামরাখাল মুখুজ্জের দু-হাত লম্বা আবক্ষ তৈলচিত্র। ছবিটা একটু কাঁচা হাতেই ফোটো থেকে আঁকা। গৌরবর্ণ, গোলাকৃতি ক্ষুদ্র চোখ, চ্যাপটা নাক, উচ্চচ ললাট এবং টাকমাথার মধ্যে পুত্রকে তিনি দিয়ে গেছেন গায়ের রং, উঁচু কপাল এবং টাকটি আর বিষয়সম্পত্তি ও অর্থ। কিন্তু ব্রজরাখাল মনে করেন, এই সবই তুচ্ছ। উত্তরাধিকার হিসাবে বাবার দেওয়া ‘বিপ্লবীর ছেলে’ পরিচিতিটাই তাঁর সেরা পাওয়া। আলিবাবার চিচিং ফাঁকের মতো বহু বন্ধ দরজা খুলে দিয়ে এই দুটি শব্দ।
রামরাখাল মুখুজ্জেও বিপ্লবী ছিলেন। জেল খেটেছেন, পিস্তল চালিয়েছেন, সাম্যবাদী ও গান্ধীবাদী দুটিই হয়েছেন এবং কলকাতায় দুটি বস্তি, চল্লিশটি রিকশা, একটি ছাপাখানা এবং খুদিনগরে একটি বাজার, আট বিঘা জমি ও বিরাট একটি বাড়ি ও সেকেন্ডহ্যান্ড কেনা রোভার মোটরগাড়িটি রেখে একত্রিশ বছর আগে যখন মারা যান তখন তিনি খুদিনগরের এম এল এ। ব্রজরাখালের বয়স তখন বাইশ। বলা বাহুল্য বাবার কাছ থেকে পাওয়া জিনিসগুলো পুত্র বহুগুণ বাড়িয়েছে সময়ের স্রোতের সঙ্গে চমৎকার ভেসে থেকে।
