‘আর স্বামী?’
‘তোমার বউও তো ছেড়ে চলে গেছে।’
বেলা অবাক হয়ে গেল কথাটা বলেই। মুখ থেকে এমন ধরনের যুক্তি কত স্বচ্ছন্দে বেরিয়ে এল! তার মানে, তিমির কি তার কাছে গুরুত্বহীন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে না লক্ষ টাকার মালিক হবার জন্য সে সবকিছু করতে রাজি?
‘আপনি স্বামীকেও ছেড়ে দেবেন টাকার জন্য?’
‘সাগরিকা তোমায় ছেড়ে গেছে কেন?’
বিমলের বিস্মিত মুখ নিমেষে পাংশু হয়েই রাগে থমথমে হয়ে উঠল। পুরুষের দুর্বল জায়গায় আঘাত পড়েছে। বেলা সাবধান হল এবং হাসল।
‘আজেবাজে কথা বলে দেরি করিয়ে দিচ্ছেন।’
‘আজেবাজে কেন হবে, কাজের কথাই বলছি।’
”আমার বউয়ের চলে যাওয়ার সঙ্গে কী সম্পর্ক এই টাকার?’
অধৈর্য হয়ে বিমল হাতের মুঠো ঝাঁকাল। স্বর সামান্য চড়িয়ে ফেলেছে।
‘আস্তে কথা বলো পগার দিয়ে লোক যাতায়াত করে।’
গলা নামিয়ে কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে, যার কোনোই দরকার নেই, বিমল বলল:
‘সাগরিকার সঙ্গে প্রভাসের লটঘট চলছে আমি জানতুম…হ্যাঁ, বিয়ের আগে থেকে চলছিল। ওদের ব্যাপারটা না জানার ভান করে থাকতুম। সাগরিকাকে আমার সঙ্গে প্রভাসই ভাব করিয়ে দেয়; বিয়ে করলে টাকা দিয়ে দোকান করে দেবে বলায় বিয়ে করেছি। টাকা আমার দরকার, বেকার বসে থাকার চেয়ে এটা কী এমন খারাপ? ও আমাকে ছেড়ে যায়নি, আমিই ছেড়ে দিয়েছি। প্রভাসকেও বলেছি, এভাবে পালাবার কোনো দরকারই ছিল না।’
‘টাকার জন্যই এটা করেছ, আশ্চর্য আর আমাকেই কিনা বলছ টাকা ছেড়ে দিতে? তোমার যেমন টাকার দরকার, তেমনি আমারও দরকার।’
দেবাংশুকে মনে পড়ল। ব্যাপারটা কী অদ্ভুতভাবে যেন ঘটে গেল। এটা ঘটত না, যদি সে ভয়ে দিশাহারা হয়ে না পড়ত। দেবাংশুকে সে ভালোবাসে না তবু ওর হাতে শরীর তুলে দিয়েছিল। কী গ্লানিকর সমর্পণ। এটা নিজেকেই অপমান করা। নিজের মুখে থুথু দেওয়ার কোনো উপায় আছে কী?
‘দরকার।’
বিমল কুঁজো হয়ে এগিয়ে এল, বেলা মাথাটা পিছনে হেলিয়ে দেবার আগেই ওর হাতের দশটা আঙুল গলা চেপে ধরল।
বেলা দু-হাত গলার কাছে তুলে এনে মাথা নাড়ল। বিমলের দুটো হাতের আঙুলগুলো তার গলায় বেড় দিয়ে রয়েছে। ধীরে ধীরে চেপে বসছে। অস্পষ্ট একটা গোঙানি ছাড়া, বেলার আর কিছু করার ইচ্ছে হল না। বাধা দেবার জন্য শরীরের সামর্থ্য জড়ো করে তুলতে গিয়েও পারল না। সে ক্লান্ত বোধ করছে।
‘এইভাবে ওরা খুন করবে, হয় আমাকে নয় আপনাকে। যদি বাঁচতে চান তাহলে দিয়ে দিন…আমি ঝুঁকি নোব।’
আঙুলগুলো আগলা করল বিমল। ঘাড়ের গভীর দাগটা, তিন-চারটে পাকা চুল, বেলা দেখতে পাচ্ছে। ওর দু-চোখে ক্ষ্যাপাটে চাহনি, তাহলে সাহস জোগাড় করে ফেলেছে। পাঁচ মিনিটের জন্য…তারপর লাখপতি।’
বুলির কান্না শোনা গেল। বেলার অসাড় ইন্দ্রিয়গুলো এবার চারপাশের পৃথিবীকে গ্রাহ্যের মধ্যে পাচ্ছে। রেডিয়োতে খবর পড়ছে…বস্তিতে কীসের তর্ক চলছে…দরজায় লাথি মারছে কেউ পাশের বাড়িতে…পিসি থামাবার চেষ্টা করছে বুলির কান্না।
বেলা বাস থামাবার ভঙ্গিতে ডান হাতটা তুলে বিমলকে অপেক্ষা করতে ইশারা করল। গলা থেকে বিমল হাত নামাল।
‘থলিটা যে আমি নিইনি, টাকা যে আমার কাছে নেই এটা ওরা জানবে কী করে?’
বেলা বুঝতে পারছে, এতক্ষণে ঘটনার ঝড়ে তার মানসিক তরণী যে টালমাটাল অবস্থায় ছিল তা আর এখন নেই। ভারসাম্য রেখে তরতর করে এবার সে এগোতে পারবে। বিমলকে বিভ্রান্ত দেখাচ্ছে। পাঁচমিনিটের জন্য ওর সাহসী হয়ে ওঠা আর হল না।
‘আপনি খুব নোংরা কাজ করছেন, আপনি যে এত খারাপ তা আমি জানতুম না। ঘেন্না হচ্ছে আপনাকে দেখে। বাজারের মেয়েমানুষও আপনার থেকে সচ্চচরিত্র…আপনার মুখে থুথু দিতে ইচ্ছে করছে।’
‘দাও, কিন্তু টাকা আমি ছাড়ব না।’
‘ও টাকা আপনি ভোগ করতে পারবেন?’
‘তুমিই কী পারবে?’
‘আমি পালাব। কেউ খুঁজে পাবে না এমন জায়গায় চলে গিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করব…ব্যবসা করব, বিয়ে করব…আমার বয়স আছে, আপনার কী আছে? পালাবেন বলছেন, কোথায়? ওরা ঠিকই খুঁজে বার করবে?
বেলার মনে হল, বিমল বোধহয় ঠিকই বলছে। এ টাকা সে ভোগ করতে পারবে না। কোথাও পালাতেও পারবে না। শুধু একটা আতঙ্ক ছাড়া আর কিছুই তার লাভ হবে না।
‘আমাকে দেখতে না পেলেই ওরা বুঝে যাবে, আপনাকে ঝামেলায় ফেলবে না আর।’
‘এই টাকার জন্যই আমাকে আজ….’
‘কাউকে বলব না। এমন একটু-আধটু ফুর্তি লুকিয়ে চুরিয়ে সবাই করে।’
বিমল এগিয়ে এসে খাটের উপর থেকে বেলার হাতব্যাগটা তুলে নিল। বেলা শূন্য দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে রইল।
ব্যাগ খুলে উপরের জিনিসগুলো বার করতে করতে থমকে সে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। তারপর বেলার মুখের দিকে তাকাল।
‘এই কী সব? পুরো এক লাখ?’
বিমলের হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বেলা চাবি বার করল। ব্যাগটা আবার ফেরত দিল ওকে।
ট্রাঙ্কটা বার করে দাও।’
বিমল হ্যাঁচকা টানে খাটের নীচ থেকে ট্রাঙ্কটা বার করে আনল।
‘পালাবে? কিন্তু ওরা তোমায় খুঁজে বার করবেই।’
‘দেখা যাক।’
আটটা তাড়া আর চারটে বান্ডিল বুকে চেপে ধরে বিমল থরথরিয়ে কাঁপছে আর হাসছে। এত ভয়ংকর বীভৎস হাসি বেলা কখনো কারোর মুখে দেখেনি।
‘সাহস এইবারই দেখাতে হবে, আমার লাস্ট চান্স।’
‘বুলিকেও নিয়ে যাবে তো।’
‘পাগল! ও সঙ্গে থাকলে একদিনেই ধরা পড়ে যাব। ওকে আপনারাই দেখবেন নয়তো ওর মা-র কাছে পাঠিয়ে দেবেন।’
