ধীরে ধীরে বেলার চোখ দুটি মুদে এল এবং দুটি হাত উঠে এসে জড়িয়ে ধরল দেবাংশুর গলা। দুটি পা ছড়িয়ে দিয়ে যেন সে বলতে চাইল-আর কত সাহসী হতে পারি? বদলে, অস্ফুটে বলল: ‘আস্তে…লাগছে।’
এবং সেই মুহূর্তে সে মুখ ফিরিয়ে একবারের জন্য বন্ধ চোখ খুলে জানলায় তাকাল।
মনুষ্যাকৃতির মতো একটা গাঢ় ছায়া, তার মনে হল, জানলার কাছে নিথর হয়ে রয়েছে। চিৎকার করে, ‘কে ওখানে’ বলতে গিয়েও পারল না। গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। জিভটা ভিতর দিকে টানা রয়েছে। শুধু চাপা গোঙানির মতো একটা আওয়াজ মুখ থেকে বেরিয়ে এল।
শরীরের উপর আর একটা শরীর দাপাচ্ছে কিন্তু বেলা কিছুই অনুভব করছে না। একদৃষ্টে সে জানলার দিকে তাকিয়ে। মনে হল, ছায়াটা একটু এগিয়ে এল। দৃষ্টিকে তীক্ষ্ন করে সে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল ওটা জীবন্ত কোনো প্রাণী না অন্য কিছু।
‘বেলা বেলা বেলা…’
দেবাংশু তার উন্মুক্ত বুকে মুখ রগড়াচ্ছে। বেলা কোনো শিহরণ বোধ করছে না।
‘এত ঠান্ডা, এত কোল্ড কেন?’
বেলা স্থির চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে এবং ভয়ের প্রথম বিহ্বলতা কাটিয়ে যখন উঠছে…দপ করে ঘরের আলো জ্বলে উঠল।
এক কী দুই সেকেন্ডের জন্য বেলা মুখটা দেখতে পায়। জানলার রডের ফাঁক দিয়ে সে নির্ভুল চিনেছে।
ছিটকে উঠে পড়েছে দেবাংশু। হাঁটুর কাছ থেকে নিমেষে প্যান্টটা টেনে তুলে নিল।
‘এমন হঠাৎ যে কারেন্ট এসে পড়বে…’
প্যান্ট ঠিক করতে করতে বিরক্ত অপ্রস্তুত দেবাংশু চারপাশে তাকাল এবং বেলার শাড়ি পা পর্যন্ত নামিয়ে দিল। বেলা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে জানলার দিকে । তারপর দু-হাতে চোখ ঢেকে ফেলল।
কতক্ষণ কেটে গেছে। দেবাংশু কী যেন বলার চেষ্টা করছিল। কখন চলে গেল, বেলা কিছুই জানে না। সে উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে শুধু ভেবেই গেছে-এবার কী হবে। আর বার বার চোখে ভেসে উঠেছে, সাগররিকার সেই চাহনি। ছাদ থেকে জানলা দিয়ে সে যা দেখেছিল, ঠিক সেই দুটি চোখই কী তখন তার নিজের…
দরজার কাছে খসখস শব্দ আর গলা খাঁকারি।
‘টাকাগুলো আমার চাই।’
বেলা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়েই কেউ বলল কী?
‘নীল রঙের একটা থলে…’
বেলা মুখ তুলে তাকাল। ঘরের মধ্যে বিমল দাঁড়িয়ে। জ্বরে পোড়ারোগীর মতো চোখ, একটু কুঁজো হয়ে ঝুঁকে নিজেরই দুটি তালু আঁকড়ে নিজেকে সামলাচ্ছে।
‘কে বলল আমার কাছে আছে?’
‘আমি বলছি। আজ সন্ধেবেলা একটা লোক আমাকে দোকান থেকে ডেকে গাড়িতে তুলে গঙ্গার ধারে নিয়ে গেল।’
বিমলের মুখটা তার বলার সঙ্গে সঙ্গে বদলাচ্ছে। বেলার মনে হল, ওর গালে দু-তিনটে নতুন ভাঁজ, যার একটিও আগে ছিল না। চোখে এবার পাগলামির ছায়া। কাঁধটা কুঁকড়ে যাচ্ছে কুঁজো হয়ে রয়েছে। শুধু শান্ত হয়ে দুটো হাত।
‘দু-জন দুটো পিস্তল পেটে ঠেকিয়ে আমার কাছে থলিটা চাইল। সেদিন আমি তখন দোকানে বাড়িতে আপনি ছাড়া কেউ নেই…চটপট থলেটা এবার বার করে দিন।’
‘কিন্তু আমি তো থলে…’
‘পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি…ওরা আমাকে দুদিন সময় দিয়েছে। আমি দেব ঠিক পাঁচ মিনিট। দোকান বন্ধ করে অন্ধকারে বসেছিলাম। আপনাদের আসতে দেখে আমিও পিছু পিছু বাড়ি ঢুকি। ঘরের আলো জ্বালালেন না দেখে জানলায় গিয়ে…আর কথা বাড়াব না, বার করুন। আমাকে দুদিন সময় দিয়েছে।’
‘তোমার কী মাথা খারাপ হয়েছে?’
বিমল বিনা শব্দে হাসল, বরং বলা যায় ব্যাদন করল। বেলা খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। চোখ থেকে বোঝা যাচ্ছে বিমল বদ্ধপরিকর।
‘তুমি ধরে নিয়েছ ওরা যা বলছে তাই সত্যি। এই বাড়িতে নীল রঙের থলে কোথা থেকে আসবে?’
বিমল তো পাঁচ মিনিটের জন্য সাহস ধরে রাখবে। বেলা ভাবল, আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সহ্য করেছি অসহনীয় যন্ত্রণা। এত সহজে কেন টাকাগুলো তুলে দেব ওর হাতে!
‘ওদের একজন পালাবার সময় ফেলে দিয়ে গেছে।’
‘বাজে কথা। তোমাকে ভড়কি দিয়ে পরীক্ষা করেছে।’
বিমলের চোখে দ্বিধা। এইবার সে গোলমালের মধ্যে পড়েছে।
‘তোমাকে ভাঁওতা দিয়ে ওরা দেখছে।’
‘কীসের ভাঁওতা? ওদের যে লোক ফেলে গেছে সেই বলেছে। আর থলিটা অন্য কেউ তো পাবে না এই বাড়ির লোক ছাড়া, পুলিশেও পায়নি।…আপনার চাবিটা দিন সব খুলে দেখব।’
‘কেউ পায়নি মানেই কি আমি পাব?’
‘তা ছাড়া আর কে পাবে?’
বেলা বুঝতে পারছে এই নিয়ে তর্ক করা বৃথা। বিমল বুঝেই গেছে টাকা তার কাছে।
‘যদি আমি না দিই।’
এবার বিমলের ভঙ্গি ধীরে ধীরে নরম শিথিল হয়ে এল।
‘ওরা তাহলে আপনার সঙ্গে দেখা করবে, আমি বলে দেব।’
‘ওরা কি আমায় খুন করবে?’
‘নিশ্চয়।’
‘টাকা কী তাহলে পাবে? আমি যদি অন্য কোথাও সরিয়ে ফেলি…কালকেই।’
‘সেখানে ওরা যাবে।’
‘ওরা কী জানে আমিই থলিটা সরিয়ে রেখেছি?’
‘ওদের ধারণা আমিই রেখে দিয়েছি, আমার কথা অবশ্য বিশ্বাস করেনি ওরা…কিন্তু আমি তো জানি আমি নিইনি।”
‘ওরা আমাকে জিজ্ঞাসা করলে বলব, তুমিই সরিয়ে রেখেছ। আমি নিজে চোখে দেখেছি একটা নীল থলি উঠোনে পড়েছিল, সেটা তুমি দোকান থেকে ফিরে কুড়িয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকলে।…তাহলে?’
‘একটি কথা যদি আর বলেন, তাহলে যা আমি দেখলুম…আপনার স্বামী, পাড়ার লোক, আপনার স্কুলে…’
”বলে দেবে? তাতে আর কী হবে, নয় চাকরিই ছেড়ে দেব, পাড়াও ছেড়ে চলে যাব।”
