শিব দত্ত লেনের মুখেই ট্যাক্সি থেকে ওরা নামল। ব্যাগ এবং বাক্সটা বেলার হাতে। মিটারের আলো জ্বেলে সহকারীটি পড়ার চেষ্টা করছে। দেবাংশু একটা দশ টাকার নোট ড্রাইভারের দিকে ছুড়ে দিয়ে ফেরত অর্থের জন্য অপেক্ষা করল না।
‘চলুন।’
বেলার হাত থেকে সে প্রায় ছিনিয়েই নিল ব্যাগ এবং বাক্সটা। ফুটপাতে জটলা করছে কিছু ছেলে। বেলার মনে হল, বিমলের দোকানে যেন অন্ধকারই দেখেছে। লোডশেডিংয়ের জন্য কী বন্ধ করে দিয়েছে? অবশ্য ফুটপাথের দোকান বন্ধ করা বা না করা একই কথা। শুধু উনুনটা ছাড়া আর সব কিছুই, একটা কাঠের বাক্সে ভরে পাশের গ্যারেজে রেখে আসে।
শিব দত্ত লেন যেন আরও অন্ধকার। পাশের লোককেও ঠাওর করা যায় না। কর্পোরেশনের এবং ইলেকট্রিকের লোকেদের খোঁড়াখুঁড়ির জের হিসেবে কতকগুলো ঢিবি এবং গর্ত ইতস্তত ছড়ানো আছে। বেলার সেগুলো মুখস্থ।
এমন অন্ধকারে যদি কেউ বা কয়েকজন তাদের ঘিরে ধরে! দেবাংশুর গায়ের জোর কী পারবে ওদের ঠেকাতে? ছুরি মেরে তারপর বোমা ছুড়ে হয়তো পালাবে। ছুরি কি ভেদ করতে পারবে দেবাংশুর অমন পাথুরে শরীর?
‘আপনি এই দিকে আসুন, গর্ত আছে।’
‘তার থেকে বরং…’
দেবাংশু ওর বাহু ধরল।
‘এখন আমি একদমই অন্ধ, পথ দেখান।’
বেলা কিছুটা আশ্বাস পেল যেন ওর ছোঁয়া পেয়ে।
‘মনে রাখবেন এখন আমি আপনার বডিগার্ড।’
দেবাংশুর হাত ওর কোমর বেড় দিয়ে ধরার চেষ্টা করছে। বেলার মনে হল, কেউ একজন আসছে সামনে থেকে। হাতটা সে সরিয়ে দিল। কয়েকটা বাড়ির খোলা জানলা দিয়ে আসা হারিকেন আর মোমবাতির আলো গলিতে আবছা একটা ছায়া তৈরি করেছে। কেউ তীক্ষ্ন চোখে তাকালে তাদের নিশ্চয়ই দেখতে পাবে।
‘আপনি এখনও রেগে।’
সত্যিই একটি লোক আসছিল।
‘কে রে, মনু নাকি?’
লোকটি অপ্রতিভ হয়ে ‘আ যা অন্ধকার’ বলে এগিয়ে গেল।
‘বডিগার্ডের কাজটুকু) করতে দেবেন না?’
‘আমরা এসে গেছি।’
আরও দুটো বাঁক, কিন্তু ওকে নিরস্ত রাখতেই এটা বলা। একটু তফাত হল দেবাংশু।
‘এই জায়গাটাই বড়ো ভয় করে, আলো থাকলেও। এখানে ছিনতাই কী খুন করে গেলেও, চট করে বোঝা বা ধরা যাবে না।’
দেবাংশু হাত ধরে ওকে সামনে টেনে আনল।
‘আপনি আগে চলুন।’
বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বেলার বুকটা একবার কেঁপে উঠল। কেউ এখনও ছুরি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েনি বা ঘিরেও ধরেনি। তবে কি বাড়ির মধ্যে ওৎ পেতে আছে?
‘আপনি তালাটা খুলুন?’
‘কেউ কী নেই বাড়িতে?’
অন্ধকারেই চাবির গুচ্ছ থেকে তালার চাবিটা বার করে দেবাংশুর হাতে দিয়ে এবং ওর হাতের জিনিস দুটো নিতে নিতে বেলা বলল: ‘উনি আরও পরে অফিস থেকে ফেরেন। ওর কাছেও একটা চাবি আছে।’
তালাটা খুলে দেবাংশু পাল্লা দুটো মেলে দিল। ভিতরে আরও ঘন অন্ধকার। বেলা বুকের কাছে আঁকড়ে ধরল ব্যাগটা, ভিতরে ঢুকতে তার ভয় করছে।
‘আপনি দেশলাইটা জ্বালুন।’
‘নেই, আমি সিগারেট খাই না।’
দেবাংশু দুটো ধাপ উঠে গেল।
‘এবার কোনদিকে, আমি তো এই প্রথম।’
‘দাঁড়ান, আমি আগে যাই।’
দরজা পেরিয়েই বেলা ধমকে দাঁড়াল। কান পাতল কোনো পায়ের বা কারোর শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ যদি শোনা যায়। বিমলদের দিক থেকেও কারোর কণ্ঠস্বর কী বাসন নাড়ানাড়ির শব্দ এল না। ওর মনে হল, একটা রাক্ষস ধরনের বিরাট জন্তুর হাঁ-এর মতো সামনের সরু দালানটা, এগোলেই তাকে গিলে ফেলবে।
খসখস শব্দ সে যেন শুনতে পেল। আরশুলা? এ বাড়িতে অনেক আছে। কী একটা আবছা, যেন মানুষেরই মূর্তি… বেলা পিছিয়ে যেতেই ধাক্কা খেল দেবাংশুর দেহে আর সঙ্গে সঙ্গে দুটো হাত পিছন থেকে তাকে জড়িয়ে ধরল।
‘ভয় কী, আমি তো আছি।’
জীবনে এই প্রথম বেলা এমন আশ্বাসদায়ক কথা শুনল। কথা দুটো তার মর্মে যে ঘূর্ণি তুলল, তা তাকে কাঁপিয়ে দুলিয়ে নিরাপত্তার জন্য অতলে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল। আর মনে হল, একটা আগ্নেয় পাহাড় যেন তাকে আড়াল করে আশ্রয় দিচ্ছে। কর্কশ, রুক্ষ পাথরের সঙ্গে ঘর্ষণে তার দেহ ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, তবু তো একটা কঠিন শক্তির আড়াল সে পেয়েছে। আততায়ী যেকোনো সময় ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। ওরা ছাড়বে না, খোঁজ নিয়ে এখানে আসবেই। এখন তার সাহায্য চাই, নির্ভর করার জন্য কাউকে চাই এবং কী দারুণ পুরুষ এই দেবাংশু!
‘দরজাটা বন্ধ করুন।’
বেলার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে দেবাংশুর দুই বাহুর প্রচণ্ড চাপে। শিথিল হাত থেকে ব্যাগ আর বাক্সটা পড়ে যাচ্ছিল প্রায়, কোনোক্রমে সে বলতে পারল: ‘ঘরে…।’
আলিঙ্গন আলগা হয়ে গেল। বেলার পিছনে সন্তর্পণে পা ঘষড়ে কাঁধে হাত রেখে সে ঘরের মধ্যে এল। হাঁফাচ্ছে।
‘আপনি এবার চলে যান।’
‘কেন?’
বেলা খাটের দিকে সরে গেল। ব্যাগ আর তন্দুরি চিকেনের বাক্স খাটের উপর রাখল।
‘কেউ দেখতে পায়নি আমি এসেছি। কেউ দেখতে পাবে না যখন চলে যাব।’
দেবাশু ওর সামনে দাঁড়িয়েছে।
‘তবু…’
বেলা শেষ করতে পারল না কথাটা। ততক্ষণে সেই নির্ভরযোগ্য অধৈর্য পাহাড় তার উপর ভেঙে পড়েছে। খাটের উপর এলিয়ে পড়তে পড়তে বেলা তাকাল উঠোনের দিকের জানলা দিয়ে। অন্ধকার উঠোনের ওপারে বিমলের ঘরের দেওয়ালটা লম্পোর আলোয় কাঁপছে।
বেচারা! শুধু একটু সাহস ও চায়। সাহস তার নিজেরও কী ছিল? নীল থলিটা পাবার আগে পর্যন্ত… বেলা তার ব্লাউজের বোতাম ছেঁড়ার শব্দ শুনতে শুনতে ভাবল, আমি কী ছিলাম।
