‘কোলের উপর এগুলো রেখেছেন কেন, দিন।’
দেবাংশু তুলে নিয়ে তার পাশে ব্যাগ আর বাক্সটা রাখল। বেলা দরজার দিকে সরে যাবার চেষ্টা করতে গিয়ে পারল না। দেবাংশু তার বাহু ধরে আছে এবং ক্রমশ কাছে টানছে।
‘আজ একটা অন্যায় করেছি।’
কানের কাছে দেবাংশুর মুখ। সেই ঝাঁঝালো গন্ধ, বিয়ারেরই বোধ হয়।
‘মদ খাইয়েছি।’
‘কাকে?’
‘তোমাকে।… খুব অল্প, এত অল্প যে নেশা হবে না গন্ধও মুখে হবে না।’
বেলা পাথরের মতো জমাট বেঁধে গেল। তার বুকের উপর দিয়ে দেবাংশুর আঙুলগুলো নড়াচড়া করছে, নেমে যাচ্ছে তলপেটে-এ সব কিছুই সে অনুভব করছে না। এখন তার দেহ বড়ো ধরনের যেকোনো অপারেশন তাকে অজ্ঞান না করেই বোধহয় করা যায়।
মাথাটা কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে তার। মদ শব্দটাকে সে ছোটোবেলা থেকে ভয় পেয়েছে, ঘৃণা করেছে। আর আজ, সে কয়ফোঁটাই হোক, সে নিজে পান করল। আশ্চর্য, কী অদ্ভুতভাবে সে বদলে যাচ্ছে! কোনো অনুশোচনা, অনুতাপ তাকে দগ্ধ করার জন্য জ্বলে উঠছে না, তাকে অপরাধীর গ্লানিতে বিষণ্ণ করছে না। অজান্তে নাকি কোনো কিছুই দোষণীয় নয়। কিন্তু এই মুহূর্তে তার শরীরটাকে পাশের এই লোকটির হাতে ছেড়ে দেওয়া-নিশ্চয় অজান্তে নয়। কিন্তু নীল থলিটা কী অজান্তেই সে তুলেছিল?
ট্রাফিক লাইটে ট্যাক্সি থেমেছে। তাদের দু-পাশে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছে। বাঁদিকে একটা মোটরে বোধ হয় স্বামী-স্ত্রী। প্রৌঢ়। নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। ডানদিকে বেলার তিন হাত দূরে একটা ডাবল-ডেকার বাস। মুখ তুলতেই সে দেখল বাসের একতলার জানালায় দুটি কৌতূহলী পুরুষ মুখ জুলজুলে চোখে ট্যাক্সির ভিতরে তাকিয়ে।
বেলা ঝটকা দিয়ে দেবাংশুর হাত সরিয়ে দিল। তার মনে হল, বাসের মুখ দুটো হাসিতে যেন ভরে গেল প্রত্যাশিত দৃশ্যটি দেখতে পেয়ে।
‘এবার আপনি রেগেছেন।’
‘হ্যাঁ বাড়াবাড়ি হচ্ছে।’
চাপা স্বর দু-জনেরই। সামনের দুটি লোক সম্পর্কে দু-জনেই সচেতন। কাঠের মতো বেলা বসে। দৃষ্টি সামনে। বাসের লোক দুটো নিশ্চয় এখনও তাকিয়ে।
ট্রাফিক আলোর মুক্তি সংকেত পেয়ে গাড়ি চলতে শুরু করার পর বাসটা পিছিয়ে পড়তেই বেলা হাঁফ ছাড়ল। অনেকক্ষণ কেউ আর কথা বলল না।
এসপ্ল্যানেড, বউবাজার, মহাত্মা গান্ধী রোড পেরিয়ে বিবেকানন্দ রোডের মোড় থেকে সামনের দিকে তাকিয়ে বেলার মনে হল, দূরে অন্ধকার লোডশেডিং। ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকের মধ্যে। তাদের পাড়াতেও তাহলে অন্ধকার।
এতগুলো টাকা নিয়ে অন্ধকারের মধ্যে রাস্তায় নামা, গলি দিয়ে যাওয়া দরজার তালা খুলে অন্ধকার বাড়িতে ঢোকা…যদি ওরা ওৎ পেতে থাকে?
ট্যাক্সি থেকে নেমে গলির মধ্যে ঢুকে কয়েক পা এগোতে-না-এগোতেই তিন-চারজন ঘিরে ধরবে অন্ধকারে। একটা ছুঁচলো শক্ত কিছু পেটে ঠেকবে।
‘টাকাগুলো এখুনি চাই… কোথায় রেখেছেন।’
ফিসফিস করে একজন বলবে।
‘কিসের টাকা?’
‘ন্যাকামো থাক, এইখানেই লাশ পড়ে যাবে যদি এখুনি টাকা না পাই।’
ছুরিটা পেটে চেপে ধরবে আর একটু।
‘চলুন বাড়ির দিকে….চ্যাঁচামেচি করলেই…’
‘কিন্তু আমি তো…’
‘আবার মিথ্যে কথা…টাকা পেয়ে গেলে কিচ্ছু করব না… চলুন।’
কিংবা ওদের কেউ হয়তো পাঁচিল টপকে বাড়িতে ঢুকে অপেক্ষা করছে। এ সময় বাড়িতে পিসি আর বুলি ছাড়া কেউ থাকে না। বিমল চায়ের দোকানে। তিমির তো ফিরবে প্রায় আটটায়।
দরজা খুলে ঢোকামাত্রাই লুকিয়ে থাকা আততায়ী সোজা তার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেবে ছুরিটা। তারপর ব্যাগটা কুড়িয়ে ভিতরে পাবে কুড়ি হাজার টাকা আর চাবির গোছাটা। চাবি দিয়ে দেরাজ খুলবে তারপর ট্রাঙ্কটা। কিংবা খুন না করে, বুকে ছুরি ঠেকিয়ে ঘরের মধ্যে নিয়ে যাবে।
‘বার করুন টাকার থলিটা।’
‘আমি কিচ্ছু জানি না।’
‘কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন?’
টর্চের আলো সারা ঘরে বোলাবে। দেরাজের পাল্লা টেনে খুলবে। কাপড়গুলো ছুড়ে ছুড়ে ফেলবে। বন্ধ ড্রয়ারের চাবি চাইবে। ব্যাগ থেকে সে চাবি বার করে দেবে।
ড্রয়ারে কিছুই পাবে না। কিন্তু খাটের নীচে ট্রাঙ্কটা এবার দেখতে পাবে।
‘খুলুন ওটা।’
‘বলেছি তো আমি কিছু জানি না।’
‘চটপট খুলুন। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, আমরা ওয়াচ রেখেছি আপনার উপর, আপনি কোথা থেকে আসছেন তাও জানি, একশো টাকার নোট বার করে বিল দিয়েছেন তাও টেলিফোনে খবর পেয়ে গেছি।’
বেলা আঁকড়ে ধরল দেবাংশুর হাত।
‘বাড়িতে পৌঁছে দেবেন? কী অন্ধকার দেখেছেন? সঙ্গে অতগুলো…আমাদের পাড়াটা ভালো নয়।’
দেবাংশু হাতটা চেপে ধরল নরমভাবে, কৃতজ্ঞতায়।
‘রাগ করে থাকলে কি বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া উচিত?’
‘না না, রাগ নয়, আসলে তখন পাশের বাস থেকে…আপনার কার্যকলাপ ওয়াচ করছিল।’
বেলা ষড়যন্ত্রীর মতো দেবাংশুর মুখের কাছে মুখ এনে বাকিটুকু বলল: ‘মদ খাইয়ে যে অপরাধ করেছেন তার শাস্তি এটা।’
‘এমন শাস্তি পাবার জন্য জন্ম জন্ম অপরাধ করতে রাজি…বাঁয়ে গ্রে স্ট্রিট দিয়ে।’
ট্যাক্সি বাঁদিকে ফিরল। ঘন অন্ধকারকে মাঝে মাঝে ছেঁদা করে দিচ্ছে দোকানের হারিকেন বা মোমবাতির আলো। পথের মানুষগুলো ট্যাক্সির হেড লাইটের আলোর মধ্যে এসেই পিছনে চলে যাচ্ছে ভৌতিক দৃশ্যের মতো মিলিয়ে গিয়ে। বাড়িগুলোর জানালায় ম্লান হলুদ চৌকো মোমবাতি বা হারিকেনের আলো। সামনের সিটে নির্বাক দুটি অপমানিত, প্রহৃত মানুষ। সন্ত্রস্ত কুকুরের ডাক ভেসে আসছে গলির মধ্য দিয়ে।
