‘চলুন না আর একটু এগিয়ে এসপ্ল্যানেডের দিকে যাই।’
‘আপনার তো ভীষণ তাড়া আছে ফেরার।’
‘আছে, তবে আপনি যতটা রেগেছেন ততটা ভীষণ নয়।’
‘কে বললে রেগেছি?’
‘কেউ বলে-কয়ে রাগে না। ওটা বোঝা যায়।’
‘ওহ আপনার টাকাগুলো তখন থেকে হাতেই রয়ে গেছে।’
দেবাংশুর বাড়ানো হাত থেকে নোটগুলো এবং তন্দুরি বাক্সটা নিয়ে বেলা বিরল ধরনের স্বস্তি বোধ করল। একশো টাকার নোটগুলোর প্রথমটি নিরাপদে ভাঙানো গেছে। এবার একে একে বাকিগুলোও ভাঙানো যাবে। আটশো নোট, অনেকদিন সময় লাগবে। ফ্রিজ বা টিভি ধরনের বড়ো কিছু সে কিনতে পারবে না, তাহলে অনেকগুলো নোট একসঙ্গে বার করতে হবে। সেটা নিরাপদ হবে না। তা ছাড়া তিমিরও রয়েছে তাকে কী বলে বোঝাব?
‘ট্যাক-সিইই।’
দেবাংশু চিৎকার করে হাত তুলে ছুটে গেল ধীর গতিতে চলা এক খালি ট্যাক্সির দিকে। ট্যাক্সিওয়ালা গাড়ি থামিয়েছে। দেবাংশু জানলায় ঝুঁকে কথা বলছে। বেলা দ্রুত এগিয়ে যেতে যেতে দেখল কয়েকজন পথচারী মুখ ফিরিয়ে ট্যাক্সির দিকে তাকাচ্ছে, দু-তিনজন থেমেও পড়েছে।
‘আর একটি কথাও নয়, যেখানে যেতে বলছি চলো।’
বেলা দেখল দেবাংশুর মুঠোর মধ্যে ট্যাক্সিওয়ালার গলা, চোখ দুটো ঠিকরে বেরোতে চাইছে। ঠোঁট ফাঁক হয়ে রয়েছে। তার সহকারীটি দেবাংশুর হাত ধরে টানতে টানতে চিৎকার করছে: ‘মেরে ফেলবেন নাকি, এ কি কাণ্ড, ছাড়ুন বলছি…পুলিশ ডাকব।’
‘ডাক তোর পুলিশ।’ দেবাংশু বাঁ হাত নেড়ে বেলাকে ইশারা করল ‘উঠুন।’
ট্যাক্সিওয়ালা শীর্ণকায় যুবক। তখনও তার মাথাটি পিছনে হেলানো সিটের সঙ্গে লেপটে রয়েছে। চোখে ভয় এবং বিস্ময়। দরজা খুলে বেলা ভিতরে ঢুকেছে দেখে দেবাংশু গলা থেকে হাতটা তুলে সেই হাতের উলটো দিক দিয়ে সহকারীটির গালে আঘাত করল। সে সিটের কোণে সরে গেল।
বিরাট চেহারাটাকে ভারী নিশ্বাসে ফুলিয়ে দেবাংশু কয়েক সেকেন্ড ফুটপাতে জড়ো হওয়া ছোটো ভিড়ের দিকে তাকিয়ে থেকে, ট্যাক্সিটার সামনের দিক ঘুরে দরজা খুলে পিছনের সিটে বসল।
‘চলো।’
ড্রাইভার গুম হয়ে রয়েছে। সহকারীটি গালে হাত বোলাতে বোলাতে তিনজনের মুখের দিকে পর পর তাকাচ্ছে।
‘কী হল?’
গর্জনের মতো শোনাল দেবাংশুর স্বর। ড্রাইভার মুখ না ফিরিয়েই বলল: ‘যাব না।’
দেবাংশুর ডান হাত ড্রাইভারের ঘাড়ের দিকে এগোবার সময় বেলার বাম বাহুতে ধাক্কা দিল।
‘আহ হ…’
‘আর এক সেকেন্ড দেরি করলে ঘাড় ভেঙে দোব।…. ভাড়া দোব, যেখানে যেতে বলব যাবে, একটি কথাও নয়।… পুলিশটুলিশ আমিই ডাকব তবে ঘাড়টা ভেঙে দেবার পর।’
‘লাগছে, ছাড়ুন।’
ট্যাক্সিওয়ালার স্বরে এমন একটা আর্তনাদ ছিল যা বেলাকে মমতায় অভিভূত করল। দেবাংশুর বাহুটা দু-হাতে আঁকড়ে টেনে নিয়ে, ধরে রইল।
‘করছেন কী। কিছু একটা হয়ে যায় যদি?’
‘হোক না। কলকাতার ট্যাক্সিওলাদের বদমাইসি…ওদের পছন্দমতো জায়গা না হলে ওরা যাবে না, কেন?’
ট্যাক্সি চলতে শুরু করেছে।
‘সোজা সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যু দিয়ে গ্রে স্ট্রিট তারপর আহিরীটোলা।’
দেবাংশু হেলান দিয়ে শরীরটা শিথিল করে দিল। ব্যাগ এবং বাক্সটা বেলার কোলে। তার কাঁধের সঙ্গে কাঁধটা লাগানো। ডান বাহুটা তখনও দু-হাতে বেলা ধরে আছে। তার বাম স্তনের প্রায় উপরেই ভারী পেশির দপদপানিটাকে মনে হচ্ছে যেন সন্তর্পণ স্পর্শ। ওর তালুটা পড়ে রয়েছে তার বাম ঊরু ঘেঁষে।
কিছুটা কৌতূহলেই বেলা, আঙুলের বেড় দিয়ে ধরার চেষ্টা করল দেবাংশুর বাহুটা। অর্ধেকও এল না মুঠোর মধ্যে। পাথরের মতো শক্ত, মসৃণ। আঙুলগুলো সে কাঁধ পর্যন্ত নিয়ে গেল। কচ্ছপের পিঠের মতো একটা জায়গা, ক্রমশ ফুলে উঠে নেমে গেছে ঘাড়ের দিকে।
‘আপনি সত্যিই রেগেছেন।’
বেলা ফিসফিস করে বলল।
‘এখনও বোঝা যাচ্ছে?’
‘হ্যাঁ যাচ্ছে।’
বেলা দু-আঙুলে বাহুর পেশি টেপার চেষ্টা করল। আঙুল ডেবে বসছে না।
‘এখনও রেগে আছেন।’
দেবাংশু মুখ ফিরিয়ে তাকাল। বেলা মৃদু একটা ঝাঁঝালো গন্ধ পেল ওর মুখ বা নিশ্বাস থেকে, যা কখনো তার ঘ্রাণে আসেনি। কখনো সে এমন কঠিন, পুষ্ট পুরুষ পেশিকে ছোঁয়নি। এত বছরের জীবনে, এমন একটা জায়গায়, পরপুরুষের সঙ্গে মুখোমুখি বা পাশাপাশি বসবে স্বপ্নেও ভাবেনি। এ সবই ঘটে যাচ্ছে ওই নীল থলিটা কুড়িয়ে নেওয়ার পর থেকে। কীভাবে যে সে বদলে যাচ্ছে, নিজেও বুঝতে পারছে না। সুপ্ত কামনা-বাসনাকে ভাসিয়ে তুলছে এক লক্ষ টাকা এবং অজানা এক ভয়কেও।
‘শুধু সাহস…আর কিছু নয় পাঁচ জীবনের রোজগার পাঁচ মিনিটে…’
ঠিকই বলেছে বিমল। শুধু সাহসটুকুর অভাবেই এই বঞ্চিত জীবন একনাগাড়ে, একঘেঁয়ের মতো টেনে চলা। এক জীবনের সুখ এক জীবনেই পাওয়া অসম্ভব কেন হবে? লাখ টাকা পাবার জন্য ডাকাতরা যদি সাহসী হতে পারে, কেন তাহলে সাহসী হব না লাখ টাকা মুঠোয় পেয়ে গিয়ে?
দেবাংশু ডান তালু রাখল বেলার হাঁটুর কাছে ঊরুর উপর। বেলা আড়চোখে দেখল, ওর ঠোঁট হাসিতে বেঁকে রয়েছে। পাঁচ আঙুলের থাবার মধ্যে টেনে জড়ো করছে ঊরুর মাংস। তীক্ষ্ন একটা যন্ত্রণা বেলার স্নায়ু কেন্দ্র থেকে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে সারা শরীরে রমণীয় এক কম্পন অনুভব করল।
‘না।’
বেলা আঁকড়ে ধরল দেবাংশুর তালু। বড়ো বেশি সাহসী হয়ে উঠছে। সামনেই দুটো লোক রয়েছে যারা এই মুহূর্তে তাদের প্রতি তীব্র ঘৃণা আর রাগ নিয়ে বসে আছে। ওরা কী ভাববে!
