‘আমরা এই যে বসেছি, এটা কী মিছিমিছি? আমি যে রোজ আপনাকে দেখার জন্য বারান্দায় থাকি তাও কী মিছিমিছি?’
দেবাংশুর স্বর গাঢ় হয়ে উঠছে। চোখদুটি চকচক করছে। মুখের রেখাগুলো তীক্ষ্ন এবং দপদপ করছে কপালের দুই প্রান্ত। ও যেন বদ্ধপরিকর হয়েছে অপ্রত্যাশিত এই সুযোগটিকে ব্যবহার করতে।
বিয়ার শেষ হয়ে গেছে। বেয়ারাকে খোঁজার জন্য সে ঘাড় ফেরাল।
‘না থাক, আর নয়।’
বেলা ঘড়ি দেখল। এখানে আর সে থাকতে চায় না। চশমাপরা লোকটা কোন দিকে যে তাকাচ্ছে সে বুঝতে পারছে না। তা ছাড়া গ্লাসেও চুমুক দিচ্ছে না। বসে থাকার অছিলা ওই গ্লাসটা।
‘আর একটা। এভাবে মুখোমুখি আর হয়তো বসার সুযোগ পাব না।’
‘আমার আর থাকতে ভালো লাগছে না….এত ধোঁয়া দমবন্ধ হয়ে আসছে।’
‘তন্দুরি চিকেন বলা হয়েছে।’
‘আমার খাবার ইচ্ছে নেই।’
‘আমারও নেই।’
কোলের উপর রেখে সে সন্তর্পণে ব্যাগের মুখ ফাঁক করে একশো টাকার নোটটা বার করল।
লোকটা কী লক্ষ করছে তার ব্যাগ থেকেই এটা বেরোল। বেলা সাহস পেল না ওদিকে তাকাতে।
‘আপনি সব দেবেন? শেয়ার করি।’
দেবাংশুর হতাশ স্বরে মেশানো রয়েছে কিছুটা ক্ষোভও। কিন্তু বেলা নিরুপায়।
‘আমিই ডেকে এনেছি, আমিই দেব।’
ওর বোধহয় ধারণা, দু-জনে মুখোমুখি গল্প করব বলেই এখানে আসা। কিন্তু ও জানে না, নোটটা ভাঙাবার জন্য বেলা একটা জায়গা চাইছিল।
‘বেয়ারা।’
ব্যস্ত হয়ে একজন টেবলের পাশে এল।
‘একটা তন্দুরি চিকেনের অর্ডার ছিল ওটা প্যাক করে দাও নিয়ে যাব, জলদি….আর বিল।’
দেবাংশু হেলান দিয়ে মুখটা উপর দিকে তুলল। পা দুটো গুটিয়ে নিয়েছে। বেলার মনে হল, ও রাগছে। চোখের উদাসীন ভাবটা থেকেই বোঝা যাচ্ছে কিন্তু একটা দমন করার চেষ্টা চলছে ভিতরে।
‘আর একদিন তো আসতে হবেই টাকাটা দেবার জন্য।’
বেলা কয়েক ইঞ্চি এগিয়ে দিল তার পা। জায়গাটা ফাঁকা। অপ্রতিভ বোধ করে টেনে নিল।
বিল আর ফিতে বাঁধা কাগজের একটা বাক্স আনল বেয়ারা। বেলা ঝুঁকে বিলটার যোগফলটুকু দেখল। একান্ন টাকা পঁয়ত্রিশ পয়সা। নোটটা রাখার সময় তার হাত একবার কেঁপে গেল।
এইবার অপেক্ষা। সিরিয়াল নম্বর কী ইতিমধ্যেই এখানে পৌঁছে গেছে? যদি পৌঁছে গিয়ে থাকে তাহলে কী করবে?’
‘আপনি কি এই নোট দিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ। কেন, কী হয়েছে?’
‘আমি এখানকার ক্যাশিয়ার। দয়া করে একবার এদিকে আসবেন কী?’
‘কেন? কিছু গোলমাল আছে কী?’
‘রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সার্কুলারে চোরাই নোটের যে নম্বর রয়েছে তার সঙ্গে আপনার দেওয়া নোটের নম্বর মিলছে। আমরা পুলিশকে টেলিফোন করে দিয়েছি। আপনি ততক্ষণ ভিতরে এসে বসুন?’
ধীরে ধীরে বেলার মাথা ঝুঁকে পড়ল। দেবাংশুর মুখের দিকে তাকানো সম্ভব নয়। ওকেও পুলিশ নিয়ে যাবে সহযোগী হিসেবে। সত্যি ব্যাপারটাই পুলিশকে সে বলবে কিন্তু ওরা বিশ্বাস করবে না। দু-জনকে নিয়েই পুলিশ যাবে শিবদত্ত লেনে। পুলিশের গাড়ি থেকে তাদের নামতে দেখলেই ভিড় জমে যাবে। তাদের পিছু পিছু বিরাট জনতা হাঁটবে। দরজা খুলে দেবে তিমির। পুলিশদের দেখে থতমত হবে ভিড়ের উপর দিয়ে বোকার মতো চোখ বুলিয়ে তারপর বেলার দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাবে।
‘বিল?’
চমকে উঠল বেলা। ট্রে-র উপর বিল, কয়েকটা পুরোনো নোট, খুচরো পয়সা। একটা পিতলের প্লেটে মৌরী আর টুথ পিক। বেলা ফ্যালফ্যাল করে ট্রে-র দিকে তাকিয়ে থেকে বুকের মধ্যে দু-তিনটি ঝাঁকুনি খেল। এখানে তাহলে কোনো খবর আসেনি। হয়তো কলকাতার বহু দোকানেই আসেনি।
বেয়ারার মুখের দিকে সে তাকাল। তারপর দেবাংশুর মুখের দিকেও। নোটগুলো আর খুচরো আঙুল দিয়ে স্পর্শ করল।
কত বখশিস দিতে হবে? এখানে নিয়ম কী? যদি নাই দেয় তাহলেই বা কী হয়? চশমাপরা লোকটা হয়তো লক্ষ করছে। যা রেট, তার বেশি দিলে বুঝে নেবে এ টাকা সহজে উপার্জিত। কিন্তু রেট কী?
দেবাংশু ওর ফাঁপরটা বুঝতে পেরেই একটা দু-টাকার নোট আর খুচরোগুলো রেখে বাকিগুলো তুলে নিতেই বেলা হাঁফ ছাড়ল। বেয়ারা ডান হাত কপালে ঠেকাল যান্ত্রিক ভঙ্গিতে, খুশি হয়নি। কথা না বলে একসঙ্গেই দু-জনে উঠল। দেবাংশুর হাতে বাক্সটা।
বেলা আড়চোখে দেখে নিল, গ্লাসটা মুখের কাছে তুলেছে লোকটা। মাথা সামান্য নোয়ানো। তাদের বেরিয়ে যাওয়া লক্ষ করছে না। হয়তো ফলো করবে না।
লোকটা কী কোনো ছাত্রীর বাবা? তাদেরই কোনো টিচারের স্বামী? হয়তো তাকে চেনে। বাড়ি ফিরে স্ত্রীকে বলবে…
গরমের প্রথম ধাক্কাটা রেস্টুরেন্টের বাইরে পা দেওয়া মাত্র বেলাকে আর এক বাস্তবে নিয়ে গেল। ব্যাগটাকে বুকের কাছে সে আঁকড়ে ধরল।
রাস্তার আলোয় আর দোকানের নিয়ন সাইনে ঝকঝক করছে পার্ক স্ট্রিট। সে এত সুদৃশ্য এবং সজ্জিত নরনারীবহুল রাস্তা কখনো দেখেনি, যদিও তার জন্ম এখান থেকে দুই কী আড়াই মাইল দূরে। কাউকে বললে বিশ্বাস করবে না, দেবাংশুও।
পশ্চিমে একটা ক্ষীণ ফিকে হলুদ রেখা আকাশে থাকলেও, সন্ধ্যা উত্তরে যাবার সব লক্ষণই কলকাতায় এখন দেখা যাচ্ছে। বেলার ইচ্ছে করছে কিছুক্ষণ হাঁটতে।
ওপারে একটা ট্যাক্সি থামল। দেবাংশু ব্যস্ত হয়ে রাস্তা পার হবার জন্য এগিয়ে গিয়েও পারল না ট্র্যাফিকের জন্য। বেলা দেখল আরোহীরা নামার আগেই একটি লোক ছুটে গিয়ে ট্যাক্সির দরজার হাতল চেপে ধরেছে। হতাশা এবং বিরক্তি নিয়ে দেবাংশু ফিরে এল।
