‘কাছেই মিনিট কয়েক হেঁটে রাসেল স্ট্রিটে… ডক্টর পালের চেম্বারে। সন্ধেবেলায় ওখানে আমি রিসেপসনিস্ট। আপনারা টিউশনি করেন, আমি এই কাজটা করি।’
‘কাজের ব্যাপার নয়তো তোমাকে জোর করে বসাতাম। আমিও অবশ্য এবার উঠব।’
‘বসুন না আপনি, এখনি উঠবেন কেন।’
দেবিকা হালকা চিমটি কাটল বেলার ঊরুতে। ইঙ্গিতটায় সে সন্ত্রস্ত হল। দেবিকা কিছু ভেবে নিয়েছে? সেরকম কিছু কী তার মুখে ভেসে উঠেছে?
‘আপনার ফেরার ভাবনা আর নেই, বডিগার্ড তো পেয়েই গেছেন…ঠিকমতো গার্ড দেবেন কিন্তু! বেলাদি কাল দেখা হবে।’
দেবিকা উঠে দাঁড়াতেই ঘরের প্রায় সবাই তার দিকে তাকাল।
‘নিশ্চিন্ত থাকুন, ওঁকে এখুনি পৌঁছে দিচ্ছি।’
দেবিকা চলে যাবার পর বেলা বলল: ‘চমৎকার ফিগার, তাই না?’
‘শুধু কী ওরই।’
কথাটা বেলাকে তিরতিরে একটা কম্পন দিল পা থেকে গলা পর্যন্ত। কিন্তু না-শোনার ভান করে বলল: ‘আপনি কিন্তু কিছুই খেলেন না।’
‘এবার খাব।’
তুড়ি দিয়ে দেবাংশু বেয়ারাকে ডাকল।
‘কী বিয়ার আছে…ব্ল্যাক লেবেলই দাও, মেনুটা দেখি।’
‘আপনি বিয়ার খান! এই যে বললেন…’
‘আপনার কলিগ ছিল বলে তাই, কী আবার ভাববেন।…আপনি কিছু খান?’
বেলা সামান্য উত্তেজনা বোধ করল, একটি লোক প্রায় দেড়হাত দূরে বসে বিয়ার পান করবে, এটা ভেবেই। দেবাংশু গভীর মনোযোগে মেনু দেখছে। বেলার পায়ের পাতার উপর হালকা চাপ পড়ল।
‘তন্দুরি চিকেনই বলি।’
‘ভাজাভুজি এখন খাব না।’
‘ভাজা নয় সেঁকা শুকনো মাংস, খুব ভালো হজম হয়, একটাই যথেষ্ট আর লাগলে পরে বলছি।’
বেয়ারাকে বরাদ্দ জানিয়ে দেবাংশু কী ভেবে আবার তাকে ডাকল। গলা নামিয়ে বলল: ‘ছোটো জিন, লাইম আর সোডা না শুধু জল দিয়ো।’
‘বড়ো না ছোটো।’
‘বড়োই দাও।’
বেলা ওদের দু-জনের ফিসফিসানি থেকে অনুমান করল রহস্যময় কিছু আনতে বলা হচ্ছে। দেবাংশুর চোখে দুষ্টুমির ভাব।
‘আমাকে কিন্তু ছ-টার মধ্যে পৌঁছতে হবে। রীনার উইকলি পরীক্ষা শনিবার।’
‘আজ কামাই করুন, এক-আধ দিন করতে হয়।’
পায়ের উপর চাপটা একটা বাড়ল, বেলা ভ্রূ উঁচিয়ে জানিয়ে দিল ব্যাপারটা সে গ্রাহ্য করছে। পা টেনে নিতে তার ইচ্ছে করছে না। কেন, তা সে জানে না। এই মুহূর্তে সারা পৃথিবী তার কাছে উপভোগ্য মনে হচ্ছে।
পাশে রাখা কুড়ি হাজার টাকার নোট ভরা ব্যাগটাও আর তার কাছে আতঙ্কের বস্তু নয়।
‘জীবনে সবই কী ছক বেঁধে চলে? ছক ভাঙতে হয়।’
‘সবাই কী আর তা পারে। সবাই কী সাহসী হয়? কতরকমেরই অসুবিধা মানুষের থাকে।’
‘সাহসী কেউ হয় না, হয়ে ওঠে। অবস্থা পরিস্থিতি করে তোলে। আসলে আপনার জীবনে কোনো পরিস্থিতি কোনো ঘটনাই আসেনি।’
হায়, এই লোকটি জানে না কী ঘটনা তার জীবনে কাল ঘটে গেছে। পৃথিবীতে কারোর কপালে বোধহয় এমন ব্যাপার ঘটেনি। বললে তো চমকে উঠবে, বিশ্বাসই করবে না। কী প্রচণ্ড সাহসে এখনও সে গোপন করে রেখেছে, তা যদি লোকটি জানত।
বিমলের কথাটা মনে পড়ল বেলার। শুধু দরকার সাহস, তাহলেই পাঁচটা জীবনের আয় পাঁচ মিনিটে করা যায়। সত্যিই যায় কী? ধরা পড়ে গেলে? সে যদি ধরা পড়ে তিমিরের কাছে? এত টাকা কতদিন কীভাবে লুকিয়ে রাখবে।
‘কী ভাবছেন?’
বেলা হাঁটুর পাশে মৃদু ধাক্কা পেল। দেবাংশু ঝুঁকে রয়েছে টেবলে। ছক ভেঙে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত কী এটা! প্রতিদিনই বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছে, আজ সাহস করে ছক ভাঙার জন্য পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে। প্রগলভ হয়েছে।
‘ভাবার কী আছে?’
বেয়ারা দু গ্লাস জল ছাড়াও দুটো গ্লাস বেলার আর একটা দেবাংশু সামনে রেখে বিয়ার বোতলের ছিপি খুলতে লাগল।
অবাক হয়ে গেল সে। তার সামনে এ দুটো কী! দেবাংশু হেসে এক গ্লাসের জিনিস অন্য গ্লাসে মিশিয়ে তাতে জল ঢালল।
‘চমৎকার খেতে লাগবে। লাইম বেশিই দিলাম। টকটক চাটনির মতো মনে হবে।’
‘কী এটা?’
‘খেয়েই দেখুন না, বিষ নয়।’
ফেনা সমেত বিয়ারে চুমুক দিয়ে গ্লাসের অর্ধেকটা খালি করে দিল দেবাংশু। নাকের নীচে লাগা ফেনা তালু দিয়ে মুছল।
বেলা প্রথমে শুঁকল তারপর গ্লাসে ছোট্ট চুমুক দিল। টক তো বটেই, তার সঙ্গে একটু তিতকুটে ভাব। দেবাংশু হাসছে। অন্যান্য টেবলের কেউ লক্ষ করছে কী? হয়তো ওরা ভেবেছে স্বামী-স্ত্রী।
ছ-সাত গজ দূরে বাঁদিকে ধোঁয়াটে কাচের চশমাপরা একটি যুবক, বেলার মনে হল, তার দিকেই তাকিয়ে। বোধহয় একাই কেননা অনেকক্ষণ বসে আছে টেবলে কারোর সঙ্গে কথা না বলে। সামনের গ্লাসটা ঘোলাজলের মতো পানীয়ে আধভরা। বেলার মনে পড়ছে না একবারও ওকে চুমুক দিতে দেখেছে। এতক্ষণ সে ওকে গ্রাহ্যের মধ্যে আনেনি, এবার আনল।
‘কেমন লাগল?’
‘মন্দ নয়।’
‘আপনাকে অন্যমনস্ক লাগছে, ব্যাপার কী?’
মনে হচ্ছে চশমা পরা এদিকেই যেন তাকিয়ে! চোখটা দেখা যাচ্ছে না। এইরকম কাচের চশমা তো নজরে রাখার জন্যই পরে গোয়েন্দারা বা অপরাধীরা। বেলার সারা শরীর অবশ হয়ে এল। হাঁটুর নীচে আর একবার চাপ লাগল কিন্তু পা সরিয়ে নেবার শক্তিটুকুও এখন তার নেই। মুখ নীচু করে গ্লাসে চুমুক দিল। চশমাপরা লোকটার দিকে আর তাকানো ঠিক হবে না।
‘এতগুলো টাকা নিয়ে চলাফেরা…চিন্তা হচ্ছে।’
‘বলেছি তো পৌঁছে দেব। আমার উপর ভরসা রাখতে কি অসুবিধা আছে?’
‘না তা নয়। তবে মিছিমিছি কামাই করলাম।’
