‘তোমার মতো এমন অল্পবয়সি, এত ভালো স্বাস্থ্য অথচ খেতে আপত্তি…. জানেন দেবাংশুবাবু দেবিকা দারুণ বাস্কেট খেলে, বেঙ্গল রিপ্রেজেন্ট করেছে।’
‘খেলে নয়, একসময় খেলতাম।’
‘আপনাকে দেখেই কিন্তু মনে হয়েছিল আপনি স্পোর্টসম্যান… সরি… স্পোর্টস উওম্যান।’
দেবাংশুর চোখে তারিফ। বেয়ারাটি অপেক্ষা করছে। বেলা উশখুশ করল।
‘কিছুই খাবে না?’
‘আপনি বরং ফুঁট জুস নিন, নইলে মিসেস দাস শান্তি পাবেন না।’
‘বেশ।’
‘আমিও তাই। আপনিও তো?’ দেবাংশু হাত নেড়ে বেয়ারাকে ডাকল। বেলা হতাশ হল। ওরা দু-জন এত সামান্য জিনিস খেলে, নোটটা ভাঙাবে কী করে! ওদের সঙ্গে তাকেও ফ্রুট জুস খেতে হবে। এতে কত টাকারই বা বিল হবে। ভাঙিয়ে দেবে তো! খদ্দের বলতে জনাচারেক! ক্যাশে টাকা আছে তো!
বেয়ারাদের গায়ে সাদা উর্দি। কোথাও ময়লা নেই, কোঁচকানি নেই। প্রত্যেক টেবল সাদা চাদরে ঢাকা দাগ নেই। টেবলের মাঝে ফুলদানিতে ফুল। বেলা তাদের টেবলের ফুলগুলোয় আঙুল ছুঁইয়ে দেখল প্লাসটিকের নয়। বিয়ের পর তিমির শখ করে প্লাসটিকের কিছু লতাপাতা-ফুল কিনে এনেছিল। মাস কয়েক পর ধুলোয় সেগুলো আর চেনা যাচ্ছিল না।
তিনটি লোক ঢুকল। দু-জনের হাতে অ্যাটাচি কেস। এক বেয়ারা এগিয়ে গেল। এইবার বোধহয় লোক আসতে শুরু করবে। মৃদু স্বরে কোথা থেকে পশ্চিমা সুরের বাজনার আওয়াজ আসছে। বেলা চমকে উঠল দেবাংশুর জুতো তার চটিতে টোকা দিয়েছে।
‘আজও গুমোট। এইজন্যই অফিসে বসে থাকতে ইচ্ছে করে।’
‘তাহলে এখানে এসে আপনাকে কষ্ট দিলুম।’
‘না না, মোটেই না। এই কষ্টটা যদি রোজ পেতাম।’
দেবাংশু মুচকি হাসছে। বেলাও হাসল। পা সরিয়ে নেবে কিনা ভাবল।
‘এখানেও তো ঠান্ডা।’
হ্যাঁ তবে এই ঠান্ডা গায়ে লাগাতে পয়সা লাগে।’
দেবিকা ‘বেশ’ বলার পর আর একটি কথাও বলছেনা। আঙুল দিয়ে টেবলে আঁকিবুকি কাটছে। অন্যমনস্ক থাকার ভান করে। দেবাংশু ওর কাছে একদমই অপরিচিত, কী-ই বা কথা বলবে। বেলাকেই কথা বলে যেতে হবে।
কিন্তু তার কাছেও তো দেবাংশু খুব পরিচিত নয়। রোজ দেখা হয়, কয়েকটা পোশাকি কথাও মাঝে মাঝে হয়েছে। কিন্তু এইরকম পরিবেশে কেমন একটা অন্য মানসিকতা তাকে প্রভাবিত করছে। সে নিজেও জানত না কমবয়সিদের মতো চটুল হালকা ভাব তার কথার মধ্যে আসবে। এসব তার ভিতরে লুকিয়েছিল তাহলে। আরও কী লুকিয়ে আছে কে জানে!
আরও কিছু লোক ঢুকল। টেবলগুলো এবার ভরে উঠছে। তার দু-জন ছাড়া আর ঘরে একটিও মেয়ে নেই। বেলা অস্বস্তি বোধ করল।
তিনটি গ্লাসে আপেলের রস এনে দিল বেয়ারা। ব্যাগটা তার আর দেবিকার মাঝে রয়েছে। ওটা দেওয়ালের দিকে রাখবে কিনা বেলা একবার তা ভাবল। ভয় নিয়ে সে বোধহয় বাড়াবাড়িই করছে। এখান থেকে কেউ বা কারা ডাকাতি করে নিয়ে যাবে, সম্ভব নয়। তা ছাড়া দেবাংশু রয়েছে। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, মাথায় টাক কিন্তু যুবকদের মতো শরীর। প্রতিবার গ্লাসটা মুখে তোলার সময় ওর ফুলহাতা জামার ভিতর হাতের গুলি ফুলে উঠেছে। এটা এখন বিরাট নির্ভরতা।
‘আচ্ছা প্রত্যেক টেবলেই দেখছি শুধুই লাল বোতল ওই কি বিয়ার?’
দেবাংশু কোনো টেবলের দিকে না তাকিয়েই ঘাড় নাড়ল।
‘গরমের দিনে এটাই ভালো লাগে।’
‘মেয়েরাও নাকি খায়?’
‘বহু মেয়ে খায়। এখানেই দেখতে পাবেন।’
‘নেশা হয়?’
‘সামান্য একটা গোলাপি গোলাপি আমেজে আসে। তবে বেশি খেলে হয়।… নির্ভর করে শরীরের ধাতের ওপর।
‘আপনি খান?’
চট করে দেবিকার মুখের দিকে তাকিয়ে দেবাংশু মাথা নাড়ল।
‘নাহ।’
বেলার কাছে এটা একদমই অন্য জগৎ। যেসব মেয়ে এখানে এসে বিয়ার খায়, তারা থাকে কোথায়? কী করে? একা আসে না স্বামীর সঙ্গে? নেশা হলে বাড়ি ফেরে কী করে? তারা নিশ্চয় পয়সাওলা ঘরের, ট্রামে-বাসে ফিরতে হয় না, নিজেদের গাড়িতেই ফেরে।
তার কাছে এখন এক লক্ষ টাকা রয়েছে। আজ সকালেও খবরের কাগজ তন্নতন্ন করে দেখেছে। মাত্র চারলাইন-‘গতদিনের লক্ষ টাকা ডাকাতির ব্যাপারে পুলিশ আর কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি বা টাকাও উদ্ধার করতে পারেনি। ধৃত ডাকাতের কাছে থেকে যেসব তথ্য সংগ্রহ করেছে তাতে পুলিশের ধারণা আন্তঃরাজ্য চক্রের সঙ্গে এই ডাকাতরা জড়িত।’
ঠিক ডেটেকটিভ উপন্যাসের ভাষা! জোর তদন্ত চলছে, এমন একটা কথা শেষে লাগিয়ে দিলেই হত। একটানা গুঞ্জনে আর সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরটার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। লোকেদের খুঁচিয়ে লক্ষ করল। সাধারণ জামা প্যান্ট, সাধারণ ভাবভঙ্গি, চেহারা। কাউকেই তার মনে হল না, এক লক্ষ টাকার নোট একসঙ্গে কখনো চোখে দেখেছে। তবে ব্যাঙ্কের ক্যাশিয়ার যদি কেউ থাকে তাহলে আলাদা কথা কিংবা সেই লোকগুলো যারা টাকা জমা দিয়ে এসেছিল। কিন্তু ওরা কেউ-ই মালিক নয় লক্ষ টাকার।
বেলা নিজেকে কখন যেন ওই লক্ষ টাকার মালিক ভাবতে শুরু করেছে। তখন যেন নিজেকে বুঝিয়ে ফেলতে পেরেছে, টাকাগুলো বৈধভাবে তারই অর্জিত।
‘এখন যদি গীতাদি বা অর্চনা আমাদের দেখে কী ভাববে বলো তো?’
বেলা নীচুগলায় বলল, দেবিকা ফিকে হেসে গ্লাসের তলানিটুকু শেষ করল।’
‘এবার আমি উঠব।’
‘সেকি এই যে বললে….’ বেলা ঘড়ি দেখল।
‘একটা দরকারের কথা মনে পড়ল, একদমই ভুলে গেছলাম।’
‘যাবে কোথায় এখন?’
