‘আমরাই স্কুল কলিগ, দেবিকা দাশগুপ্ত। আর ইনি দেবাংশু ঘোষ।’ নামে কিছূটা মিল আছে।
নমস্কার বিনিময় হল মৃদু হেসে।
‘ওকে সঙ্গে এনেছি টাকাগুলোর জন্য।’
‘বডিগার্ড হিসেবে।’
দেবিকা তার হাসিটা চোখ দিয়ে প্রকাশ করল। দেবাংশুও হেসে ভ্রূ তুলে জানাল সে অবাক হয়েছে।
‘দারুণ বডিগার্ড তো!’
টাকা লুঠ করার চেষ্টা করবেন না তাই বলে। আমার বডিগার্ড আপনার সঙ্গে গায়ের জোরে পারবে না।’
বেলার সঙ্গে দেবিকাও তাকাল দেবাংশুর ভারী কাঠামোর দিকে।
‘আপনার ফর্ম আমি এনে রেখেছি।’
দেবাংশু অপ্রতিভ হয়ে প্রসঙ্গ বদলাল। একটা ফাইল তুলে কয়েকটা ছাপা কাগজ বার করল। বেলার মনে হল দরকারমাত্র হাতের কাছে পাবার জন্য যেন গুছিয়েই রেখেছে। পরিচ্ছদের মতো ওর টেবলটাও পরিপাটি। অফিসের এই ঘরের মধ্যে ওকে অন্যরকম লাগছে-আরও মার্জিত ব্যক্তিত্ববান এবং উজ্জ্বল।
‘কিন্তু একটা অসুবিধা হয়েছে, না না তেমন কিছু নয়। যে ভদ্রলোক আমাদের অ্যাকাউন্টান্ট, সই করবেন তিনি কাল থেকে আসছেন না, ফ্লু হয়েছে।’
‘তাহলে?’
বেলার স্বর চিরে গেল এই একটি শব্দ উচ্চচারণ করতে গিয়ে। হাতব্যাগটা আঁকড়ে ঝুঁকে পড়ল।
‘টাকা তাহলে…?’
‘আজ আর নেওয়া যাবে না। ফরমগুলো এখন ফিলাপ করে দিয়ে যান…’
‘না।’
কোণের টেবলের প্রৌঢ় মুখ তুলে একবার বেলার দিকে তাকাল। বেলার মনে হল, সে বোধহয় চেঁচিয়ে উঠেছে। টাকাগুলো তাকে কতখানি ভীত করেছে তা সে বুঝতে পারছে না।
দেবাংশু আর দেবিকা তার মুখের দিকে তাকিয়ে। বেলা লজ্জা পেল।
‘দিন, ফিলাপ করে দি। আসলে, এত টাকা নিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করতে ভয় করে। ভেবেছিলাম টাকাগুলো জমা দিয়ে, বেশ ঝাড়া হাত-পায়ে কোথাও বসে খাব, তারপর রীনাকে পড়াতে চলে যাব।’
দেবাংশু ফরমগুলো বেলার সামনে মেলে ঝুঁকে পড়ল।
‘আপনি বলেছিলেন তিনবছরের জন্য, সুদ চোদ্দো পারসেন্ট, যদি দু-বছর রাখেন…’
‘না না, তিন বছরই।’
‘মন দিয়ে পড়ে যান, অসুবিধে হবে না ফিলাপ করতে। যেখানে যেখানে সই করতে হবে ক্রশ দিয়ে রেখেছি।’
‘একগ্লাস জল খাব।
দেবিকার উপস্থিতি যেন এই প্রথম সচেতন হল এমন একটা ভাব দেখিয়ে দেবাংশু কলিং বেল টিপতে টেবলের নীচে হাত ঢোকাল।
‘চা?’
‘না, শুধু-জল।’
‘আমার জন্যও।’
মিনিট দশেক পর, ফরমগুলো একটা খামে ভরে টেবলের ড্রয়ারে রাখতে রাখতে দেবাংশু বলল: ‘এখান থেকেই সোজা রীনাকে পড়াতে যাবেন?’
‘তাইতো ঠিক করে রেখেছিলাম, কিন্তু এত টাকা হাতে…’
‘চলুন একসঙ্গেই যাব। এবার নয় আমিই আপনার বডিগার্ড হব।’
দেবিকার দিকে তাকিয়ে দেবাংশু হাসল। খালি জলের গ্লাসদুটো নিয়ে গেল বেয়ারা।
‘তার আগে বেলাদি কোথাও খাবেন আর আমাদেরও নিশ্চয় খাওয়াবেন।’
‘নিশ্চয় খাওয়াব।’
‘কী খাওয়াবেন…এখন তো সবে বিকেল। পেট ভরে খাওয়া তো সম্ভব নয়।’
প্রায় একসঙ্গেই তিনজন ঘড়ি দেখল।
বাড়ি থেকে বেরোবার সময় সদরে তালা দিয়েও বেলা আবার সেটা খুলে ঘরে ফিরে আসে। হঠাৎ তার মনে হয়েছিল একশো টাকার নোটটাকে পরীক্ষা করলে কেমন হয়? এমন কোন জায়গা, যেখানে একশো টাকা হরদমই হাত বদলাচ্ছে, ক্যাশের লোক শুধু জলছাপটা দেখেই বাক্সের মধ্যে ছুড়ে রেখে দেয় বা ক্লিপে আরও এই ভেবে নোটের সঙ্গে আটকে রাখে, এমন কোথাও গিয়ে নোটটা ভাঙাবে। সে ব্লাউজের ভাঁজ থেকে ওটা বার করে নিয়েছে।
‘পেট ভরে খেতে হলে রাত হওয়ার জন্য তাহলে অপেক্ষা করতে হবে। আমি তো অতক্ষণ…টিউশুনি আছে।’
‘আমারও কাজ আছে বেলাদি ছ-টার মধ্যে এক জায়গায় যেতে হবে।’
টেলিফোন বেজে উঠল বেলার পিছনের টেবলে।
‘ঘোষ, ইওরস।’
দেবাংশু উঠে গেল ব্যস্ত হয়ে। দেবিকা ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করল: ‘এ ভদ্রলোক কে?’
‘আমার ছাত্রীর জ্যাঠা…ব্যাচিলার। আচ্ছা কোথায় গিয়ে খাওয়া যায় বলো তো?’
‘কত খরচ করবেন?
‘একশো।’
দেবিকা চোখ বড়ো করল। হাঁ করল অবাক দেখাতে।
‘তাহলে তো একটু ভালো জায়গায়ই খাওয়া যায়।’ ‘পার্ক স্ট্রিটে?’
‘হবে এই টাকায়?’
‘খুব হবে। এই বিকেলে কে আর পেট ভরে খাবে। আমি তো একটা সফট ড্রিঙ্ক ছাড়া কিছু নেব না।…বাব্বাঃ অনেক টাকা জমিয়েছেন তো।’
‘একশো আবার টাকা নাকি এই বাজারে…তুমি কিন্তু কাউকে কিছু বোল না।’
‘স্কুলে?…নাহ, বড়ো বাজে ওরা।’
‘আর জাস্ট পাঁচ মিনিট…’ একটা ফাইল টেবল থেকে তুলে নিল দেবাংশু। ‘আমি আসছি, তারপর বেরোবে।’
মাত্র একটি লোক বসে বিয়ার পান করছে। এক কোণে। তা ছাড়া এতবড়ো রেস্টুরেন্ট খালি। বেয়ারারা জটলা করে ভিতরের দিকে দাঁড়িয়েছিল, একজন এগিয়ে এসে ঘরের মাঝামাঝি চারজনের বসার একটা টেবল দেখাল।
‘বসবেন নাকি ওটায়? বরং এই কোণেরটায়…’
দেবাংশু ডানদিকে দেওয়ালঘেঁষা একটা টেবলে তাদের নিয়ে গেল। চারজনই বসা যায়। দেবাংশুর মুখোমুখি বেলা ও দেবিকা।
‘কী ফাঁকা!’
‘এইবার আসতে শুরু করবে। এসব পাড়ায় দুপুরে লাঞ্চ টাইমে একটা ভিড় হয়, আবার সাড়ে পাঁচটা থেকে।’
দেবাংশু বুঝে ফেলেছে সে এই পাড়ায় আনাড়ি। বুঝুক, মিথ্যা তো নয়। হাতিবাগানে মিষ্টির দোকানে বা পাঁচমাথার মোড়ে দু-একবার রেস্টুরেন্টে কষামাংস আর রুটি খাওয়া ছাড়া তার আর কোনো অভিজ্ঞতা নেই।
অন্য আর এক বেয়ারা এসে ছাপা মেনু টেবলে রাখল।
‘আমি একটা কোল্ড সফট কিছু নেব।…না বেলাদি এই সময় আর কিছু খাব না।’
