বেলা মনে মনে বিব্রত হল একটু। টাকাটা তার নিজের, এই ধারণা তার যেন বদ্ধমূল হচ্ছে। এত উদবেগ, মানসিক টানাপোড়েন তাহলে সে সইছে কেন?
‘তা আমি কী করব? ডাকাত বুকে রিভলবার ঠেকালে চেঁচাতেও পারব না, টাকা নিয়ে টানাটানিও পারব না।’
‘তা আমি জানি। তবে সঙ্গে কেউ থাকলে একটা ভরসা হয়। তাছাড়া ডাকাতি যে হবেই তার কী মানে আছে। ডাকাতি করে আগে খবর পেয়ে, আমি আজ টাকা নিয়ে যাব, এটা তো কেউ জানে না। তোমাকেই প্রথম বললাম, অনেক দিনের, অনেক কষ্টে জমানো তো?’
‘যাবেন কোথায়?’
‘ক্যামাক স্ট্রিটে। কাগজে দেখনা বড়ো বড়ো কোম্পানি আমানত প্রকল্প খুলেছে, পাবলিকের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছে তেরো-চোদ্দো পার্সেন্ট সুদে। সেইরকমই এক বিরাট ওষুধের ফার্মে টাকাটা দিতে যাব। ওখানকার একজনের সঙ্গে কথা বলে রেখেছি, তিনি আজ তিনটে নাগাদ যেতে বলেছেন। মুশকিল কী জান, ওদিককার পথঘাট আমি একদমই চিনি না, তুমি হয়তো চেন।’
‘কী করে বুঝলেন?’
বেলা অপ্রতিভ হল। কী করে বুঝল সেটা তো দেবিকাকে বলা যাবে না।
‘আজকালকার মেয়ে তোমরা, কত জায়গায় তো খেলতে গেছ, তাই বললুম।’
ওদিককার স্কুলগুলোয় তো বাস্কেট খেলা হয়। নিশ্চয় দেবিকা খেলতে যেত।
‘যাবে আমার সঙ্গে? ট্যাক্সি করে যাব।’
‘আপনি এক কাজ করুন। আড়াইটের সময় গণেশ অ্যাভিন্যুর দিকে খাদি গ্রামোদ্যোগের দরজার সামনে আমি দাঁড়িয়ে থাকব, ট্যাক্সি নিয়ে আপনি চলে আসুন, ওখান থেকে একসঙ্গে যাব।’
‘বাঁচালে।’
দেবিকা কথানুযায়ী যথাসময়ে দাঁড়িয়েছিল। বেলাকে কয়েক সেকেন্ডের বেশি ট্যাক্সি থামাতে হয়নি।
‘টাকা এই ব্যাগেই রয়েছে?’
বেলা ভীত চোখে শিখ ট্যাক্সিওলার পিঠের দিকে একবার তাকিয়েই চোখ টিপে দেবিকাকে ইশারায় বলল, টাকা নিয়ে কথাবার্তা নয়। তারপর কোলের ব্যাগে আলতো চাপড় দিয়ে বুঝিয়ে দিল। নোটের চারটে তাড়া রুমালে বেঁধে ছোট্ট একটা পুঁটলি করে নিয়েছে। ব্যাগের মধ্যে বেশি জায়গা নেয়নি। বাড়ি থেকে বেরোবার পর গা ছমছম করেছিল বেলার। কিন্তু একটা জিনিস সে ঠিক করেই ফেলেছে আচরণে বা কথাবার্তায় অস্বাভাবিক কিছু যেন ফুটে না ওঠে, সন্দেহজনক না হয়। তিনটে ট্যাক্সি সে ছেড়ে দিয়েছে, ড্রাইভারদের চেহারার জন্য। ওদের রোগা মুখ ক্ষুধার্ত লোভী চোখ এবং নোংরা জামা থেকে তার মনে হয়েছে এরা নিরাপদ নয়। ট্যাক্সিওলাদের সম্পর্কে অজস্র ভীতিকর গল্প তার শোনা আছে। অবশেষে এই শিখ আধবুড়ো লোকটিকে সে বেছে নেয়।
‘তোমাদের পাড়ায় আর কোনো গোলমাল হয়নি?’
‘আজ সকালে একটা খুন হয়েছে।…ওই যে বললাম তখন ছ-টা ছেলে ধরা পড়েছে, তারই জের।’
বেলাকে ‘জের’ শব্দটা কাঁটা করে দিল। ধরা পড়ার জের খুন!
‘…চায়ের দোকানে ছেলেটা কাজ করত। আজ সকালে জনাচারেক এসে ওকে ডেকে কাছেই একটা গলিতে নিয়ে গিয়ে ছুরি মারে, মারার পর বোমা মারে। সঙ্গে সঙ্গে ডেড। দু-মিনিটেই কাজ শেষ করে লোকগুলো একটা গাড়িতে উঠে চলে যায়।’
‘মারল কেন?’
‘সবাই বলছে, ছেলেটাই পুলিশকে খবর দিয়েছিল তাইতেই ছ-জন ধরা পড়ে। খবর না পেলে পুলিশ কী ধরতে পারত? দলের লোকেরা তার শোধ নিল।’
বেলা আর কথা বলেনি। দলের লোকেরা এক লাখ টাকা ছেড়ে দেবে না নিশ্চয়। এজন্য দলের লোক ধরা পড়েছে, একজন মারাও গেছে…নিশ্চয় ছেড়ে দেবে না। ওরা তাহলে আমার পিছু নেবেই। পুলিশও তো ছেড়ে দেবে না এক লাখ টাকা, তারাও ওৎ পেতে থাকবে।
বাড়িটার নাম ‘শান্তিবন’ নতুন, ছ-তলা। খুঁজতে হল না। দেবাংশুর কথানুযায়ী, পার্ক স্ট্রিট দিয়ে ঢুকে একটা মোড় পেরিয়েই ডানদিকে বাড়িটা।
দোতলায় অফিস। দুটো লিফটের সামনে লাইন দিয়ে লোক দাঁড়িয়ে। দেওয়ালে পিতলের অক্ষরে লেখা সারি সারি অফিসের নাম।
‘বেলাদি, চলুন হেঁটেই উঠি।’
সাদা মার্বেলের সিঁড়ি। পরিচ্ছন্ন ফিকে হলুদ দেওয়াল। ব্যস্ত উর্দিপরা বেয়ারারা। কোনো আজেবাজে কোলাহল নেই, জুতোর শব্দ আর টুকরো কথাছাড়া। বেলা এমন একটা জায়গায় এই প্রথম এল।
রিসেপশনিস্ট মেয়েটি অপাঙ্গে দেবিকাকেই বারকয়েক দেখল। বেলা এই প্রথম লক্ষ করল, দেবিকার পরনে মুর্শিদাবাদি সিল্ক, ব্লাউজটা শুধুমাত্র ব্রেসিয়ারকে লোকচক্ষু থেকে আড়াল করছে, হালকা গোলাপি আভা ঠোঁটে। ওকে মোটেই স্কুল শিক্ষিকা মনে হচ্ছে না। এখন যদি অরুণা পোদ্দার দেখে তাহলে, কালকেই দেবিকার ডাক পড়বে ওর ঘরে।
‘বলে রেখেছেন আপনি আসবেন…করিডর দিয়ে বাঁদিকে থার্ড দরজা।’
করিডরে টিক প্লাইউডের দেওয়ালে তিন-চার মিটার অন্তর দরজা। ঝকঝকে হাতল। বেলা ইতস্তত করে দেবিকার মুখের দিকে তাকাল। কোথায় দুবার কলিং বেল বাজল।
দেবিকা দরজা খুলে বেলাকে ঠেলে এগিয়ে দিয়ে ওর পিছনে ঢুকল। ঘরটা বেশ বড়ো। ছ-টা টেবল। রাবার জাতীয় মসৃণ দিয়ে মেঝে ঢাকা। কাচের জানালাগুলো বন্ধ।
ঘরে ঢোকামাত্র একটা আরামদায়ক ঠান্ডায় বেলা কিছুটা বিহ্বল হয়ে গেল। দেবাংশু সামনের টেবলেই। চোখে সামান্য বিস্ময়, সম্ভবত দেবিকার জন্য।
‘আসুন।’
দেবাংশু উঠে টেবল ঘুরে এগিয়ে এল। পাশের টেবলের সামনে থেকে খালি চেয়ারটা তুলে আনল। প্রতি টেবলের সামনে শুধু একটি করেই চেয়ার। দুটি টেবলে লোক নেই, হয়তো ঘরের বাইরে গেছে কিংবা ছুটিতে। বাকি তিনজন গভীর মনোযোগে কাগজপত্র ছড়িয়ে কাজ করছে। একজন প্রৌঢ়, টকটকে গায়ের রং, মোটা ফ্রেমের চশমা মনে হয় অবাঙালি। অন্য দু-জন চল্লিশের কাছাকাছি সাদামাটা। কিন্তু গলায় প্রত্যেকেরই টাই রয়েছে, দেবাংশুরটা ঘন মেরুন। এই ঘরে সবাইকে একই পর্যায়ের চাকুরে এবং পদস্থই মনে হল বেলার।
