একদৃষ্টে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বেলা। কপালে ঘাম ফুটে উঠেছে। স্নায়ুগুলো জট পাকিয়ে যাচ্ছে। বুকের মধ্যে অসম্ভব ভার। ক্লাসের বাচ্চচাদের মুখের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না।
জামরুল গাছের কয়েকটা ডাল জানলা ঘেঁষে। আকাশ স্বচ্ছ নীল। হঠাৎ এত নীল বছরের এই সময়! বেলা অবাক হল এবং মনে মনে হাসল। এখন এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো দরকারই নেই। তার দরকার, লক্ষ টাকা নিয়ে চিন্তা করার।
কয়েক বছর আগে, একটা ঘটনার কথা সে পত্রিকায় পড়েছিল। হঠাৎ এখন সেটা তার মনে পড়ল। তার এই ব্যাপারটার সঙ্গে অনেকটা মিল আছে। বোধহয় আমেরিকাতেই ঘটেছিল। ব্যাঙ্ক আর বড়ো বড়ো ব্যবসায়ীদের লক্ষ লক্ষ টাকা আনা-নেওয়ার জন্য একটা ফার্ম ছিল। ইস্পাতে মোড়া ট্রাকে আর প্রাইভেট পুলিশের দল নিয়ে তারা এই কাজ করত।
কয়েকটা লোক সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে লক্ষ করলেন ট্রাকগুলোর যাওয়া-আসা। অবশেষে আবিষ্কার করল প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে বিরাট অঙ্কের টাকা ওই ফার্মের অফিসে কয়েক ঘণ্টার জন্য রাখা হয় ট্রাকে তোলার আগে।
অফিসটা প্রায় দুর্গের মতোই। লোকগুলো এক বছর ধরে প্ল্যান করে ডাকাতি করল। বলা হয়েছিল, শতাব্দীর দুঃসাহসিক ডাকাতি।
বেলার খুঁটিনাটি মনে পড়ছে না। সাত-আট লক্ষ ডলার ডাকাতি করে চার-পাঁচজন লোক উধাও হয়ে যায়।
পুলিশ বছরের পর বছর ধরে নিঃশব্দে খোঁজ করে চলে। কয়েকটা লোককে তাদের সন্দেহ হয়। লোকগুলো রোজ একটা বার-এ গিয়ে মদ খেত। পুলিশ ওদের অনুসরণ করে যেতে থাকে।
বৈধভাবে রোজগার নয় এমন একটা পয়সাও লোকগুলো খরচ করত না। তাদের একজনও এমন কোনো খরচ করত না, যা সাধ্যের বাইরে। পুলিশ কিছুতেই ধরাছোঁয়ার মধ্যে তাদের পাচ্ছিল না।
প্রত্যেকটি ব্যাঙ্কে আর বড়ো বড়ো দোকানে ডাকাতি হওয়া নোটের নম্বর জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রায় দশ বছর ধরে ওই নম্বরি নোট, আমেরিকায় বা বিদেশেও, বাজারে দেখা যায়নি।
আমেরিকার আইনে, রক্তপাত ঘটেনি এমন কোনো অপরাধের সময়সীমা দশ বছর পর্যন্ত বলবৎ থাকে। আর কয়েক সপ্তাহ মাত্র বাকি ছিল দশ বছর পূর্ণ হতে।
এমন সময় একটা ছোটো স্থানীয় ব্যাঙ্ক পুলিশকে জানাল, তারা দশ ডলারের একটা নোট পেয়েছে। যেটার নম্বর চোরাই লিস্টে রয়েছে। এক দোকানদার নোটটা জমা দিয়েছিল। তার মারফত এক সন্দেহভাজনকে খুঁজে পাওয়া গেল এবং সময়সীমা পেরিয়ে যাবার ঠিক পাঁচ দিন আগে গোটা দলটাই ধরা পড়ল।
পাঁচটা লোক দুঃখকষ্ট, দারিদ্র্য, ক্ষুধা উপেক্ষা করে প্রায় দশ বছর ধৈর্য ধরেছিল। নিজেদের ধরে রেখেছিল লোভের হাতে থেকে। টাকাগুলো এক পোড়ো কবরে পুঁতে রেখে ওরা শুধু পাহারা দিয়ে গেছল।
কিন্তু একজন পারেনি। তার ছেলে মৃত্যুশয্যায়। চিকিৎসার জন্য টাকার দরকার। গভীর রাতে সে দলের কাউকে না জানিয়ে কয়েকটা নোট তুলে এনেছিল।
ঘটনাটা বেলাকে তখন দারুণভাবে আচ্ছন্ন করেছিল। ভাগ্যের পরিহাস বা নিয়তির প্রতিশোধ-এমন ধরনের। কিছু কথা তখন তার মনে এসেছিল। সে জানত না, ওই লোকগুলোর মতোই প্রায় তারও অবস্থা আসবে। শুধু পুলিশ নয়, আরও কিছু ভয়ংকর লোকের ছুরি, বোমা, রিভালবার তার জন্য তৈরি হয়ে উঠছে। ওরা এখনও জানে না, কিন্তু জেনে যাবেই। আজ না হোক, দশ বছর পরে জানবে। ওরা নিশ্চয় অপেক্ষা করে থাকবে।
বেলার পা-দুটো অসাড় হয়ে এল। কপাল থেকে চিবুক বেয়ে ঘাম পড়ছে। পেনসিলধরা আঙুল কাঁপছে। নিজের কানেই বুকের দপদপানি যেন ধরা পড়ছে। তার এবার আড়াল চাই, আশ্রয় চাই, শুধু একজন নয় কয়েকজন এখন জানে এক লাখ টাকা কোথায়।
‘বেলাদি আপনার বুঝি অসুখ করেছে?’
হতভম্বের মতো বেলা কচি মুখটার দিতে তাকিয়ে থাকে। ছাত্রীদের চোখেও তাহলে ধরা পড়ছে।
‘বড্ড মাথা ধরেছে… তোমরা কথা না বলে বসে থাক।’
ছুটির পর গীতা ও অর্চনার সঙ্গে যাতে না বেরোতে হয়, সেজন্য বেলা অজুহাত তৈরি করল।
‘না গীতাদি, দুজন গার্জেনকে দেখা করতে বলছি…কিচ্ছু পড়াশুনো করে না মেয়েরা, টাস্কও করে আনে না, তোমরা বরং আজ এসো!’
‘বেলাকে কেমন অসুস্থ দেখাচ্ছে, তাই না গীত্যদি?’
‘কাল সারারাত ঘুম হয়নি, অম্বলের ব্যথাটা আবার…’
অর্চনার মুখ দেখেই বেলা বুঝল সে কী বলবে। তার পাড়ায় এক কবিরাজ আছে, সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী। তার ননদের হাঁপানি সারিয়েছে, এক মামি বাতে কষ্ট পেত, এখন পায় না। অম্বলের রোগ হরদমই সারিয়ে দিচ্ছে। বেলা যদি একবার যায় তো…
‘দেখি ওরা এসে দাঁড়িয়ে আছে বোধহয়।’
টিচার্স রুম থেকে বেরিয়ে লম্বা করিডরে ছাত্রীদের ভিড় ঠেলে বেলা স্কুলের গেটের কাছে এল। অপেক্ষারতদের অধিকাংশই মা কিংবা বাড়িরই কোনো মেয়ে। দেবিকা উঠোনেই রয়েছে, সারি দিয়ে মেয়েদের বেরিয়ে যাওয়া তদারকি করতে।
বেলা আবার টিচার্স রুমে ফিরে এল। গীতা বা অর্চনা নেই। স্কুলের পিছনের দজরা দিয়ে ওরা নিশ্চয় বেরিয়ে গেছে।
মিনিট দশেক পর দেবিকা এল।
‘কীসের ভয় করছে বেলাদি?’
‘দেখেছ তো কীরকম সব ডাকাতি হচ্ছে রাস্তার উপর, দিনের বেলাতেই। অথচ আজই আমায় টাকা নিয়ে ক্যামাক স্ট্রিটে যেতে হবে একটা অফিসে, যাবে আমার সঙ্গে?’
‘কত টাকা?’
‘হাজার কুড়ি।’
‘অ্যাতো! বাবাঃ আপনার টাকা?’
‘হ্যাঁ।’
