বেলার ক্লান্ত মস্তিষ্কের সঙ্গে ক্রমশ বহির্জগতের যোগাযোগ খসে পড়ছে। আবছা হয়ে আসছে চেতনা।…জানলে তিমির কী করবে? তাকে ধিক্কার দেবে? বলবে, চোর বাটপাড়? টাকা নিয়ে আমায় নিয়ে কী ফেরত দিয়ে আসবে? গঙ্গায় ফেলে দেবে? তিমির অত্যন্ত ভীতু প্রকৃতির। তা না হলে ওকে সৎ বলা যেত।
ফেরতই দিক, তাই করুক। আর সহ্য করা যাচ্ছে না এই উদবেগ, মানসিক অশান্তি। এই যন্ত্রণা সে সেধে নিয়েছে। হয়তো লোভ, অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা তার মধ্যে ঘাপটি দিয়ে লুকিয়ে ছিল যা সে জানত না, থলিটা ফেরত দেওয়ার আর প্রশ্নই ওঠে না। তাকে গোপন রাখতে হবে এই টাকার খবর, চিরকাল।
‘কিছু বলছ?’
তিমির ঝুঁকে পড়ল মুখের উপর। অস্ফুট গোঙানির মতো একটা শব্দ বেলার মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে।
এবার সে সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে।
সকালে খবরের কাগজ দিয়ে যায় বেলা স্কুলে বেরোবার পর।
শ্যামবাজারে পাঁচমাথার মোড়ে বাস থেকে নেমেই খবরের কাগজ কিনল। প্রথম পাতায় উপর থেকে চোখ বুলিয়ে নীচের দিকে নামতেই একটা হেডিংয়ে চোখ স্থির হয়ে গেল।
দু-পাশে তাকিয়ে সে ফুটপাথের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়াল। কোন খবরটায় তার আগ্রহ এটা আশপাশের লোককে সে জানাতে চায় না।
হেডিং থেকে বেলার কৌতূহল খবরের মধ্যে ঢুকল।
‘…সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ বি কে পাল অ্যাভিন্যুয়ে এক ব্যাঙ্কের সামনে মোটর থেকে নামামাত্র এক গুজরাটি বস্ত্র ব্যবসায়ীর এক লক্ষ টাকা লুট হয়েছে। জনতার হাতে প্রহৃত হয়ে এক ডাকাত প্রাণ হারিয়েছে। আর এক ডাকাত এখন আর জি কর হাসপাতালে, তার অবস্থা এখন-তখন। দু-জনেরই বয়স কুড়ির নীচে। আর একজন এক লক্ষ টাকার নোটের বান্ডিল ভরা নীলরঙের থলিটি হাতে নিয়ে দৌড়ে কাছের এক গলিতে ঢুকে পড়ে। জনতা তাড়া করায় সে বোমা ছুড়ে চম্পট দিতে সক্ষম হয়। আর কেউ ধরা পড়েনি। টাকা উদ্ধার এবং অপরাধীদের ধরার জন্য পুলিশ জোর তদন্ত শুরু করেছে।…’
ডাকাতটা ধরা পড়েনি! বেলার হৃদস্পন্দন আর একটু দ্রুত হল। তাহলে একমাত্র সেই পলাতক ডাকাত ছাড়া আর কেউ জানে না। গুজরাটি বস্ত্র ব্যবসায়ী, অথচ বিমল বলেছিল বিড়ি পাতার ব্যবসায়ী। তিমিরই ঠিক, বিমল রং চড়িয়ে বলে। খবরের কাগজে জেনেশুনেই লেখা হয়।
কাগজটা ভাঁজ করে সে দ্রুত পায়ে স্কুলের দিকে এগোল। বাকি অংশটুকু স্কুলে পড়ে নেবে।
আর একটা রাস্তা দিয়েও দেবিকাও স্কুলের দিকে আসছে, বেলা দূর থেকে হাত তুলে তাকে থামতে ইশারা করে এগিয়ে গেল।
‘কী ঘটেছে জান আমাদের পাড়ায়! এক লাখ টাকা রাস্তায় ডাকাতি!’
‘তাই নাকি।’ দেবিকা একটুও আশ্চর্য হল না।
‘এতো রোজই দু-পাঁচটা হচ্ছে। আমাদের ওদিকে ছ-টা ছেলে ডাকাতি করতে এসে ট্যাক্সিতেই সবাই ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। পরশু দিনের ঘটনা। সবাই ষোলো-সতেরো বছরের।’
‘আমাদের ওখানেও কুড়ি বছরের নীচে…এই তো কাগজে লিখেছে। পড়ে দ্যাখো।’
বেলা খবরের কাগজটা এগিয়ে ধরল।
‘পরে পড়ব চলুন দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
‘আমার ভাই কিন্তু ভয় কচ্ছে।’
বেলা হঠাৎ গলা নামিয়ে ফেলায় দেবিকা মন্থর হয়ে অবাক চোখে তাকাল ঘাড় ফিরিয়ে। দু-জনেই তখন স্কুলগেটের কাছে পৌঁছে গেছে।
‘এখানে নয়…ছুটির পর একটু অপেক্ষা কোরো বলব, তোমাকে দরকার আছে।’
অস্বস্তি ভরে বেলা ক্লাসগুলো শেষ করল। বার বার কাগজ খুলে ডাকাতির ঘটনা পড়ল। সে ঠিক করেই রেখেছিল কারোর সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে কথা বলবে না। কেউই এত সকালে কাগজ পড়ে আসেনি সুতরাং তাকে প্রশ্নের সামনে পড়তে হবে না।
‘পুলিশ জোর তদন্ত শুরু করেছে’, বলতে কী বোঝায়? এটা রুটিনমাফিক কথা। প্রত্যেক চুরি-ডাকাতির খবরের শেষে এটা থাকে। কিন্তু এক লাখ টাকা সামান্য জিনিস নয়।
কাগজ খুলে হেডলাইনটা চোখের সামনে রেখে সে অন্যমনস্ক হয়ে বাইরে থেকেছে। কোনোদিনই সে ক্লাসে পড়ানোয় ফাঁকি দেয় না। সৎ এবং কর্তব্যনিষ্ঠ হিসাবে তার সুনাম আছে। কিন্তু আজ সে কোনোভাবেই পড়াতে পারছে না।
খবরটার মধ্যে আগাগোড়া কোনো সহানুভূতি নেই মৃত ডাকাতটার জন্য। ডাকাত নয়, ছেলে বা তরুণই বলা উচিত। ‘গণধোলাই’ বা ‘চম্পট’ ধরনের চটুল শব্দ যেন ব্যাপারটার গুরুত্ব কমিয়েই দিয়েছে। ডাকাতি বা খুন এখন আর নাড়া দেবার মতো ঘটনা নয়, বরং লোকে যেন মজাই পায়। দেবিকার কোনো প্রাতক্রিয়াই হল না। হোক ডাকাত একটা তাজা ছেলে তো!
‘…কাছেই আর একটি কালো অ্যাম্বাসাডারে অপেক্ষা করছিল আরও তিনজন। তারা বেগতিক দেখে গাড়ি নিয়ে সটকে পড়ে। ধৃত অ্যাম্বাসাডারটি এন্টালি অঞ্চলে চুরি করা বলে পুলিশ জানিয়েছে। তার মধ্যে থলিভরতি বোমা, একটি ভোজালি…ধৃত ডাকাতটির নাম মন্টু বাগচি, যাদবপুর বাঘা যতীনের…ডাকাতি হবার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় পুলিশ খবর পায়। উত্তর কলকাতার ডেপুটি কমিশনার…মন্টু বলেছে তাদের দলের সাকরেদের সকলেরই দোনম্বরি নাম ও ঠিকানা। গোপনীয়তার জন্য সাংকেতিক ভাষায় তারা কথাবার্তা বলত।’
এদের একটা দল আছে, অবশ্যই তাদের একজন সর্দার আছে। জমায়েত হবার ঘাঁটিও আছে। যে ছেলেটা পালিয়েছে, সে ইতিমধ্যেই ঘাঁটিতে পৌঁছে গেছে বা লোক মারফত বা টেলিফোনে খবর দিয়েছে থলিটা কোন বাড়িতে ফেলে গেছে।
ওরা আজ থেকেই বাড়ির উপর, বাড়ির লোকেদের উপর নজর রাখতে শুরু করবে, কিংবা করেছে।
