তিমির রান্নাঘরে ফিরে গেছে। ঘরে এসে ব্যাগটাকে নিয়ে বেলা ইতস্তত করল। একশো টাকার নোটটা এর মধ্যে রয়েছে। তিমির অবশ্য কখনো তার ব্যাগে হাত দেয় না তবু…।
ব্যাগের মুখ ফাঁক করে নোটটা মুঠোর মধ্যে নিয়েই সে খোলা দরজার দিকে চোখ রেখে দেরাজ খুলল। থাক করে রাখা শাড়ি আর ব্লাউজের মাঝে নোটটা রাখতে গিয়ে তার চোখে পড়ল সকালে কেনা লটারির টিকিটটাও নোটের সঙ্গে উঠে এসেছে। দুটোই সে একটা ব্লাউজের ভাঁজে রেখে দিল।
মাথা ধরার অজুহাতে সে কপালে হাত রেখে শুয়ে রইল। এই সময় তিমির তার সঙ্গে কথা বলবে না, এটা সে জানে।
‘একটু কিছু খেয়ে নাও।’
‘ছাত্রীর বাড়ি খেয়েছি, রাতে আর খাব না।’
এক কাপ চা ছাড়া রীনারা আর কিছু দেয় না। গীতাদিকে নাকি রেস্টুরেন্ট থেকে কিছু-না-কিছু আনিয়ে দেয়। ছাত্রীর বাবাই মালিক।
বেলার সত্যিই খিদে নেই। সকাল থেকে কিছু না খেয়ে এইভাবে থাকা, দাদা মারা যাওয়ার দিনও ঘটেছিল বটে কিন্তু দুটো ঘটনা একজাতের নয়।
তাদের সারা সংসার দাদার মুখের দিকে আশা করে তাকিয়েছিল। চমৎকার কলেজ রেজাল্ট নিয়ে নম্র, পরিশ্রমী, স্নেহপ্রবণ এই তরুণ স্বাচ্ছল্য এনে দেবে, ভাইদের দাঁড়াতে সাহায্য করবে, মোটামুটি মধ্যবিত্ত স্তরে তাদের তুলে নিয়ে যাবে। চুরমার আশা এখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সুব্রত দুর্গাপুরে এক মোটর গ্যারেজে আছে, ভালো করে লিখতে-পড়তে জানে না হয়তো চিঠিপত্রও দেয় না। সুবীরের হাতের লেখা ভালো, ধরে ধরে ওকে হাতের লেখা করাত বেলা। মাসছয়েক আগে সুবীর লিখেছিল বোম্বাইয়ে এক হোটেলে বয়-এর কাজ করছে। আর সে লেখেনি।
এখন এদের কথা সে মনে করতে চায়নি, তবু হুড়মুড় করে ওরা চিন্তার মধ্যে ঢুকে আসছে। সে এখন ভাবতে চায় আগামীকাল কী করবে। দেবাংশুর অফিসে যেতে হবে। ঠিকানা লিখে দিয়েছে।
‘টাকা নিয়ে যাব কী?’
‘আসতেও পারেন….যদি কালই হয়ে যায়! কত টাকা?’
ওর অফিসেও টাকা ধার নেবার স্কিম চালু আছে। কাল অফিসে গিয়েই খোঁজ নেবে।
কিন্তু একসঙ্গে সব টাকার নয়। একশো টাকার থোকগুলো করকরে, নতুন পিন গাঁথা। সিরিয়াল নম্বর এক থেকে একশো পর্যন্ত। নিশ্চয় মালিকের লিখে রাখা আছে পুলিশ ইতিমধ্যে তা জানিয়েও দিয়েছে সব ব্যাঙ্ককে। নোটগুলো তার কাছ থেকে যে কোম্পানিই পাক নিশ্চয় বেলা দাসের নামটা সিরিয়াল নম্বরের সঙ্গে লিখে রাখবে। তারপর যখন তারা ব্যাঙ্কে পাঠাবে সেখানে ডাকাতির নোটের নম্বরের সঙ্গে মিলছে কিনা তা দেখা হবে।
এইরকম একটা ঘটনা সম্পর্কে লেখা কোন এক গোয়েন্দা পত্রিকায় সে যেন পড়েছে। জাপান না কোথায়, একটা নামি চোর দু-বছর পর নোট ভাঙিয়ে হিরে কিনতে গিয়ে ধরা পড়ে।
বরং অনেক নিরাপদ সুতুলি বাঁধা পঞ্চাশ টাকার পুরোনো নোটের তাড়াগুলো। নানান সিরিয়াল নম্বরের নোট ওতে আছে আর নিশ্চয়ই কেউ তা টুকে রাখেনি। চারশো নোট…অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু কুড়ি হাজার একসঙ্গে বার করলে সন্দেহ দেখা দেবে না কি? বড়ো বড়ো কোম্পানির কাছে এটা কোনো টাকাই নয়। ওখানকার লোকেরা রোজই লাখ-দু লাখ নাড়াচাড়া করে। কুড়ি হাজার নিয়ে চিন্তাই করবে না। কিন্তু দেবাংশু? সে ভাবতে পারে, সামান্য প্রাইমারি স্কুলটিচার, সামান্য কারখানা কেরানি-এরা এত টাকা জমালো কী করে? তারপর যদি কখনো শোনে, কতদূরেই বা থাকি নিশ্চয়ই কানে যাবে, এই পাড়াতেই একটা ব্যাঙ্কে ডাকাতি হয়েছে, ডাকাতটা টাকার থলি নিয়ে বেলাদেরই বাড়ি ঘেঁষে পালিয়েছে, আর বেলা তারপরই ডিপোজিট স্কিমে টাকা রেখেছে, তাহলে কী…
‘দাও, মাথাটা টিপে দি।’
বেলার পাশে বসে, তিমির হাত রাখল কপালে।
‘না থাক…এখুনি কমে যাবে।’
তার চিন্তার মাঝে, এ ধরনের বিঘ্ন বেলা এমন চায় না। চায় গভীর একাকিত্ব। সে চুরি করেনি বা কাউকে ঠকিয়ে অর্জন করেনি। এ টাকা বলা যায়, তার কাছে জমা রাখা হয়েছে। এ টাকার মালিক সে নয়, কিন্তু ঘটনাক্রমে হতেও তো পারে। তার দরকার। এত টাকা যদি ধরা পড়ে তাহলে সে কি জবাবদিহি করবে?
‘সারা দিনে এত পরিশ্রম, সকালে স্কুল বিকেলে টিউশনি… শরীরে সইবে কেন।’
তিমির হাত বুলিয়ে দিচ্ছে কপালে, মাথায়। বেলা কিছু অনুভব করতে পারছে না। শুধু তিমিরের নিশ্বাসের আর বাসি ঘামের গন্ধটা তাকে বিরক্ত করছে।
‘দরকার কী টিউশনির, ছেড়ে দাও।…আমাকে ওভারটাইম করতে বলছে, তাতে পঞ্চাশ টাকার অনেক বেশিই মাসে পাব।’
তিমিরের মৃদু শান্ত গলাটা তার বোলানো হাতের মতোই ব্যথিত, কাতর মনে হল। বেলা এখন ক্লান্ত বোধ করছে।…দেবাংশুর অফিসটা চিনে বার করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ওইসব অঞ্চলে কখনো সে যায়নি। ট্যাক্সিওয়ালাকে বললে হয়তো ক্যামাক স্ট্রিটে পৌঁছে দেবে, কিন্তু অতবড়ো রাস্তায় বাড়ি খুঁজে বার করা কী সম্ভব হবে!
‘…একটা সিনেমা-থিয়েটারও দেখা হয় না, ভালো শাড়িও কিনে দিতে পারি না, কোথাও বেড়াতে যাব যে…একবার প্ল্যান করেছিলুম আমরা দার্জিলিং যাব, মনে পড়ে?’
বেলা ঘুমের ভান করে উত্তর দিল না। তিমির সন্তর্পণে হাত বুলিয়ে চলেছে, অসুস্থ কন্যার প্রতি মায়ের মমতা নিয়ে।
ও জানে না খাটের নীচে ট্রাঙ্কে এক লক্ষ টাকা রয়েছে। এখন জানালে কী করবে? হয়তো জানানো উচিত ছিল। হয়তো কেন এমন ব্যাপার স্বামীকেই মেয়েরা সর্বাগ্রে জানায়।…কিন্তু কেন যে পারল না! পুলিশকে নয়, তিমিরকেও নয়। জানানোটা তো কোনো ভয়ের ব্যাপার নয়!
