কাতরে উঠে বেলা উপুড় হয়ে বালিশে মুখ চেপে ধরল। না, ও যেন ধরা না পড়ে। পালাক, যেখানে খুশি। এই চল্লিশ-পঞ্চাশ লক্ষ লোকের শহরে অনায়াসেই লুকিয়ে থাকতে পারবে। এটাও কী ওরা ভেবে রাখেনি যে, অত টাকা ডাকাতি করে পালিয়ে লুকিয়ে থাকতে হবেই?
কাল কাগজে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই বেরোবে। ক-জন ধরা পড়ল জানা দরকার। তিন-চারটে কাগজ কিনতে হবে। লাখ টাকা ডাকাতি, একটা বড়ো ব্যাপার। তার থেকেও বড়ো নিজেকে নিরাপদ করা।
‘আপনাকে আজ কেমন যেন দেখাচ্ছে, শরীর ভালো?’
বেলা অস্বস্তি বোধ করল। ভেতর থেকে রীনার গলা পাওয়া যাচ্ছে। কোনো একটা ব্যাপারে মা-র কাছে আপত্তি জানাচ্ছে। টিভি-তে আজ কোনো ফিল্ম দেখাবে কি?
‘হ্যাঁ, ভালোই তো আছি।’
এটা পড়ার ঘর নয়, লোকজন এলে বসানো হয়। দেবাংশু এই ঘরের লাগোয়া রাস্তার দিকের বারান্দায় অন্য দিনের মতো অফিস থেকে ফিরে আজও বিশ্রাম নিচ্ছিল ইজিচেয়ারে। এবং অন্য দিনের মতোই বেলাকে রাস্তায় দেখামাত্র সদর দরজার কাছে এসে অপেক্ষা করেছে। দরজা খুলেই সে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কথাটা বলে।
চোখে মুখে তাহলে কী উদবেগ, ভয় ফুটে উঠেছে? মাত্র ছ-সাত ঘণ্টার মধ্যেই কী তার এতটা বদল ঘটেছে যে ভেতরের গোলমালের ছাপ মুখে পড়ে গেছে? কিন্তু সে তো প্রাণপণে বিকেল থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছে স্বাভাবিক থাকতে। স্বাভাবিক আচরণ, চলাফেরা, কথাবার্তা।
‘বিমল, তোমার ওই লাল জামাটা এবার ছাড়ো। লোকে তোমাকেই এবার ডাকাত ভাববে।’
‘ডাকাতরা বুঝি লাল জামা পরে! খুব বুদ্ধি আপনার, এরকম ব্রাইট জামা পরলে তো চট করে স্পট করে ফেলবে।…আর আমি যদি ডাকাত হই তো সবাই ডাকাত। নিন, পয়সাগুলো গুনে নিন।’
বিমল কেরোসিনভরা টিনটা মেঝে থেকে তুলে রান্নাঘরে রেখে এল। বেলা পয়সা গোনেনি।
‘একটু সাবান দিনতো, হাতে গন্ধ হয়ে গেছে।’
বেলাদের কলঘরে হাত ধোবার সময় বিমল বলেছিল : ‘কীরকম পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছিলুম চান করার সময়।’
‘ভাতটা পুড়ে গেছল, কলঘরে হাঁড়ি পরিষ্কার করেছি।’
‘নিশ্চয় তাহলে খাওয়া হয়নি, তাই কেমন যেন শুকনো শুকনো দেখাচ্ছে?’
বিমলও লক্ষ করেছে কিছু একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার তার ঘটেছে। তবু ভালো, চট করে ভাতপোড়ার কথাটা বলায় সে অন্য কিছু ধরে নিল। অফিস থেকে ফিরে তিমিরেরও নিশ্চয় চোখে পড়বে আর এমন কিছুই বলবে।
‘কই কিছুই তো আমার হয়নি।’
নিজেকে স্বাভাবিক দেখাতে বেলা লাজুক হাসল। দেবাংশুও তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত চট করে চোখ বুলিয়ে হাসল।
‘ঠিক অন্যদিনের মতো দেখাচ্ছে না।’
‘অন্যদিন কীরকম দেখায়?’
বেলা এখন কারোর সঙ্গে কথা বলে মনের মধ্যে এমন একটা আবহাওয়া তৈরি করতে চায়, যেখানে শিব দত্ত লেনের চিন্তা থেকে সে রেহাই পাবে। এই লোকটি বোকা নয়, অমার্জিতও নয়। বোধহয় ভরসা করা যায়।
‘আরও তাজা, আরও মিষ্টি…ফুলের মতো।’
দেবাংশুর গৌরবর্ণ গালদুটোয়, কপালে রক্ত ছুটে এসেছে বোধহয়। হঠাৎ গোলাপি হয়ে উঠল। বেলা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিল ভেতরে ভেতরে সে ব্যস্ত মরিয়া হচ্ছিল, যেকোনো ধরনের একটা ব্যাপারের মধ্যে চলে যাবার জন্য। এবার মাথার পিছনে দুটি হাত রেখে পা ছড়িয়ে দিয়ে শরীরটা টান টান করল আড়মোড়া ভাঙার ভঙ্গিতে।
তার বুক, গলা খুব খারাপ নয়। দেবাংশুকে লক্ষ করতে করতে সে হঠাৎ সচেতন হয়ে হাতদুটি নামিয়ে বুকের কাপড় টানল। আজকের ডাকাতির কথা ওকে না বলাই উচিত। আজ বিকেলেই তার মনে হয়েছে নোটগুলো সরাতে হবে, হয়তো ও সাহায্য করতে পারে। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে তার যোগসূত্র কিছুই নেই। দেবাংশু মারফত করা যায়।
‘ফুল তো আর চিরদিন তাজা মিষ্টি থাকে না। বয়স তো হচ্ছে।’
‘কারোর কারোর হয় না।’
দেবাংশুর গলা কাঁপল। প্রায় পঞ্চাশে এসে এই অবিবাহিত দৈত্যটি এবার বোধহয় কিছু মধুর স্মৃতি চায়। বেলা মমতা বোধ করল।
‘হয়। ফিজিয়োলজির নিয়মে হতে বাধ্য। তবে আপনার ক্ষেত্রে…’
বেলা বাক্যটি অসমাপ্ত রেখে সাদা পাঞ্জাবি-পাজামায় ঢাকা চওড়া ভারী আকৃতিটির দিকে ক্ষণেকের জন্য দৃষ্টি রাখল। বুকটা একটু ফুলিয়ে দেবাংশু স্মিত হাসল। তার বডিবিল্ডিং প্রয়াস এতদিনে যেন কিছু একটা লক্ষ্যে পৌঁছেছে।
সেই সময় রীনা ঘরে এল বইভরা সুটকেস নিয়ে, মুখটা থমথমে, বিরক্ত। বেলা মুখে গাম্ভীর্য টানার আগে, বারান্দায় যেতে উদ্যত দেবাংশুকে বলল : ‘একটা ব্যাপারে আপনার একটু পরামর্শ চাই।’
”কী পরামর্শ?’
‘কাগজে দেখি নানান কোম্পানির ডিপোজিট স্কিমের বিজ্ঞাপন… কিছু টাকা রাখব, আচ্ছা পরে বলবখন।’
লোডশেডিং হয়নি তবু দেবাংশু তার সঙ্গে শিবদত্ত লেনের মুখ পর্যন্ত এল।
‘কালকেই আসুন, দুটো-তিনটে নাগাদ। অফিস চিনতে কোনো অসুবিধে হবে না।’
‘সে আমি ঠিক চলে যাব। আচ্ছা…’
বেলা ঘাড় নেড়ে বুঝিয়ে দিল দেবাংশুকে আর এগিয়ে দিতে হবে না।
সদর দরজার তালাটা নেই। তিমির এসে গেছে। কড়া নাড়ার পরে প্রতিদিনের মতো তাকে সেকেন্ড দশেক অপেক্ষা করতে হল।
দরজা খুলেই তিমির মৃদুস্বরে অনুযোগের ভঙ্গিতে বলল: ‘দুপুরে খাওনি।’
‘যা কাণ্ড হল, খিদেটিদে মাথায় উঠে গেল।’
‘স্বাস্থ্যকে অবহেলা করা উচিত নয়।’
সকালের ডাকাতি সম্পর্কে তিমিরের কোনো ঔৎসুক্যই নেই। নিশ্চয় শুনেছে, কেননা বাড়ি ফেরার পথে প্রতিদিনের মতো নিশ্চয় মোড়ের দোকানে পাঁউরুটি কিনতে ঢুকেছিল।
