‘এই ডাকাতটার মুখে ছিল…মানে বলাবলি করছিল তাই কানে এল।’
একটুর জন্য সে ধরা পড়ে যাচ্ছিল। ডাকাতটাকে সে দেখেনি, এটা মনে রাখতে হবে। বিমলের অবশ্য কোনো খটকা লাগল না।
‘বুঝলেন, দিদি, এসব করতে হলে নার্ভ লাগে। দিন-দুপুরে অত লোকজন রাস্তায়, যন্তর দেখিয়ে বোমা মেরে টাকা লুঠ করে পালানো কী মেয়েমানুষ নিয়ে পালানোর মতো অত সোজা ব্যাপার।’
মেয়েমানুষ মানে সাগরিকা। প্রসঙ্গ যাতে না আসে তাই বেলা তাড়াতাড়ি বলল: ‘টাকাটা কাদের?’
‘এক গুজরাটি পার্টির, বিড়ি-তামাকের ব্যবসা করে। দুটো লোক আর একটা দারোয়ান, সঙ্গে বন্দুকও নেই। অবশ্য থাকলেও কিছু হত না।’
‘কেন?’
‘যার হাতে বন্দুক তাকেই তো আগে খতম করবে।’
‘কত টাকা ছিল?’
‘কেউ বলছে পঞ্চাশ হাজার, কেউ বলছে একলাখ।…দোকান ফেলে ওসব কে আর শুনতে যায়, লাভ কী আমার বলুন? টাকা কী আমার? না আমি টাকা পাব?’
‘পঞ্চাশ হাজার হলেও, কম নাকি!’
‘কম মানে! আমি পেলে এখুনি দশ হাজার টাকা সেলামি দিয়ে পালেদের কোণের ঘরটা নোব। দেখেছেন ঘরটা? কী দারুণ পোজিশান…আপনাকে দেখাব। প্রভাস বলেছিল ঘরটা করিয়ে দেবে।’
বিমলের গলায় বিষ নেই। প্রভাস সম্পর্কে তার বিশেষ ঝাঁঝ নেই যতটা আছে সাগরিকার জন্য।
‘পঞ্চাশ হাজার পেলে ওই ঘরটা নেবে, আর যদি লাখ পাও?’
খাটে বসে বিমল হাতটা আলতো করে বুলির মাথায় বোলাচ্ছে। পিসি ভাতের থালা নিয়ে ঘরে ঢুকল।
‘চান করবি তো কর।’
‘যাচ্ছি…ওসব স্বপ্নেই পাওয়া যায়, ওসব আমি দেখি না…ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন!’
বিমলের গলা তাচ্ছিল্যে মৃদু। মুখের শুকনো ত্বকে একটা নরম আভা। মোটা, কর্কশ আঙুলগুলো অতিযত্নে মেয়ের গায়ে বুলিয়ে যাচ্ছে। বেলা লক্ষ করল, ওর বাহুদুটো শরীরের তুলনায় ছোটো। কানের পাশে দু-তিনটে পাকা চুল। একসময় প্রভাসের মতো ঘাড় পর্যন্ত চুল ছিল, এখন ছেঁটে ফেলা। ঘাড়ে একটা ইঞ্চিতিনেক গভীর দাগ। বছরদশেক আগে নকশালরা নাকি ওকে খুন করার চেষ্টা করেছিল। তিমির বলেছিল, গুল মেরেছে। জেটি থেকে গঙ্গায় ঝাঁপ দিচ্ছিল তখন লোহার খোঁচা লাগে।
‘লাখ টাকা যদি হয়, তাহলেও তো কম টাকা নয়!’
‘একটা গাড়ি, পাইপগান, রিভলভার, বোমা আর শুধু সাহস, ব্যস…পাঁচটা জীবনেও যা পারব না পাঁচ মিনিটে তাই রোজগার। দিদি সবই জোগাড় হয় শুধু হয় না ওই সাহসটাই। ওটা পেলে আমিও লাখপতি হবার চেষ্টা করতুম। কাগজে দেখুন, রোজই দু-চারটে হচ্ছে,…রোজ ট্রাম-বাস ঠেঙিয়ে অফিস নয়, রোজ দোকানে বসা নয়, শুধু পাঁচ মিনিটের জন্য সাহস, তারপর লাখপতি।’
‘একা একা এসব করা যায় না। লাখপতি কী আর একজন হয়, ভাগ করতে হয় তো টাকাটা?’
‘একজনের কাজ তো নয়ই। এই যে আজ হল…খবর পেয়েছে আজ টাকা জমা দিতে আসছে। পেল কী করে খবরটা? নিশ্চয় ভেতরে লোক আছে, তাকেও বখরা দিতে হবে। নানাদিকে ওয়াচ রাখতে হয়, লোক লাগে, টাকাও ভাগ হয়। কাউকে ফাঁকি দিলেই বিপদ, নয়তো রিভেঞ্জ নিতে পুলিশকে জানিয়ে দেবে।’
ওয়াচ! বেলা সিঁটিয়ে গেল মনে মনে। এবার তাকেও, বাড়ির সকলকেই ওরা ওয়াচে রাখবে। যে ডাকাতটা থলি ফেলে দিয়ে পালাল সে কী ধরা পড়েছে? পড়লেই বা কী সুবিধে হবে। পুলিশের কাছে মারের চোটে ঠিকই বলে দেবে কোন বাড়িতে ছুড়ে ফেলে দিয়ে গেছে।
‘তুমি এবার খেয়ে নাও। আর, ভাই, একটা কাজ করে দিতে হবে, দু লিটার কেরোসিন এনে দিয়ো। দোকানে বলেছে আজ নাকি তেল আসবে।’
‘টিনটা দিয়ে যান।’
টিন আর টাকা নিয়ে আসার সময় বেলার কানে এল পিসির গলা।
‘অ বিমল, আমাদের চৌবাচ্চচায় তো জল নেই, চান করবি কী করে?’
‘এক বালতি মতো হবে না?’
‘তুমি আমাদের কলঘরে যাও না, অনেক জল আছে।’
বেলার দিকে অবাক চোখে পলকের জন্য তাকিয়ে বিমল গামছাটা হাতে নিল। মাঝের দরজা পার হবার এই প্রথম সুযোগ তাকে দেওয়া হল।
খাটে শুয়ে বেলা আবার ভাবতে শুরু করল। ধরা পড়ে ডাকাতটা নিশ্চয় পুলিশকে সব বলে দেবে। পুলিশ সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে আসবে।
শিব দত্ত লেনের মুখে ভ্যান এসে দাঁড়াবে। অফিসারদের সঙ্গে রাইফেল হাতে বেশ কিছু কনস্টেবলও আসবে। বাড়িতে বাড়িতে সাড়া পড়ে যাবে। জানলা, দরজা, বারান্দা, ছাদে ফিসফিস জল্পনা হবে। কোথায়? কাদের বাড়িতে? কেন?
হাতকড়া দেওয়া, কোমরে দড়ি বাঁধা ডাকাতটাকেও নিশ্চয় সঙ্গে করে আসবে, বাড়ি চিনিয়ে দেওয়ার জন্য।
‘কোনখান দিয়ে থলিটা ছুড়ে ফেলেছিলে?’
ও দেখাবে।
‘ফেলার সময় কাউকে দেখতে পেয়েছিলে?’
‘ছাদে পাঁচিলে একটা দেখেছিলুম, মেয়েছেলের।’
‘দ্যাখো তো ইনিই কিনা।’
ভ্রূ কুঁচকে, অনিশ্চিত চাহনিতে তার মুখের দিকে তাকাবে। ভয়, উত্তেজনার মধ্যে ছুটতে ছুটতে দু-তিন সেকেন্ডের জন্য মুখটা উপরে তুলে তাকিয়েছিল। চিনে রাখা সম্ভব নয়।
‘হ্যাঁ, ইনিই মুখ বাড়িয়েছিলেন।’
‘ঠিক বলছ? ভালো করে দ্যাখো।’
‘হ্যাঁ, ঠিক বলছি…ইনিই।’
‘যখন থলিটা ছুড়ে ফেললে, তখন কী ইনি সেটা দেখেছেন?’
‘বলতে পারব না, তখন কুঁজো হয়ে ছিলুম যাতে না কেউ দেখতে পায়। পাঁচিলের ওপরে ছুড়ে দিয়েই পালিয়েছি…পেছনে তাকাবার সময় ছিল না।’
‘তুমি কি জানতে তখন এই বাড়িতে ওই সময় কারা কারা রয়েছে?’
‘হ্যাঁ। আগেই আমরা খবর নিয়ে রেখেছি।’
‘মিসেস দাস, এবার আমরা বাড়িটা সার্চ করব।’
