বেলা রান্নাঘর থেকে বঁটি আর কেরোসিনের বোতল আনল। থলিটাকে আট টুকরো করে তাতে কেরোসিন ঢালল।
‘এ কি! আধবোতল কেরোসিন রেখে গেছলাম গ্যালো কোথায়?’
তিমিরের চোখ এড়ানো যাবে না। বাতিক, প্রত্যেক বিবাহিত দম্পতিরই এমন কিছু বাতিক থাকবেই। বিমলকে দিয়ে দু লিটার আনিয়ে বোতলটাকে ঠিক আগের মতোই ভরে রাখতে হবে। ওকে বিকেলের আগেই ধরতে হবে। ‘ধরতে হবে’ শব্দ দুটিতে বেলার আপত্তি হল না।
অল্পই সময় লাগল থলিটা পুড়ে যেতে। কলঘরটা ধোঁয়ায় ভরতি হয়ে গেছে। বিশ্রী একটা গন্ধে বেলার পাকস্থলী মুচড়ে উঠল। সন্তর্পণে জানলাটা খুলে দিয়ে দেখল উঠোনে বা বিমলের জানলায় কেউ নেই।
মর্গ দিয়ে চৌবাচ্চচা থেকে জল তুলে কলঘরের মেঝে সে ধুয়ে দিল। আধপোড়া কালো কিছু টুকরো ছিবড়ের মতো পড়ে রয়েছে। দেখে অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না কীসের পোড়া। তবু সাবধান হবার জন্য সেগুলো খুঁটে খুঁটে তুলে পায়খানার প্যানের ভিতরে ফেলে কয়েক বালতি জল ঢেলে দিল।
কী চমৎকারভাবে কাজগুলো তার মাথায় এসে যাচ্ছে। নিশ্চয় ডিটেকটিভ বই পড়ার ফল। বিয়ের আগে সে গোয়েন্দা বইয়ের পোকা ছিল। এখনও পেলে পড়ে। রীনার মা লাইব্রেরি থেকে বই আনায়। কয়েকবার বেলা চেয়ে এনে পড়েছিল।
কলঘরে সে বুক ভরে শ্বাস টেনে বাতাস শুঁকল। কেরোসিনের গন্ধ সামান্য পাওয়া যাচ্ছে। তিমির আসার আগেই হয়তো মিলিয়ে যাবে।
‘কলঘরে কেরোসিনের গন্ধ পেলুম!’
‘হ্যাঁ, ওখানে বোতল নিয়ে গিয়ে টিনটা থেকে ঢাললুম। ঘরের মেঝেয় পড়লে বড্ড গন্ধ হয়, পায়ে পায়ে ঘরেও আসে।’
পোড়ানোর ব্যাপার এখানেই শেষ, এবার নোটগুলো। ছেঁড়া একটা বালিশের খোল পড়ে আছে। ওটাকে ঘর মোছার জন্য ব্যবহার করতে বলেছিল তিমির। এখনও করা হয়নি।
নোটগুলো খোলটার মধ্যে থাক দিয়ে ভরে, তার একমাত্র ট্রাঙ্কে শাড়ির নীচে রাখতে গিয়ে বেলা থমকাল। নোটগুলো জাল নয়তো? পরীক্ষা করে দেখতে দোষ কী!
পঞ্চাশ টাকার নোটগুলো পুরোনো, ব্যবহৃত। জাল হলে আগেই ধরা পড়ে যেত। কিন্তু একশো টাকারগুলো?
বেলা স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে তাড়ায় গাঁথা পিনের ভাঁজকরা মুখ সোজা করে একশো টাকার একটি নোট বের করে নিল।
চোরের মন নিয়ে সে এটা করছে না। সে শুধু জানতে চায় এগুলো জাল না আসল। নিজের আচরণ ঠিক রাখার জন্য এটা জেনে রাখা দরকার নয় কী?
ট্রাঙ্ক বন্ধ করে, তালা দিয়ে, চাবিটা সে দেরাজে না রেখে হাতব্যাগে রাখল। যখন সে বাড়ির বাইরে, তখন কোনো কারণে তিমির হয়তো ট্রাঙ্ক খুলতে পারে। অবশ্য কোনোদিনই সে ওটায় হাত দেয়নি, তবু বলা যায় না। কে ভাবতে পারে একলাখ টাকা উড়ে এসে বাড়িতে পড়বে?
বেলা বিছানায় শুয়ে, ভাববার চেষ্টা করল, পুরো ঘটনাটাই মিথ্যা অলীক মরীচিকা। বড়ো বেশি সে ভাবছে। তার শান্ত থাকা উচিত। নয়তো কোথায় কার কাছে বেফাঁস বলে ফেলবে। এত টাকা নিয়ে কী করবে সেসব চিন্তা পরে করা যাবে। এখন স্বাভাবিক থাকতে হবে।
পাতলা হালকা ঘুমেরই মতো একটা আচ্ছন্নতার মধ্যে সে ভাসতে শুরু করল।
‘…আমি তো দোকান থেকে সবার আগে লাফিয়ে বেরিয়েছি বোমার আওয়াজ পেয়েই।…দুটো গাড়িতে এসেছিল।’
‘বেরোলি কেন, যদি তোর গায়ে মারত!’
‘আরে রাখো, অত সোজা না…ব্যাটাদের গাড়িও এমন, আসলটাই স্টার্ট নিল না…তাহলে।’
বিমলের গলা। আজ দেরি করে এসেছে। বেলা উঠে বসল। ব্যাপারটা শুনতে হবে, শোনা দরকার। কৌতূহলী হওয়া মোটেই অস্বাভাবিক নয়। বিশেষত একটা ডাকাত তাদের গলিতে ঢুকে বোমা ছুড়েছে বাড়ির গা-ঘেঁষে পালিয়েছে।
‘কী হয়েছে বিমল?’
বেলা মাঝের দরজাটা খুলে বিমলদের অংশে এসে ওর ঘরের দরজায় দাঁড়াল।’
‘দিদি, কী বলব, ব্যাটারা যে এত কাঁচা কাজ করবে ভাবিনি। এসব কাজে কেউ গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে? আপনিই বলুন, য়্যাঁ…বাইচান্স যদি স্টার্ট না নেয়! আর হলও তাই।’
প্যান্ট ছাড়ার জন্যে লুঙ্গিটা মাথা দিয়ে গলিয়ে একটা প্রান্ত দাঁতে ধরে প্যান্টের বেল্ট খুলছে। এ সময় দাঁড়িয়ে থাকাটা কুরুচিকর জেনেও বেলা দাঁড়িয়ে রইল। সে সত্যিই কৌতূহল বোধ করছে।
‘ঠিক করা ছিল মাল নিয়ে ওই গাড়িতেই উঠবে। স্টার্ট না হতেই ব্যাটারা দিশেহারা হয়ে ছুটল…আরে আর একটা গাড়ি আছে তাতে উঠে পড়! …দুটো ধরা পড়েছে। একটাকে তো পাবলিক…আমার দোকানের সামনে দিয়েই দৌড়চ্ছিল, হাতের কাছে কিছু না পেয়ে গ্লাসটাই ছুড়ে মারলুম তাক করে। ঠিক লাগল।’
কৃতিত্ব জ্ঞাপনের জন্য বিমলের দাঁত বেরিয়ে এল। কোমরে লুঙ্গির কষি বেঁধে প্যান্টটা ভাঁজ করে দড়িতে ঝুলিয়ে রাখল। পিসিমা ভাত সাজাচ্ছে থালায়, বুলি ঘুমোচ্ছে।
‘তবে বাঁচবে না, যা গণধোলাই পড়েছে।…যে ব্যাটা আমাদের গলি দিয়ে পালাল, তার কাছেই মাল ছিল। দেখেছেন নাকি?’
‘না। আমি তখন ভয়ে ছাদ থেকে নেমে আসছিলুম। একটা বোমা তো আমাদের প্রায় দোরগোড়াতেই ফাটল।’
‘হ্যাঁ, তাই শুনলুম বস্তি দিয়ে পালিয়েছে।’
‘আচ্ছা আর একটা গাড়ির কী হল?’
‘আর দাঁড়ায়! সব গোলমাল হয়ে গেল দেখে হাওয়া…সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে শ্যামবাজারের দিকে চলে গেল।’
‘ক-জন ছিল?’
‘তা অত দেখিনি। অন্তত জনাচারেক তো থাকবেই।’
‘মুখে রুমাল বাঁধা ছিল?’
‘না বোধহয়, যারা দেখেছে তারা তাহলে বলত।’
