আর হতে পারে, টিউশনিতে যাবার সময় থলিটা নিয়ে বেরোবে। একটু দেরিতে রাত করে ফিরবে এবং ফেরার সময় কোথাও….পার্কের ধারে ভিখিরিদের আস্তানার কাছে জায়গাটা অন্ধকার, হাঁটতে হাঁটতে টুক করে ফেলে দেবে, যেন হাত থেকে পড়ে গেছে। কেউ যদি দেখতে পেয়ে ডেকে হাতে তুলে দেয়, তখন নয় ‘ওহ তাইতো! ধন্যবাদ।’ বলা যাবে।
কিন্তু এসবই বেলার কাছে বিপজ্জনক প্রস্তাব মনে হচ্ছে। আপাতত বাড়ি থেকে দু-হাতে কিছু নিয়ে বেরোনো একদমই নয়।
ঘরের সর্বত্র চোখ বুলিয়ে বেলা আজই প্রথম বুঝতে পারছে কোনো জিনিস লুকিয়ে রাখার মতো জায়গা এই ঘরে নেই। খুঁতখুঁতে তিমির কখন যে কোথায় চোখ দেবে বলা যায় না। যেকোনো সময় তোশক ওলটাতে পারে, দেরাজের মাথা থেকে স্ক্রু ড্রাইভার পাড়তে পারে, খাটের নীচে হানা দিয়ে ঢুকতে পারে একটা কাগজের কুচি কুড়োবার জন্য।
আর একটা ব্যাপার বেলার চোখে পড়ল, ঘরের আসবাবগুলো অত্যন্ত পুরোনো, সেকেলে জবড়জং। কোনোটাই বর্ণনা করার মতো নয়। এইরকম ঘর আর আসবাব কলকাতায় নিশ্চয় হাজার হাজার পরিবারের আছে।
এই ঘর তবু ভালো তার বাপের বাড়ির থেকে। দাদা মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে মারা যায়। বলা হয় নিউমোনিয়ায়, আসলে হয়েছিল টি বি। একতলায় আলো বাতাস রোদবিহীন একটা ঘরেই তারা একত্রিশ বছর কাটিয়েছে। মা বাতে ভুগেছে জীবনের অর্ধেক বছর। বেচারা, বছরে দু-তিনবারের বেশি বাড়ি থেকে বেরোবার সুযোগই পেত না।
সে চোর নয়। টাকাগুলো খরচ করার বাসনা তার নেই যদিও এগুলো এই মুহূর্তে কারোরই নয় বলেই মনে হচ্ছে। তাই কী? কারা যেন ব্যাঙ্কে জমা দিতে এসেছিল।
ওরা নিশ্চয় কয়েকদিন আগেই ডাকাতির প্ল্যান করেছে। নিশ্চয় জানত আজ একলাখ টাকা জমা দিতে আসবে। কীভাবে ডাকাতি করবে…নিশ্চয় এটাও ভেবেছিল, যদি ব্যর্থ হয় তাহলে কোন রাস্তা দিয়ে পালাবে। শিব দত্ত লেনে ঢুকেছে যখন, বুঝতে হবে ওরা আগেই দেখেশুনে গেছে পথটা। হয়তো এটাও ঠিক করেছিল, নিরাপদ হবার জন্য থলিটা এই বাড়িতেই ফেলবে।
কেন এই বাড়িটা। নিশ্চয় ওরা স্টাডি করেছে বাড়ির লোকেদের। ওরা লক্ষ করেছে এগারোটা নাগাদ বেলা ছাড়া আর কেউ থাকে না। ওরা নিশ্চয় তাকে ফলো করেছে স্কুলে যাওয়া-আসার সময়, টিউশনিতে যাওয়া-আসার সময়ও। কিছু কী লক্ষ করেছে?
দু-দিন দেবাংশুবাবু তাকে এগিয়ে দিয়ে গেছে বি কে পাল অ্যাভিন্যুর মোড় পর্যন্ত।
‘এই লোডশেডিংয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকারে একা যাবেন কী! চলুন এগিয়ে দিচ্ছি।’
‘না না আমি পারব, চেনা রাস্তা, আপনাকে আর কষ্ট করে…’
লোকটা কথা শোনেনি। টর্চটা বার দুয়েক জ্বালিয়ে ব্যাটারির তেজ পরীক্ষা করে বলেছিল: ‘আসুন, আমারও একটা দরকার আছে ওদিকে।’
জোরালো ভারী গম্ভীর গলা। একসময় নাকি বডি বিল্ডিংয়ে বছর পনেরো ব্যয় করেছে তার ছাত্রী রীনার এই অবিবাহিত জ্যাঠা। এখন কোনো এক ওষুধ কোম্পানিতে বড়ো চাকুরে।
রীনাকে পড়াবার সময় বেলা লক্ষ করেছে দেবাংশু বারান্দায় গেঞ্জি গায়ে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে থাকে। দেবাংশুর কাঁধ বাহু বুক ঘাড় এমনকী মসৃণ টাকও সে পর্দার ফাঁক থেকে দেখতে পায়। থাক থাক পেশি, আঁকাবাঁকা শক্ত লাইন টেনে শরীরটাকে রুক্ষ করে রেখেছে। মাঝে মাঝে মুখ ফিরিয়ে ঘরের দিকে তাকায়। বারকয়েক ধরাও পড়েছে বেলার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে।
একদিন পড়িয়ে বেরোবার পর বেলা কিছুটা হেঁটে মুখ ফিরিয়ে বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখেছিল দেবাংশু দাঁড়িয়ে রয়েছে। সে একটু অবাকই হয়েছিল কিন্তু আর কখনো তাকায়নি। তার ধারণা, প্রতিদিনই বেরিয়ে যাবার সময় দাঁড়িয়ে উঠে তাকে দেখে। কী দেখে?
ওরা কী এটা লক্ষ করেছে?
‘রাস্তাগুলো খোঁড়াখুঁড়ি করে এমন করে দিয়েছে, কোথায় যে হুমড়ি খাবেন কী পা ভাঙবেন…ভিখিরিগুলোও যেখানে সেখানে…তার ওপর আছে কুকুর।’
তার গা-ঘেঁষে চলতে চলতে দেবাংশু বলেছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। বেলা সতর্ক ছিল কোনোভাবেই শরীর যেন স্পর্শ না করে। কিন্তু হঠাৎই তার বাহুটা বিরাট শক্ত মুঠোয় চেপে ধরবে, এটা সে ভাবেনি। তখন তারা রাস্তা পার হতে যাচ্ছিল।
‘আর একটু হলেই…’
আবছায়া এক সাইকেল আরোহী বেলার সামনে দিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে যেতেই সে চমকে পিছিয়ে এসেছিল।
‘লোকটার সাইকেলে আলো থাকা উচিত ছিল।’
এই বলে তার হাতটা ছেড়ে দেয়। কয়েকসেকেন্ড মাত্র। খুবই নিরীহ ব্যাপার।
এটা কী ওরা লক্ষ করেছে? অসম্ভব, অত অন্ধকারে দু-হাত দূরের জিনিস দেখা যাচ্ছিল না। তা ছাড়া এত আচমকা কম সময়ের জন্য। হাত ধরাটাও পূর্ব পরিকল্পিত নয়। এভাবে যে-কেউই অন্যকে আঘাত থেকে বাঁচাবার জন্য, ধরবে। ‘ধরবে’ শব্দটা বেলার নিজের কাছেই বিশ্রী ঠেকল। ‘রক্ষা করবে।’
কিন্তু এই মুহূর্তে কী করলে সে রক্ষা পাবে? এইসব আজেবাজে চিন্তা কেন আসছে যখন সে থলিটাকে চোখের আড়াল করতে চাইছে? আশ্চর্য, একটাও জায়গা নেই এই বাড়িতে!
হঠাৎ তার মনে হল, থলিটা তো পুড়িয়ে ফেলা যায়!
ধড়মড়িয়ে সে উঠে দাঁড়াল। কোথায় পোড়াবে? রান্নাঘরে? ছাদে? কলঘরে? তাই ভালো, কলঘরেই।
থলিটা ভাঁজ করে সে কলঘরে ঢুকে ছোট্ট জানলাটা বন্ধ করে দিল। থলিটাকে কেটে কয়েকটুকরো করে নিলে কেমন হয়? দেশলাই দিয়ে হয়তো ধরানো যাবে না। কেরোসিন দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে।
