বেলা ভেবে পেল না, ডাকাতটা এই বাড়িটাই বেছে নিল কেন থলিটা ফেলার জন্য? হয়তো আগেই খোঁজ নিয়ে জেনেছে এই সময় শুধু বেলাই থাকে। ভীরু, নিরীহ, সৎ, বোকা মেয়েছেলে। ডাকাতরা যদি স্বচ্ছন্দে পালাতে পারত তাহলে থলিটা ছুড়ে ফেলার দরকারই হত না। হায় ভগবান, কেন নিরাপদে ওরা পালাতে পারল না। তাহলে সে এতক্ষণে স্নান সেরে ভাত খেয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়ত।
কেন এমন হল? কেন এটা? কেন ওটা? কেন সে? কেন সবকিছু?
দেরাজ থেকে থলিটা সে বার করল। দড়ি দিয়ে মুখটা বাঁধা। এটা কী সে খুলবে? আইনগত তার অধিকার নেই খোলার। কিন্তু বা ঘটে গেছে তাতে কী মনে হয় না, এর ভিতরে কী আছে সেটা জানা দরকার, অত্যাবশ্যক?
কর্তব্য নয় কৌতূহল, এটা সে আপাতত মানতে চাইল না। তা ছাড়া, আত্মরক্ষার প্রশ্নটাও রয়েছে। একটা অপরাধী যে অভিজ্ঞতা লাভ করে এই থলিটা তাকে সেই অভিজ্ঞতাই দিয়ে যাচ্ছে। যেজন্য ডাকাতি, তার পুরো রহস্য এর ভিতরে রয়েছে এবং সেটা জেনে রাখা দরকার।
গিঁটটা শক্ত করে বাঁধা। ব্লেড দিয়ে দড়িটা কেটে থলির মুখটা ছড়িয়ে দিতেই সে তাড়া তাড়া ব্যাঙ্ক নোট দেখতে পেল।
বেশিরভাগই একশো টাকার। করকরে নতুন পিন দিয়ে গাঁথা। পুরোনো নোটেরও কয়েকটা বান্ডিল রয়েছে সুতো বাঁধা, সেগুলো পঞ্চাশ টাকার।
বেলার প্রথম প্রতিক্রিয়া হল, জানলা দিয়ে বিমলের ঘরের দিকে তাকানো। বুলিকে চাপড়ে চাপড়ে ঘুম পাড়াচ্ছে পিসি।
‘না, এখুনি নয়…’ বেলা নিজেকে শুনিয়ে বলল।
এখন নয়। আগের বুকের মধ্যে ধড়ফড়ানিটা কমুক চিন্তা করার ক্ষমতা ফিরে আসুক। নিঃশেষ হয়ে গেছে সে। আর স্বাভাবিক বোধ করছে না। মানসিক ভারসাম্য ফিরে পাওয়া দরকার।
থলিটা আবার দড়ি দিয়ে বেঁধে সে দেরাজে তুলে রাখল। কয়েকমিনিট পর কলঘরের দরজা বন্ধ করে সে স্নান করার জন্য শাড়ি ব্লাউজ প্রভৃতি খুলতে শুরু করল।
জীবনে সে এমন লগ্ন এমন নিঃসঙ্গ আর কখনো বোধ করেনি।
স্নান করে খাটে শুয়েছিল বেলা। বিদ্যুৎ এসে গেছে। পাখাটা জোরে ঘুরলে দোলে। একঘেয়ে কিচমিচ একটা শব্দ হচ্ছে পাখা থেকে। চোখ বুজে শব্দটা শুনতে শুনতে তার তন্দ্রা আসছে।
ডাকাতটা কি তাকিয়েছিল তার দিকে? হয়তো। নিশ্চয় দেখে রেখেছে, আবার দেখলে হয়তো বেলাকে চিনতে পারবে। কিন্তু চিনে রাখার মতো সময় ধরে কী সে তাকিয়েছিল?
ডাকাতটা কী পালাতে পেরেছে? যদি পেরে থাকে তাহলে থলিটা উদ্ধারের চেষ্টা করবেই। কীভাবে করবে?
উদ্ধার করতে আবার কী ডাকাতি করবে? নয়তো কোনো দুপুরে সোজা বাড়িতে এসে কী বলবে, থলিটা ফেরত চাই।
যদি ধরা পড়ে? তাহলে নিশ্চয় পুলিশকে বলে দেবে কোন বাড়িতে থলিটা ফেলে দিয়েছিল। পুলিশ মারের চোটে ঠিকই ওর মুখ দিয়ে আদায় করে নেবে। তাহলে পুলিশ আসবেই। কবে?
কিন্তু ওতো নাও বলতে পারে!
বেলা উঠে বসল। নিজেকে প্রশ্ন করে চলেছে, খাপছাড়া এলোমেলো প্রশ্ন।
‘দেরি করে খেয়ো না…’
খিদে নেই। সকাল থেকেই তার পেটে কিছু পড়েনি। খাওয়ার কোনো ইচ্ছা তার হচ্ছে না। দেরাজে গুপ্তধন রয়েছে। কত টাকা থলিটায় তা সে এখনও জানে না। তবে মনে হয়েছে অনেক টাকা, হয়তো একটা লটারির প্রথম প্রাইজের টাকাই।
বেলা খাট থেকে নামল। বিমলের ঘরের থেকে এই ঘরটার ভেতর কতটা দেখা যায় তা সে জানে না। বিমল দুপুরে খেতে আসে। এখনও আসেনি। এলেই ওর গলা শোনা যাবে, বুলির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করবে। তাকে দেখতে পেলেও চেঁচিয়ে ‘এই যে দিদি’ বলে শুরু করে দেবে। আজ তো ওর কথা বলার অনেক ব্যাপার ঘটেছে।
‘বিকেলে কেরোসিন দেবে বিমলকে বলে রেখো…’
বেলা জানলাটা বন্ধ করে আলো জ্বেলে থলিটা বার করল।
নতুন একশো টাকার নোটের প্রত্যেক তাড়ায় রয়েছে একশো করে নোট। এটা সে নম্বর থেকেই পেয়ে গেল এবং অঙ্কে অভ্যস্ত মস্তিষ্ক মুহূর্তে জেনে গেল, পকেট ডায়েরির মতো সরু ওই এক-একটা তাড়ায় আছে দশ হাজার টাকা। আটটি তাড়া রয়েছে। আশি হাজার টাকা।
পঞ্চাশ টাকার পুরোনো নোটের বান্ডিল চারটি। একটা বান্ডিলের সুতো খুলে সে গুনতে শুরু করল। এতগুলো নোট একসঙ্গে কখনো সে গোনেনি। মাইনে পায় সে দশ টাকার নোটেই। ক্যাশিয়ারবাবুকে অনুরোধ করলে এবং যদি তার কাছে থাকে তাহলে অবশ্য কয়েকটা পাঁচ টাকার নোটও কখনো কখনো পায়। তিমির মাইনে নেয় একশো টাকার নোটে। ধুতিতে গিঁট দিয়ে বেঁধে, পেটে গুঁজে আনায় তাতে সুবিধে হয়। ওর কখনো পকেটমার হয়নি।
পঞ্চাশ টাকার বান্ডিলে সে পেল একশোটা নোট। পাঁচ হাজার টাকা। আরও তিনটি রয়েছে, তার মনে হল ওগুলোতেও একই সংখ্যক নোট আছে, না গুনলেও চলবে।
কুড়ি হাজার টাকা! মোট একলাখ! ঝিমঝিম করছে তার মাথার মধ্যে। ঘামের স্রোত নাকের পাশ দিয়ে ঠোঁটের কোলে পৌঁছেছে এবং দুটো হাতই কাঁপতে শুরু করেছে। এখনও সে মনস্থির করেনি টাকাগুলোর কী করবে। এখন লুকিয়ে রাখতে চাইছে তবে বরাবরের জন্য নিশ্চয় নয়। খোঁজখবর করার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
হঠাৎ তার মনে হল, এই থলিটা তিমির যেন না দেখতে পায়। এখুনি লুকিয়ে বা সরিয়ে ফেলা দরকার।
কোথায় লুকোবে? নোটগুলো বার করে থলিটা কোথাও ফেলে দিয়ে এলে… লোকে দেখে ফেলবেই। কোনো মেয়েছেলে একটা প্যাকেট রাস্তায় ছুড়ে ফেলছে, বা কোথাও ফেলে চলে যাচ্ছে, এটা কেউ-না-কেউ লক্ষ করবেই। দিনের বেলায় তো সম্ভবই নয়। রাতেও বাড়ি থেকে বেরোনো অসম্ভব। তিমির বাড়ি থাকবে।
