‘হ্যাঁ।’
‘যে ডাকাতটা এখান দিয়ে পালিয়েছে, তাকে দেখেছেন?’
‘না।’
সিঁটিয়ে গেল বেলা। হঠাৎ ‘না’ শব্দটা কী করে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল। নিশ্চয় সে ভয় পেয়েছে। দেরাজের চাবিটা এখনও তার হাতে।
‘তখন কোথায় ছিলেন, কী করছিলেন।’
স্বরটা হঠাৎ যেন তীক্ষ্ন হয়ে উঠল, মুখের দিকে তাকিয়েছিল নিশ্চয় কিছু সন্দেহ করেছে।
‘ছাদে ছিলাম, কাপড় মেলছিলাম।’
তারকা কাঁধে অফিসারটি এইবার কথা বলল : ‘ছাদ থেকে তো খালি দেখা যায়।’
প্রশ্ন নয়, একটা মন্তব্য।
‘অনেক লোকের চেঁচামেচি আর বোমার শব্দ পেয়েছিলাম, কিন্তু দূর থেকে। তাই গলির দিকে মুখ বাড়াইনি। হঠাৎ একেবারে বাড়ির কাছে বোমা ফাটতে, ভয় পেয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটে যাই।’
অফিসারটি অনুমোদনসূচক মাথা নাড়ল। পুলিশের কয়েকজন পাঁচিল ডিঙিয়ে বস্তিতে নেমে গেছে। কয়েকটা বাচ্চচাছেলে কাছে এসে বেলার সঙ্গে পুলিশের কথোপকথন শুনছে।
‘একটা বাড়ির ছাদ থেকে, ঠিক জানি না কোন বাড়ির বেশিরভাগই তিনতলা বাড়ি তাই আমাদের একতলার ছাদ থেকে দেখা যায় না…ছেলেটা দেখতে পেয়েই বোধহয় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে-‘পগারের দিকে চলে গেছে, বস্তি দিয়ে পালাচ্ছে, খাটালের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল’ এই সব বলছিল। আমি তখন পাঁচিলের কাছে গিয়ে বস্তির দিকে তাকাই। কাউকে দেখতে পাইনি।’
‘কাউকেই না?’
‘মানে ডাকাতকে নয়। বস্তির কতকগুলো বাচ্চচা আর তিন-চারজন মেয়েছেলেকে দেখেছি।’
মিথ্যে কথা, কিন্তু কেমন সে অবলীলায় বলে গেল। তবে ‘ডাকাতকে দেখিনি’ বলা ছাড়া আর সবই তো সত্যি। হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে। চাবির রিংটাকে মুঠোয় শক্ত করে সে চেপে ধরল।
থলিটার জন্যই কী সে মিথ্যা বলেছে? দেখেছি বললেই প্রশ্ন উঠত, ‘হাতে কিছু ছিল কিনা দেখেছেন?’
‘হ্যাঁ ছিল, একটা নীল রঙের ক্যাম্বিসের থলি।’
‘আর কিছু?’
‘মাত্র পাঁচ-দশ সেকেন্ড…অত লক্ষ করিনি।’
‘মুখ দেখতে পেয়েছেন?’
‘না, একটা খয়েরি রুমালে চোখের নীচের দিকটা ঢাকা ছিল। সাদা-কালো চেকের প্যান্ট, সাদা হাফ হাতা কলার দেওয়া গেঞ্জি, খালি পা…আর কিছু দেখিনি।’
কিন্তু এসব কথাবার্তার বদলে ডোরাকাটা বুশশার্ট পরা লোকটি তার কানের পাশ দিয়ে বাড়ির ভিতরটা লক্ষ করতে করতে বলল:
‘আপনি কী করেন?’
‘স্কুলে পড়াই, সকালে প্রাইমারি সেকশানে, এইমাত্র ফিরেছি।’
‘আর কে আছে বাড়িতে।’
‘ভাড়াটে, একজন বুড়ি আর একটা বাচ্চচা, এই নীচের ঘরেই…আমার স্বামী টাইম-কিপার। বেলঘরিয়ায় ফ্রিম্যান জৈন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কারখানায়।’
পুলিশরা চলে যাবার পর, বেলা ঘরে এসে পগারের জানলাটা বন্ধ করল। বিমলের ঘরের দিকের জানলা দিয়ে বুলিকে দেখা যাচ্ছে, রড ধরে দাঁড়িয়ে।
দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বেলা মেঝেয় বসল। এবার কিছু একটা ঘটুক। নয়তো সে বুঝতে পারছে না এখন তার করণীয় কী। তার বলা উচিত ছিল, ডাকাতটাকে সে দেখেছে, থলিটাও, পুলিশকে দিয়ে দেওয়াই উচিত। কী বলবে সে পুলিশকে?
‘কোথায় পেলেন? কী করে?’
‘আমাদের উঠোনে, পাঁচিলের গা-ঘেঁষে ভাঙা ইট, লোহা, কাঠকোঠ জমা আছে, সেখানেই পড়েছিল। আপনারা যখন এলেন, তখনও চোখে পড়েনি।’
‘কী করে চোখে পড়ল?’
‘কলঘরে স্নান করতে গেছি, তখন জানলা দিয়ে।’
‘সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কাছে এলেন না কেন?’
‘কীরকম যেন নার্ভাস বোধ করলাম তখন।’
বেলা দু-হাতে মাথা চেপে ধরল। এখন তার কী করা উচিত। চল্লিশ মিনিট আগেও জানত না এইরকম অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে সে পড়বে।
সত্যিই সে ভয় পেয়েছে। পুলিশের হাতে থলিটা দিয়ে দিলেই পারত। এখন আরও বিপদ আরও ঝঞ্ঝাট বাড়ল। তিমির শুনলে কী বলবে?
‘সেকি, দিয়ে দাওনি? থলির মধ্যে টাকা আছে, কী চোরাই মাল আছে, কী গাঁজা কোকেন আছে-জানো না আর রেখে দিয়েছ?’
‘বলাবলি করছিল ব্যাঙ্কে জমা দিতে এসেছিল, তাহলে তো টাকাই হবে।’
‘ওমনি লোভে পড়লে! তাই যদি হয়,…টাকা তো পরের, আমাদের নয়। এ টাকায় আমাদের কোনো অধিকারই নেই। রাখা অন্যায়, ডাকাতির মতোই ক্রিমিনাল কাজ।’
বেলা দু-হাতে আরও জোরে মাথাটা আঁকড়ে চুলের গোড়ায় টান দিল।
‘আমিও সৎ।’
ছোটো থেকে সে কোনো অন্যায় করেনি। যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে বাবা-মা-ভাইদের জন্য, আত্মীয় প্রতিবেশী সহকর্মীদের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে। বিয়ের পর অনিচ্ছা সত্ত্বেও চাকরি করে যাচ্ছে। বিশ্রী ক্লান্তিকর ওই স্কুলে পড়ানোর কাজ সে কার জন্য করছে? সে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে দিনের পর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে বেরোনো আর ফিরে এসে তিমিরের চাপিয়ে রেখে যাওয়া কুকারের সেদ্ধগুলো গিলতে।
কষ্টে সে অভ্যস্ত ছোটো থেকেই। বাবাও স্কুল মাস্টার ছিল। সামান্য আয়, সংসারে আটজন লোক, দাদাকেও দুটো টিউশনি করতে হত স্কুল-ফাইনাল করার আগেই। বেলাও টিউশনি করেছে, এখনও একটা করে।
কিন্তু সে কী এবার কিছু সুখ, কিছু আরাম পেতে পারে না কি? সে শৌখিন নয়, আজেবাজেভাবে টাকা নষ্ট করে না। ফ্রিজ, টিভি কেনার কথা কোনোদিনই ভাবেনি। দু-গাছা সোনার চুড়ি আর একটা হার না পরলেই নয়, এগুলোও নিজের টাকায় কিনেছে। তার আর তিমিরের মাইনে যোগ করে, সাদামাটা জীবনটা তারা কাটাচ্ছে।
একটা অপরাধীর গ্লানি নিয়ে এখন এই অবস্থায় পড়ল, এটা কী তার প্রাপ্য?
যদি পুলিশ সন্দেহবশে বাড়ি সার্চ করতে ঢুকত? দেরাজটা নিশ্চয় খোলাত। ডাকাতির মাল রাখার জন্য নিশ্চয়ই আরেস্ট করত। এ খবর পেয়ে তিমির কী করবে? গীতাদি, অর্চনা, অন্যান্য টিচাররা কী ভাববে? কিন্তু পুলিশ আবার তো খোঁজখবর করতে আসতে পারে।
