‘চারজন ছিল, চারজন…এ বেটা ছিটকে এদিকে এসে পড়েছে।’
‘কে বলল চারজন! তিনজন ছিল, আমি দেখেছি!’
‘একটাকে ধরেছে…আর দুটো গাড়িতেই ছিল…’
‘কালো অ্যাম্বাসাডার কী?’
‘কী হয়েছে রে নেনো?’
কোন বাড়ি থেকে নারীকণ্ঠের প্রশ্ন।
‘ব্যাঙ্কে টাকা জমা দিতে এসেছিল জেঠিমা। গাড়ি থেকে নেমে ব্যাঙ্কে ঢুকবে, তখন বম্ব চার্জ করে টাকার থলি নিয়ে পালাতে গিয়ে আর পারেনি। থলিটা নিয়ে এক ব্যাটা বস্তি দিয়ে পালিয়েছে। …একটাকে পাবলিক ধরেছে, এতক্ষণে বোধহয় শেষ হয়ে গেছে।’
‘ভালোই করেছে, তুই আর তাড়াটাড়া করতে যাসনি যেন।…বাব্বাঃ যা আওয়াজ হল গলিতে।…কত টাকা ছিল রে?’
পগার থেকে ভিড়টা সরে গেল। উত্তেজিত টুকরো কথাবার্তা এ বাড়ি ও বাড়ির জানলা থেকে শোনা যাচ্ছে। নতুন অভিজ্ঞতা বেলার কাছে। আকস্মিকতার ধাক্কাটা কেটে যাবার পর সে কৌতূহলী হয়ে উঠল। তার ইচ্ছা করছে ঘটনাটা সবিস্তারে জানতে, কারোর সঙ্গে কথা বলতে।
‘হ্যাঁগো বউমা, হয়েছে কী?’
নীচের থেকে পিসি চেঁচিয়ে জানতে চাইছে।
পাঁচিলের মুখ বাড়িয়ে বেলা বলল : ‘ডাকাত পড়েছে, ব্যাঙ্কে টাকা জমা দিতে এসেছিল তখন…’
বেলা কথা শেষ করল না। তার চোখ উঠোনে বিমলের ঘরের জানালার নীচে স্থির হয়ে আটকে রইল।
ডাকাতের হাতে সে ওইরকমই একটা নীলথলি দেখেছে। চোপসানো বেলুনের মতো কয়েকটা ভাঁজ। আকারে রেশনের থলির মতোই। মুখটা দেওয়ালের দিকে তাই দেখা যাচ্ছে না কীভাবে বাঁধা আছে।
‘তুমি আর ছাদে একা থেকো না, নেমে এসো।’
নিজের অজান্তেই বেলা পাশের এবং পিছনের দুটো বাড়ির দোতলা এবং তিন তলার দিকে তাকাল। কোনো ছাদে কেউ নেই। দুটি জানালা থেকে তাদের ছাদটা শুধু দেখা যায়, ছাদের পাঁচিলে আড়াল পড়া নীচের উঠোনটা নয়। জানলা দুটোয়ও কেউ নেই। বস্তির দিক থেকে দেখাদেখির প্রশ্নই ওঠে না।
কিন্তু থলিটা উঠোনে এল কী করে? ডাকাতটার হাতে কী এটাই ছিল? গলিতে বাঁক নিয়ে বোমাটা ছুড়ে তাদের বাড়ি পর্যন্ত ছুটে আসতে কতটুকু সময় লেগেছিল? পাঁচ সেকেন্ড…বড়োজোর দশ। ওইটুকু সময়ই ডাকাতটাকে সে দেখেছে। দু-পাশের তিনটে বাড়ি থেকে কেউই তখন গলির দিকে তাকিয়ে ছিল না। তারপর সে আর ডাকাতটাকে দেখেনি।
ছেলেটা ছাদ থেকে চিৎকার করছিল। হাতে থলি ছিল কিনা, ওকি লক্ষ করেছে? বেলার যতদূর মনে পড়ছে, ছেলেটা থলি সম্পর্কে কোনো কথা বলেনি। হয়তো থলিটা হাতে ছিল বলেই। কিংবা ও জানেই না ডাকাতের হাতে একটা নীলথলি ছিল।
পা টিপে দ্রুত সে নীচে নেমে এল, বুলির দুধ দিয়ে আসার পর মাঝের সবুজ দরজাটা সে আর বন্ধ করেনি। দরজাটার কবজা আলগা হয়ে যাওয়ায় বন্ধ করতে অসুবিধা হয়। তাই কিছুদিন হল আর ছিটকিনি দেওয়া হয় না।
বেলা দরজা ঠেলে একইভাবে চুপিসারে উঠোনে পৌঁছেই থলিটা তুলে নিল।
‘কে, কে ওখানে…বউমা নাকি?’
ঘরের মধ্য থেকে বুড়ি পিসি চেঁচিয়ে উঠেছে। ভালো দেখতে পায় না, নিশ্চয় জানলা দিয়ে, ছায়ার মতো কিছু একটা দ্রুত সরে যেতে দেখে চেঁচিয়েছে।
ঘরে এসেই, থলিটা সে কোথায় রাখবে ভেবে পেল না। তাকে? তোরঙ্গের পেছনে? খাটের নীচে?…কাঠের দেরাজের মাথায় কিংবা ভিতরে?
মাঝের দরজাটা খুলে রাখা ঠিক হবে না। আলগা কবজার জন্য একটা পাল্লা তুলে চৌকাঠে বসাতে হয়। তবু ছিটকিনিটা আগের মতো আর সহজে লাগানো যায় না। বেলা এক হাতে পাল্লা চেপে ধরে লাগাতে গিয়ে ছিটকিনির খোঁচায় ব্যথা পেল আঙুলে।
‘একদিন ছুতোর এনে বাড়ির সব কাঠের কাজগুলো করিয়ে নেব। যা পুরোনো বাড়ি…কোনো জানলা দরজাই ঠিকমতো লাগবে না।’
‘দেরাজের ভেতরের ড্রয়ারের লকটা গোলমাল করছে, ওটাও সারাতে হবে।’
বেলার কথায় তিমির ছোট্ট করে ভ্রূ কুঁচকোয়।
‘এতদিন বলনি কেন?…গয়নাগুলো আনসেফ রেখে দিয়েছ?’
‘কীইবা এমন গয়না আর কেইবা চুরি করবে। দেরাজে তো চাবি দেয়াই থাকে।’
বিয়ের সময় বাপের বাড়ি থেকে বেলা সোনার কোনো জিনিস পায়নি, দেবার ক্ষমতা ছিল না। তিমিরের মায়ের একটা দু-ভরি বালা আর একটা মফচেন ছাড়া আর কিছু তার নেই।
পগারের দিকে ভারী জুতোর শব্দ আর কথাবার্তার শব্দ এগিয়ে এসে বেলাদের খিড়কির দরজার কাছে থামল।
‘এই দিক দিয়ে ছুটে এসেছে, স্যার।’
‘দ্যাখো তো ওদিকটা।’
বেলা দক্ষিণে পগারের জানলায় এসে মাথা কাত করে দেখার চেষ্টা করল।
পুলিশ। সঙ্গে সঙ্গে সে ঘরের মাঝখানে ফিরে এসে নীলথলিটা তুলে এধার-ওধার তাকিয়ে দেরাজের চাবি খুঁজল।
আশ্চর্য! সে জানে, অথচ এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না কোথায় চাবির রিংটা, তিমির প্রতিদিন একই জায়গায় রেখে দিয়ে যায়, অথচ আলনার হুকে? দেরাজের মাথায়…আজ, মনে পড়েছে।
খাটের গদির কোণটা তুলেই বেলা পেয়ে গেল। দেরাজ খুলে থলিটা নীচের তাকে গুঁজে রেখে পাল্লাটা বন্ধ করছে, সে তখন পগারের দরজা ধাক্কানোর শব্দ পেল।
দরজাটা খুলে দেখল কালো ডোরাকাটা সাদা বুশশার্ট পরা মাঝবয়সি একটি লোক, তার পাশে পুলিশের খাকি পোশাকে, কাঁধে তারা লাগানো আর একজন এবং পিছনে আরও কিছু ইউনিফর্ম পরা বা সাদা পোশাকের পুলিশ। পাড়ারও কিছু লোক কৌতূহল মেটাচ্ছে তফাতে দাঁড়িয়ে।
‘আপনি এই বাড়িতে থাকেন?’
সাধারণ স্বর, যেন নম্বর ধরে বাড়ি খুঁজে ফিরছে, এমনই ভঙ্গি।
