তালা খুলে বাড়িতে ঢুকে বেলা দুধের বোতলটা দিয়ে এল পিসিকে। সত্তরের কাছাকাছি বয়স, চোখ এবং কান ভালো কাজ করে না, কুঁজো হয়ে পড়েছে। তবে খুটখুট করে রান্নাটি মোটামুটি করে দেয়। বিমল খোঁজখবর নিয়ে সাগরিকার এই পিসিকে সংগ্রহ করে এনেছে বুলির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য।
‘পিসি, দুধটা পাঠিয়েছিল বিমল, খাইয়ে দিন, গরম করাই আছে।’
কাত হয়ে বুলি ঘুমিয়ে রয়েছে। শীর্ণ শিশুটির দিকে তাকিয়ে বেলা মায়াবোধ করল। বেচারার ভাগ্যটাই খারাপ। এখনও অবোধ, এটাই ওকে রক্ষা করছে। একটু বড়ো হলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়াত কে জানে।
‘বউমা ঝিনুকটা খুঁজে পাচ্ছি না, দেখবে একটু।’
বেলা ঝিনুক খুঁজে পেল খাটের নীচে। তাতে বাসি দুধের দাগ রয়েছে, ধুয়ে দিল।
নিজের ঘরে এসে অভ্যাসমতো প্রথমেই সে টেবলে দুধের গ্লাসের নীচে রাখা চিরকুটটা তুলে নিল।
‘সীমার মা আজ আসেনি। ফিরে এসে বাসনগুলো মাজব।’
‘কাপড়গুলো কেচে রেখেছি। শুকোতে দিয়ো।’
‘বিকেলে কেরোসিন দেবে, বিমলকে বলে রেখো-দু লিটার।’
‘দেরি করে খেয়ো না।”
তাড়াতাড়িতে লেখা অপরিচ্ছন্ন অক্ষরে। প্রতিদিনের মতো প্রায় একই ধরনের কথা…সতর্ক, হিসেবি গৃহস্থ।
ঘরের পশ্চিমে জানলা দিয়ে বিমলের ঘরের জানলাটা দেখা যায়। এর মাঝে সাত-আট হাতের একফালি সিমেন্টের উঠোনটা ভাড়াটের অধিকার। পগারের দিকে এক মানুষ সমান পাঁচিল।
কাপড় বদলাবার জন্য বেলা অভ্যাসবশত পশ্চিমের জানলাটা বন্ধ করার সময় দেখতে পেল পিসি দুধ খাওয়াচ্ছে বুলিকে। তিমির দুধভরতি গ্লাস রেখে গেছে। ডাক্তারের নির্দেশ সকালে দুধ খাওয়ার। বেলা একচুমুকে দুধটা শেষ করল। পাখাটা ঘোরাতে সুইচ টিপে দেখল বিদ্যুৎ নেই।
ছাদে কাপড়গুলো তারে মেলে দিয়ে বেলা দক্ষিণের পাঁচিলে দাঁড়াল। নীচেই পগার। বস্তিতে দুই নারীকণ্ঠে তীব্র ঝগড়া চলছে। প্রায়ই হয়। এসব শোনায় সে অভ্যস্ত। ঝাঁ ঝাঁ রোদে ছাদগুলোয় কোনো লোক নেই। সব বাড়ির জানলাই খোলা।
বেলা সরে এল পশ্চিম দিকে। নীচে বিমলের জানলায় বুলি রড ধরে দাঁড়িয়ে। ন্যাংটো জিরজিরে ছেলেটা তাকে দেখতে পায়নি।
সাগরিকাও প্রথমে তাকে দেখতে পায়নি। একতলা থেকে যাতে কেউ দেখতে না পায় সেজন্য জানলার নীচের পাল্লাদুটোই শুধু বন্ধ করে রাখা ছিল। ছাদে কেউ থাকবে এবং পাঁচিলের ধারে দাঁড়াবে ওটা বোধহয় ওরা ভাবেনি। তাহলে উপরের পাল্লাদুটোও বন্ধ করত।
খাটে-শোয়া সাগরিকার দেহের আধখানা বেলা দেখতে পাচ্ছিল… সম্পূর্ণই অনাবৃত। প্রভাসের মুখ ওর ঘাড়ে গোঁজা, হাতের আঙুলগুলো খুবলে ধরেছে দুটো কাঁধ। হঠাৎ সে উন্মত্তের মতো সাগরিকার গালে কপালে গলায় কামড়াতে শুরু করল, নগ্ন পিঠটা কুঁকড়ে বেঁকে উঠল। শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া বাঘের মতো প্রভাস তার সারা শরীর দিয়ে সাগরিকাকে আঁকড়ে ধরে ঝাঁকাচ্ছে।
বেলা পাথরের মতো দাঁড়িয়েছিল। বুকের মধ্যে নিশ্বাস আটকে গেছে। পাঁচিল থেকে সরে যাবার ক্ষমতাটুকুও হাঁটুতে নেই। বোধহয় দশ-বারো সেকেন্ডের জন্য দৃশ্যটি তার চোখের সামনে ভেসে রয়েছিল। সাগরিকা হঠাৎ বন্ধ চোখদুটো মেলতেই, পাঁচিলের ধারে দাঁড়ানো বেলার সঙ্গে চোখাচোখি হল। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো বেলা তখন ছিটকে সরে আসে।
বুক থেকে বাতাস বেরিয়ে যাবার পর থরথরিয়ে কেঁপে উঠেছিল। সে জানে ওরা কী করছিল। অদ্ভুত এক ধরনের বিহ্বল ভয়কে সে সাগরিকার চোখে ফুটে উঠতে দেখেছে।
‘বুলি বুলি…টি টি…বুলি।’
বেলা হাত নাড়ল। বাচ্চচাটি উপর দিকে মুখ তুলে চোখ পিট পিট করে বোঝার চেষ্টা করছে কোথা থেকে আসছে কণ্ঠস্বর। এখনও ভালো করে মানুষ চেনে না।
‘টা টা বুউলি!’
বুলি হেসে ওঠার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কাছাকাছি কোথাও বোমা ফাটার শব্দ এবং একসঙ্গে কিছু লোকের চিৎকার হল।
সাধারণত এমন সময় মারামারি হয় না। সন্ধ্যার পর, বিশেষত রাতেই এই শব্দগুলো পাওয়া যায়। বেলা একটু অবাক হল।
কয়েক সেকেন্ড পর আরও দুটো শব্দ, আরও জোরে চিৎকার।
বেলা সদর দরজার দিকে পুবের পাঁচিলে এল কৌতূহল নিয়ে। চিৎকারের একটা রেশ ক্রমশ বিকট হয়ে শিব দত্ত লেনের মধ্যে ঢুকেছে।
সাদা গেঞ্জি গায়ে, খালি পা, মুখে খয়েরি রুমাল বাঁধা একটা লোক ঊর্ধ্বশ্বাসে গলিতে বাঁক নিয়েই থমকে পিছনে তাকিয়ে আলতো করে কি যেন ছুড়ল।
বেলা এই প্রথম বোমা ছোড়া দেখল। প্রচণ্ড শব্দ ও ধোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে আসা চিৎকারটা দু-তিন সেকেন্ডের জন্য থমকে গিয়ে আরও জোর হয়ে উঠল। দরজা-জানলা বন্ধের শব্দ হচ্ছে। গলির বাঁক ঘুরে কেউ এগোতে সাহস পাচ্ছে না।
বেলাদের বাড়ির গা-ঘেঁষে দুটো বাড়ির মধ্যের পথটায় লোকটা ঢুকে গেল। তখন সে ওর হাতে একটা নীল ক্যাম্বিসের থলি দেখতে পায়।
‘পগারের দিকে চলে গেছে…ওই যে পগারে, পগারে…ওদিক দিয়ে ঘুরে যান।’
একটা বাড়ির ছাদের উপর থেকে একটি কিশোর হাত নেড়ে উত্তেজিত স্বরে চিৎকার করে কাদের যেন জানাচ্ছে। বেলা মুখ তুলে ছেলেটিকেই দেখতে লাগল।
‘…বস্তি দিয়ে পালাচ্ছে বেরিয়ে যাচ্ছে খাটালের পাশ দিয়ে…।’
বেলা উত্তেজিত হয়ে ছুটে গেল দক্ষিণের পাঁচিলে। বিস্মিত বিভ্রান্ত বস্তির কয়েকজন মেয়ে আর শিশু ছাড়া আর কিছু সে দেখতে পেল না। পগারে ইতিমধ্যে জনাপনেরো লোক এসে পড়েছে। অনেকের হাতে লাঠি।
