‘তুমি দেখেছ?’
‘কী, মার্ডার? গোটাচারেক দেখেছি।’
‘ভাগ্যিস আমার তখন বিয়ে হয়নি।’
‘তিমির হেসেছিল। চোখ বন্ধ করে মৃদু মৃদু মাথা নেড়ে বলেছিল। ‘পাড়ার লোকের গায়ে কিন্তু কখনো একটা আঁচড়ও পড়েনি।’
বিমল তারপর এ বাড়িতে ভাড়া আসে, সাগরিকা আর সদ্যোজাত বুলবুলকে নিয়ে।
সীমার মা একদিন বিকেলে বাসনমাজার পর বেলাকে বলে, ‘তোমাদের ওপাশের ঘরটা তো খালিই পড়ে থাকে, ভাড়া দাওনা ক-টা টাকা তো পাবে।’
‘কী দরকার টাকায়, দুটো মানুষ নির্বিবাদে তো চলে যাচ্ছে ভাড়াটে মানেই ঝামেলা।’
‘ঝামেলার কী! মাঝের দরজাটা বন্ধ করে দিলেই তো আলাদা। আগে কী তোমাদের ভাড়াটে ছিল না? পগারের দরজা দিয়েই তো ভাড়াটে বাইরে যাতায়াত করবে, কল, পায়খানাও আলাদা, রান্না করবে কলঘরের পাশের চাতালটায়…তবে অসুবিধে হবে বর্ষায়, একটা চালা বরং করে নেবে। শুধু ছাদে যেতে হলেই তখন তোমাদের দিকে এসে সিঁড়িতে উঠতে হবে। বলো না দাদাবাবুকে।’
‘কে ভাড়া নেবে, তোমার চেনা কেউ?’
‘বিমল বলছিল ট্রাম লাইনের ধারে ফুটপাথে চায়ের দোকান করেছে, তুমি দ্যাখোনি বোধহয়, লাল একটা জামা পরা ছেলে…’
বেলার মনে হল, লাল জামা গায়ে একজনকে দেখেছে বটে স্কুল থেকে ফেরার সময়। রাস্তায় সে মানুষজনের দিকে বিশেষ তাকায় না।
‘বিয়ে করেছে। বউ এখন বাপের কাছেই আছে, ঘর খুঁজছে, বাচ্চচা হবে। আমাকে বলে রেখেছিল, মাসি একটু সন্ধান কোরো, বড্ড দরকার। বামুনের ছেলে হয়ে ছোটোজাতের মেয়েকে বিয়ে করেছে বলেতো নিজের বাড়ির সঙ্গে আর সম্পর্ক নেই।’
‘বউ কেমন?’
‘তা জানি না। এক-আধবারই যা দেখিছি দূর থেকে। খুব ফর্সা, গড়ন ভালো, মুখচোখ সুন্দর, মাথায় অনেক চুল-ভালোই দেখতে। আর সুন্দরী না হলে বিমল ঘর ছেড়ে বিয়েই বা করবে কেন বলো?’
‘কদ্দিন দোকানটা করেছে? বিমল আগে করত কী?’
‘কী আর করবে, খুচখাচ কীসব ব্যবসা করত, তবে ভদ্দর বনেদি ঘরের ছেলে, তোমাদের কোনো অসুবিধে হবে না। বরং সুবিধেই হবে। বিপদে আপদে ছোটাছুটি করার দরকার হলে, কী এটা ওটা যখন বাজারে পাবে না তখন জোগাড় করে দেওয়া…একাই তো বেশিরভাগ সময় থাকো বরং কথা বলার একটা লোক পাবে।’
নাইট ডিউটির পর কারখানা থেকে তিমির বাজার হয়ে বাড়ি ফেরে। বউ তখন স্কুলে থাকে। রান্না তিমিরই করে। বেলা রাঁধুনি রাখতে চেয়েছিল, তিমির রাজি নয়। লোকের হাতের রান্না তাদের বংশে নাকি কখনো কেউ খায়নি। তিমিরের মা রান্নাঘরেই জীবন কাটিয়ে গেছে।
‘সীমার মা-কে বলেছে, তাই ও বলছিল।’
‘গুন্ডা ক্লাসের ছেলে…ভদ্দরঘরের তাতে কী হয়েছে? লেখাপড়া শেখেনি কেন? য়্যা, ঘর ভালো হলেই কী ছেলেমেয়ে ভালো হবে?…কত ভাড়া দেবে? ঠিকমতো ভাড়া দিতে পারবে কী?’
তিমির রাজি হয় না। এর তিন দিন পরই বিমল ফুটপাথেই বেলার পা চেপে ধরে।
স্কুল থেকে ফিরছিল। সম্ভবত সীমার মা ওকে বলেছে,-একটা ঘরের সন্ধান আছে, নয়তো বিমল এমন নাটকীয় কাণ্ড করত না দোকান থেকে লাফিয়ে এসে।
‘দিদি, আমি তিনমাসের ভাড়া জমা রাখব…কোনো ঝুটঝামেলা হবে না।’
উবু হয়ে বিমল তখন বেলার পায়ের পাতা চেপে ধরে আছে।
-‘এ কী কচ্ছেন, ছাড়ুন ছাড়ুন।’
বেলা পিছিয়ে গেছল। আশপাশের দোকান থেকে লোকে তাকাচ্ছে, মুচকি হাসছে। পথচারীরা তাকিয়ে যাচ্ছে।
‘না দিদি, আগে আপনি কথা দিন। বউ নিয়ে আপনার ভাই কী রাস্তায় দাঁড়াবে? এই মাসেই ডেলিভারি…কোথায় যাব বউ বাচ্চচা নিয়ে, আপনিই বলে দিন?’
এমন বিব্রত বেলা আর কখনো হয়নি। বিমলের চায়ের দোকানের টুলে বসেছিল একটি যুবক এবং এতক্ষণ একদৃষ্টে সে বেলার মুখের দিকে তাকিয়েছিল।
‘দাদাকে বলবেন, দরকার হলে ছ-মাসের ভাড়া অ্যাডভান্স করব।’
যুবকটি উঠে এগিয়ে এসেছে, প্যান্ট বুশশার্ট দামি কাপড়ের। লম্বা দোহারা গড়ন, চুল ঘাড় পর্যন্ত। চোখদুটো বড়ো বড়ো ভাসানো। মোটামুটি সুশ্রী। কণ্ঠস্বর ভারিক্কি এবং কর্কশ। কথার ঢঙে বোঝা যায় হুকুম করার অভ্যাস আছে।
‘আমি তো এ ব্যাপারে কথা বলার কেউ নই, আপনারা বরং…।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমরা নয় দাদার সঙ্গেই কথা বলে নেব। আপনি একটু বলে রাখবেন।’
যুবকটি কর্কশ স্বরকে যথাসম্ভব মোলায়েম ও বিনীত করার চেষ্টা করে কথাগুলো বলল। বিমলকে চোখ দিয়ে ইশারায় এমন একটা ভাব দেখাল যেন, চিন্তার কিছু নেই, হয়ে যাবেখন।
হয়েও গেল। মাসে পঞ্চাশ টাকা ভাড়া। অগ্রিম দিল তিনশো টাকা।
‘একেবারে ফাঁকা বাড়ি, তুমি একা থাকো…দিনকাল সুবিধের নয়।’
তিমির যখন নাইট শিফটে তখন বেলার সঙ্গে দেখা হয় এই সময়, সে স্কুল থেকে ফিরলে। এই সপ্তাহে তিমিরের ডে-শিফট চলছে।
‘ওদিকটা তো পড়েই থাকে, মাসে মাসে পঞ্চাশটা টাকা…তবে মাঝের দরজাটা বন্ধ থাকবে। সদর ব্যবহার করতে পারবে না বলেই দিয়েছি।’
বেলা পরে জেনেছিল ওই যুবকটির নাম প্রভাস কুণ্ডু, বিমলের মুরুব্বি। নিমতলায় কাঠের ব্যবসা আছে আর একটা ট্রাকের মালিক। কাঁচা টাকা হাতে থাকে এবং খরচও করে। প্রভাসই অগ্রিম টাকাটা দিয়ে গেছে। তারই টাকায় বিমলের চায়ের দোকান হয়েছে।
সদর দরজায় তালা দিয়ে যায় তিমির। বেলার কাছেও একটা চাবি আছে। সকালে দু-জনের মধ্যে অল্পক্ষণই দেখা হয়। যখন ডে-শিফটে থাকে তিমির ভোরে বাজার যায় এবং বেলা স্কুলে বেরোবার মুখেই ফেরে। তিমির তার বিরলতম রসবোধের পরিচয় দিয়ে একবার বলেছিল, ‘স্টেশনে ক্রসিং হল।’ তারপর তাদের দেখা হয় সন্ধ্যায় যখন বেলা টিউশনি থেকে ফেরে।
