‘যা বলেছ, আমরা আর দেখে যেতে পারব না।’
‘কেন, পরের শতাব্দী পর্যন্ত কী বাঁচবেন না!’
ওরা সবসময়ই নৈরাশ্যকর ভাবভঙ্গি আর কথা বলে চারপাশে একটা গুমোট তৈরি করে রাখে। তিমিরও অনেকটা এই ধরনের। কখনো জোরে হাসে না, জোরে কথা বলে না। স্তিমিত একঘেঁয়ে কণ্ঠস্বর। হয় খুটখাট সাংসারিক কাজ করে নয়তো পায়ের উপর পা তুলে জানলায় ঠেস দিয়ে মেঝেয় বসে থাকে। কথা যা বলে, ট্রাম-বাস-অফিস থেকে কুড়িয়ে আনা মামুলি।
‘লোডশেডিং থেকে এ জন্মে আর রেহাই মিলবে না।’
‘তার মানে আরও কত বছর?’
‘দশ-পনেরো, বড়োজোর বিশ।’
এই ক-টা বছরের বেশি বাঁচার কথা তিমির ভাবতে পারে না। কুড়ি বছরই যদি হয় তাহলে তিমির প্রায় সত্তর আর সে নিজে চুয়ান্ন বছর পর্যন্ত বাঁচছে। মাত্র চুয়ান্ন, তার জন্য বরাদ্দ!
বাজার থেকে ফিরে তিমির একদিন বলল : ‘কী দাম হয়েছে জিনিসের। খেয়ে পরে বাঁচতে হলে এবার চুরিডাকাতি করতে হবে। চিনি সাত টাকা…ভাবতে পার! আসছে, দিন আসছে, পঞ্চাশ টাকার নোট নিয়ে তখন বাজারে যেতে হবে।’
বেলা রাস্তা পার হবার জন্য দাঁড়াল। ফুটপাথে ছোট্ট একটা শান-বাঁধানো নীচু রেলিং ঘেরা হাতচারেকের চত্বর। তার মাঝে একটা পাথর, মেঝেয় পোঁতা ত্রিশূল, কিছু ফুল ছড়ানো এবং কাঁসার থালায় কয়েকটি রেজগি। বেলা একটা দশ পয়সা থালায় ছুড়ে দিল।
এইখান থেকেই সে প্রতিবার রাস্তা পার হয়। তার ধারণা, এই জায়গাটা নিরাপদ। এইরকম কিছু কিছু যুক্তিহীন সংস্কার অনেক বিষয়েই তার আছে। ছাদের দক্ষিণ দিকের কোমরসমান পাঁচিলে সে ঝোঁকে না, তাহলে নিশ্চয়ই উলটে নীচে পড়বে…সিলিং ফ্যানের ঠিক তলায় শোয় না, পাখার হাঁড়িটা মাথায় খুলে পড়তে পারে। লজেন্স খায় না, গলায় আটকে যাবে। ভয়গুলো এসেছে এই ধরনের এক-একটা ঘটনা শোনার পর।
চিলড্রেনস পার্কটা পার হয়ে বি কে পাল অ্যাভিন্যুর দিকে ঘুরতেই বেলা দেখল রাস্তায় একটা কুকুর চেপটে রয়েছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ঘটেছে কোনো ভারী ট্রাক বা বাসের দ্বারা। গাড়িগুলো অবিরত পিষে পিষে যাওয়ায় মাংসগুলো ফ্যাকাসে ছিবড়ে হয়ে রাস্তার এখানে ওখানে ছড়িয়ে। কয়েকটা কাক ওড়াউড়ি করে খুঁটে খুঁটে মাংস তুলে নিচ্ছে।
এই দৃশ্যটা থেকে রেহাই পেতে সে হনহনিয়ে আহিরিটোলার দিকে এগোল। চিৎপুরের মোড়ে এসে ওষুধের দোকানটা দেখে তার মনে হল কয়েকটা ট্যাবলেট কিনে নেবে কিনা। অম্বলে কদিন ধরে বুকে জ্বালা ধরছে। তারপর মনে হল, লন্ড্রি থেকে শাড়ি নেবার তারিখ ছিল গতকাল, বিলটা আছে কিনা দেখার জন্য সে ব্যাগ খুলল।
‘দিদি, বাড়ি যাচ্ছেন?’
বেলাদেরই ভাড়াটে বিমল। এখানেই ফুটপাথে ওর চায়ের দোকান। হাতে হরলিকসের একটা বোতল, তার অর্ধেকটায় ভরা দুধ।
‘সকালের দুধটা কেটে গেছে, গরমেন্টের কারবার তো। বিস্কুট ছাড়া বুলিটার পেটে কিছু পড়েনি। দোকান ফেলে যেতেও পারছি না এখন…’
বিমল আবলুস কালো বেঁটে ভারী গড়নের মানুষ। বয়স সম্ভবত তিরিশ। টকটকে লাল পলিয়েস্টার স্পোর্টস শার্টটা পরে আছে। গায়ে এই জামাটাকে বেলা একদমই সহ্য করতে পারে না। শুধু চোখই নয়, তার প্রতিটি স্নায়ুও ঝিমঝিম করে ওঠে।
বোতলটা হাতে নিয়ে বেলা এগিয়ে যাচ্ছে, পিছন থেকে চে�চিয়ে বিমল বলল : ‘পিসিকে বলবেন গরম করাই আছে।’
মাসখানেক আগে সাগরিকা একবছরের ছেলে বুলবুল এবং বিমলকে ফেলে চলে গেছে। দিনসাতেক আগে বিমল বলেছিল : দিদি, আমার মনে হচ্ছে প্রভাসই ওকে ফুসলে বার করে নিয়েছে।’
বেলা কোনো কথা বলেনি। সে জানত, সাগরিকা কিছু একটা করবে। এটা সে জানত।
শিব দত্ত লেনটা একটা ‘দ্র’ অক্ষরের মতো, বি কে পাল অ্যাভিন্যু থেকে শুরু হয়ে বেলাদের একতলা বাড়ির দেয়ালে শেষ হয়েছে। সোয়া কাঠার উপর এই বাড়িটার বয়স কমপক্ষে আশি বছর। মালিকানা দু-হাত ঘুরে অবশেষে তিমিরের বাবার হাতে আসে। এই বাড়ি এবং পাশের বাড়ির মাঝে দু ফুট চওড়া একটি মাটির পথ আছে যেটা একদা খাটা পায়খানা থাকার সময় কাজে লাগত। পথটা যুক্ত করেছে বেলাদের বাড়ির দক্ষিণে তিন হাত চওড়া পগারের সঙ্গে শিব দত্ত লেনকে।
পাঁচ-ছটি বাড়ির খিড়কি দরজা এই পগারে। একদা জঞ্জাল ফেলার জন্য ছাড়া পগারটির আর কোনো ভূমিকা ছিল না। এখন এটি ওই পাঁচ-ছটি বাড়ির পিছনের অংশের বাসিন্দাদের রীতিমতো সদরপথ। পগারের দক্ষিণে নীচু পাঁচিলের ওধারে খোলার চালের প্রায় ষোলো ঘর পরিবার বাস করে। বেলা তার শোবার ঘরের দক্ষিণের জানলা দিয়ে বস্তির এক-চতুর্থাংশ দেখতে পায়।
বছরে দু-তিনবার চোর পড়ে এই পাড়ায়। বেলাদের বাড়ির গা-ঘেঁষে পাঁচিলের সরু পথটা দিয়েই নাকি বস্তির দিক থেকে চোর আসে। বস্তির অনেক জায়গায়ই ভাঙা, বাচ্চচা ছেলেরাও সেখান থেকে ডিঙিয়ে আসে। প্রতি বাড়ির পগারের দিকের জানলায় লোহার জাল লাগানো। লগা দিয়ে ঘরের মধ্য থেকে জিনিস টেনে নেওয়া এতে বন্ধ হয়েছে।
‘বাবার বিয়ের শালটা খাটের গায়ে ছিল শুধু এক রাত্রির জন্য নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরেছে, মা বলল, ‘একটা রাত্তির তো থাক কাল সকালে আলমারিতে তুলবোখন, ব্যস, সকালে আর দেখা গেল না।
আর একবার তিমির বলেছিল:
‘বস্তির পাঁচিল সব কী আর আপনা থেকে ভেঙেছে, ভেঙে ফেলা হয়েছে যাতে পুলিশ তাড়া করলেই চট করে বস্তি দিয়ে পালাতে পারে। নকশাল পিরিয়ডে কী কাণ্ড যে এই গলিতে হয়েছে তা তো জান না। রোজ বোমা, ছুরি, পাইপগান আর একটা দুটো মার্ডার।’
