লোকটা ঘাম মুছল কপালের। একটানা মুখস্থ বলেছে। বেলা ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে না। চোখাচোখি হলে, টানা সুরে এভাবে বলে যেতে অসুবিধে হবে। ওর স্বরে যে আবেদনটা রয়েছে সেটা তার ভালো লাগছে।
‘…তিরিশ লাখ টাকা!’
‘কী বললেন?’
‘রাজস্থানে ফার্স্ট প্রাইজ তিরিশ লাখ টাকা, সেকেন্ড তিন লাখ। খেলার আর আটাশ দিন বাকি।’
‘তি-রি-শ লাখ।’
বিশ্বাস করতে পারছে না বেলা। সন্দেহই ফুটে উঠল তার কথায় এত টাকা কী করে দেওয়া সম্ভব। মিথ্যে, লোক ঠকানো ব্যাপার নয়তো! কত কোটি লোক তাহলে টিকিট কেনে!
‘বিশ্বাস সত্যিই করা যায় না, কিন্তু টিকিটে তো লেখাই রয়েছে, গুনে দেখুন…কটা শূন্য তিনের পর, এক দুই…ছটা শূন্য আছে কিনা দেখে নিন।’
এগিয়ে ধরা টিকিটে শূন্যগুলো একটার সঙ্গে আর একটা জড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি শূন্যের পিছনে কত টাকার প্রতিশ্রুতি? কেউ পেয়েছে কি একসঙ্গে এতটাকা? নিশ্চয় পেয়েছে। পেয়ে কী করেছে?
‘বলা যায় না, তিরিশ লাখ হয়তো এই টিকিটটা থেকেই উঠতে পারে। দিদি আপনার ঠিকুজি আছে কী, থাকলে একবার জ্যোতিষীকে দেখিয়ে নিন। আমার দেওয়া টিকিটে একজন পশ্চিমবঙ্গের, আর একজন হরিয়ানার সেকেন্ড প্রাইজ জিতেছে।’
‘অনেক তো কিনলাম, হল কী?’
‘এক একজন পাঁচ বছর, সাত বছর কিনে যাচ্ছে। পরপর নম্বরে পঁচিশটা, তিরিশটাও অনেকে কেনে। কেন কিনছে?’
লোকটার মতো চোখের উপরের চামড়া কী তারও এইরকম কোঁচকায়, স্বরও কী বুজে আসে যখন সে ক্লাসে বোঝায়!
‘খরগোশটা যদি একলাফে পঞ্চাশ কিলোমিটার অতিক্রম করে তাহলে পঞ্চাশ মিটার যেতে…পাঁচশো লাফ কী করে হয়? কত মিলিমিটারে এক মিটার? চুপ করে আছ কেন?’
‘বলুন কেন তাহলে কিনছে? পাবার আশা আছে বলেই তো?…বরাত, বুঝলেন দিদি বরাত, থাকলে পাবেনই। কতদিকে কতভাবেই টাকা নষ্ট হচ্ছে, মাত্র এক টাকা দু টাকার তো ব্যাপার!…হ্যাঁ, বলুন দাদা?’
‘একটা পশ্চিমবঙ্গ দিন।’
বেলা সরে দাঁড়াল। হাতে রেশন থলি, রুগণ কালো লোকটার পাঞ্জাবি শরীরে লেপটে রয়েছে ঘামে। ভঙ্গিতে ব্যস্ততা। টিকিট নিয়েই চলে যাচ্ছিল।
‘একটা রাজস্থান এবার…’
‘না।’
লোকটা মুখ না ফিরিয়েই বলে গেল।
স্ট্রিক্ট প্রিন্সিপালের লোক। ছ মাস ধরে রেগুলার শুধু একটাই কিনে যাচ্ছেন।’
‘একটা রাজস্থান তাহলে দিন।’
‘দুটো সিরিজে দুটো নিন, ডবোল চান্স থাকবে।’
‘না।’
বেলা সদ্য টিকিট ক্রেতাটির স্বরই প্রায় গলায় এনে ফেলল। স্ট্রিক্ট প্রিন্সিপালের লোক হবার চেষ্টায় কী? কড়া হওয়া তার ধাতে নেই, চেষ্টা করে দেখেছে।
যদি পেয়ে যায়। তিনের পর শূন্যগুলোর দিকে তাকিয়ে বেলা অদ্ভুত এক উৎকণ্ঠা আর তাজা আরামবোধ করল। এই নিয়ে কতবার যে এই আরামটা সে পেল। টিকিটটা ব্যাগে রেখে লোকটির মুখের দিকে না তাকিয়েই সে হাঁটতে শুরু করল।
তিরিশ লাখ টাকা হয়তো পেয়ে যেতে পারে…পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, এমন একটা চিন্তায় অন্তত সাতদিন সে আচ্ছন্ন থাকবে। এক ধরনের ভয়-ভয়ও করবে। এই মুহূর্ত থেকেই সেটা শুরু হয়ে গেছে।
যদি টিকিটটা হারিয়ে যায়, চুরি যায়…কিংবা ব্যাগটা যদি ছিনতাই হয়? বেলা বাসস্টপে দাঁড়িয়ে ব্যাগের মুখটা অল্প ফাঁক করে টিকিটের নম্বরটা পড়ার চেষ্টা করল। শুধু ‘জেড’ আর দুটো সংখ্যা ছাড়া আর পড়তে পারল না। বাড়িতে পৌঁছেই নম্বরটা ডায়েরিতে লিখে রাখতে হবে।
বাসস্টপে ভিড়। এখান থেকে বত্রিশ রুটের বাস তার পাড়া দিয়ে যাবে। আরও তিন-চারটে রুটের বাসে সে যেতে পারে বটে তবে মিনিটপাঁচেক হাঁটতে হবে। আর এখান থেকে হাঁটলে কুড়ি মিনিট। এই চিড়বিড়ে রোদে ছাতা মাথায় প্রায়ই তাকে হেঁটে ফিরতে হয়। এটা অভ্যাস হয়ে গেছে। তবু সে বাসস্টপে আসে, যদি বরাত জোরে…’বরাত’ শব্দটা লটারিওলাও ব্যবহার করেছে। দাঁড়িয়ে যাবার মতো জায়গা যদি বাসে পাওয়া যায়।
বত্রিশ নম্বর বাসটা দেখে বেলা মনে মনে কাতরে উঠল। অসম্ভব।
একটা স্কুলের মেয়ে, বুকের কাছে বই ধরে বাসটা থেকে নামতে চাইছে। সামনের লোককে ধাক্কা দিচ্ছে মুখবিকৃতি করে। দুটো লোক একসঙ্গে ঠেলে উঠতে চাইছে। মেয়েটি নামার আগেই বাসটা ছেড়ে দিল। হইচই উঠল প্রতিবাদের। মেয়েটি হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেছে। রাস্তায় বইগুলো ছড়িয়ে। বাসটা থমকে রয়েছে।
‘বেঁচে গেল…পেছনের চাকায় যেত।’
বেলার পাশে দাঁড়ানো লোকটি শান্তস্বরে বলল।
মেয়েটি উঠে পড়েছে। একজন বইগুলো কুড়িয়ে দিল। কিছু লোক আবার বাসে ওঠার চেষ্টা শুরু করেছে। কনুই আর হাঁটু থেকে রক্ত পড়ছে। সাদা ফ্রকটায় ধুলো লেগে। মেয়েটার মুখে ভয় এবং লজ্জা। বাসটা রওনা হয়ে গেছে।
‘টিটেনাস ইঞ্জেকশান নেওয়া উচিত!’
বেলা কর্ণপাত করল না কথাটায়। সে বুঝতে পারছে লোকটি তার গলা-বুক দেখছে। এই প্যাচপ্যাচে ঘাম আর রোদে ব্যাপারটা বিরক্তিকর বিশেষত সামনেই যখন মিনিট কুড়ি হাঁটার একটা কাজ রয়েছে!
সে হাঁটতে শুরু করল। ভূগর্ভ রেলের জন্য খোঁড়া হবে তাই টিন দিয়ে ঘিরে ফুটপাথ কমিয়ে রাস্তার একদিকটা চওড়া করার কাজ চলছে। বেলাকে সন্তর্পণে হাঁটতে হচ্ছে টুকরো ইট, ঢিপি, গর্ত সামলে। কতদিন লাগবে রেল চালু হতে? টিচার্সরুমে একদিন কথা উঠেছিল।
‘পরের শতাব্দীতে মনে হয় চলবে।’
‘আমাদের নাতিনাতনিরাই চড়বে।’
