‘এসব নিয়ে আলোচনার দরকার কী।’
গীতা ঘাম মুছল। অস্বস্তি জানাল, ‘উফফ’ বলে। অর্চনা ঘড়ি দেখল। গীতা ছাতাটা ছড়িয়ে দেবার জন্য ঝাঁকাল। ওদের দিকে পরিচিতের মতো হেসে এক মহিলা চলে গেল। হয়তো কোনো ছাত্রীর মা।
‘বড্ড গরম, কাল যেন কত হয়েছিল?’
‘একশো এক পয়েন্ট চার।’
‘আজ ছয়-সাত হবে। যাই, বড্ড তেষ্টা পাচ্ছে। বাড়ি গিয়েই তো আর ফ্রিজের জল পাব না।’
গীতা প্রায়ই কথাটা বলে। অনেকটা যেন আপনমনে। অর্চনা হাসবার চেষ্টা করল। স্কুলের টিচারদের মধ্যে শুধু তারই ফ্রিজ আছে। কিছুদিন ধরেই সে টিভি কিনবে বলছে।
ব্রেক কষার কর্কশ শব্দ হল। সবার মতো ওরাও তাকাল। একটা প্রাইভেট বাসের সামনে থতোমতো এক প্রৌঢ়। ছুটে অশ্বারোহী নেতাজি মূর্তির দ্বীপটায় উঠে পড়ল লোকটি এবং ব্যস্ত হয়ে অপর দিকে চলে গেল, একবারও ফিরে তাকাল না। এরা তিনজন মুচকি হাসল। এরকম দৃশ্য প্রায়ই দেখতে হয়।
গীতা চলে যাবার পর অর্চনাও ইতস্তত করল।
‘বীরেনবাবু ঠিক দেখেছেন?’
‘তবে কি বানিয়ে বানিয়ে বলল?’
‘উনিও ওখানে যান?’
‘ন্যাকামো করিসনি। বলেছি তো কোম্পানির কাজে বড়ো বড়ো পার্টির লোকেদের এন্টারটেন করাতে মাঝেসাঝে নিয়ে যেতে হয়। গীতাদির মতো তুইও একই কথা বার বার বলিস।’
‘বারবার আর কবে বললাম, ব্যাপারটা সিরিয়াস তাই…দেবিকা সত্যিই খাচ্ছিল?’
‘দূর থেকে কী বোঝা যায়, সফট ড্রিঙ্কও হতে পারে, তুই কিন্তু এই নিয়ে আর কাউকে কিছু বলিসনি। গীতাদিকে বলাটাই ভুল হয়ে গেছে, যা লোক। কারোর ভালো একদম দেখতে পারে না।’
‘কার ভালো, দেবিকার?’
‘আহা, দেবিকার কেন, ওকি ভালো কাজ করছে! ফ্রিজ নিয়ে গীতাদির এই যে ঠেস দেওয়া কথা…কেনরে বাবা, আমার যদি ফ্রিজ কেনার ক্ষমতা থাকে তাহলে কিনব না কেন? ভোগ করব না কেন?’
‘সিগারেট খাচ্ছিল?’
‘ও খায়নি।’
‘নাচ?’
‘ওই কাঁধ আর কোমর ধরে, সিনেমায় হোটেলের সীনে যেমন দেখি, একটু খালি জায়গায় একগাদা মেয়ে-পুরুষ, নাচ বলতে ওই পাছা দুলিয়ে দুলিয়ে…।’
‘ক-জনের সঙ্গে?’
‘তা অত জিজ্ঞাসা করিনি।’
‘একদিন গেলে হয়।’
‘কোথায়?’
অর্চনা হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে। বেলার মজাই লাগল।
‘তুই আর আমি চুপিচুপি একদিন…শুধু কী রাতেই হয়? বীরেনবাবুকে জিগ্যেস করে দেখিস তো দুপুরের দিকে নাচটাচ হয় কিনা আর খরচ কত পড়বে।’
‘ঠাট্টা করছিস।’
‘সত্যিই। বীরেনবাবুর সঙ্গেই নয় যাব। বলে দেখিস না একবার!’
অর্চনা ঘড়ি দেখল। এসব বাজে কথা শোনার দরকার নেই এমন মুখভঙ্গি করে বলল:
‘তাহলে দেবিকার সঙ্গে কথা বললেই তো পারিস!’
বাসস্টপের দিকে অর্চনা এগোচ্ছে। বেলা তাকিয়ে থাকতে থাকতে কলকাতার অন্যতম এই ব্যস্ত অঞ্চলের ধ্বনি, রং, দুর্গন্ধ নোংরা রাস্তা মালিন্য এবং চলমানতা সম্পর্কে সচেতন হল।
তরমুজের স্তূপের দিকে তাকিয়ে বেলার মনে হল, বহু বছর সে বোধহয় তরমুজ খায়নি। বাজার করে তিমির, বললেই নিশ্চয় আসবে। আসলে সে কখনো বলেনি। না বলার কারণ হয়তো, তিমিরের শরীর ভারী জিনিস বয়ে আনার মতো নয়। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। রুগণ, হাঁপানি আছে। ওর কষ্ট হবে। কিংবা শখ ব্যাপারটাই তার নিজের মধ্যে নেই। তরমুজ খাওয়া তো এক ধরনের শৌখিনতাই।
দেবিকাও কি শখ করে পার্ক স্ট্রিটের বারে গেছল? হতেও পারে। নানান মানুষের নানারকম শখ থাকতে পারে। বেলা সতর্ক চোখে দু-ধারে তাকাল রাস্তা পার হবার জন্য। একটা বাসের দরজায় উন্মত্ত ঠেলাঠেলির মধ্যে অর্চনা সেঁধোবার চেষ্টা করছে।
পরপর দুটো রাস্তা, প্রফুল্লচন্দ্র রোড ও বিধান সরণি পার হয়ে ভূপেন বসু অ্যাভিন্যুর ফুটপাথে বেলা উঠল। হাঁটা কঠিন। সরু ফুটপাথ তাকে আরও সরু করে দিয়েছে মাটিতে বসা পসারিরা।
‘দিদি, চলে যাচ্ছেন যে, নেবেন না? আজই জনতা লটারির খেলা।’
না দেখার ভান করে বেলার চলে যাওয়া আর হল না।
কোমর-উঁচু কাঠের কাউন্টার। তার উপর ভারতের যাবতীয় লটারির টিকিট সাজানো। ফুটপাথের রেলিংয়ে ছোটো একটা বোর্ড ঝুলছে লটারির নাম ও খেলার তারিখ জানিয়ে। কাউন্টারের একধারে বড়ো লাল অক্ষরে লেখা ‘পরশমণি’। লোকটার মাথার উপর দেওয়ালে একটা পোস্টার : ‘আপনি লাখপতি কিন্তু আপনি তা জানেন না।’
‘না, এবার থাক।’ টিকিটগুলোর উপর চোখ রেখে বেলা বলল। বহু টাকার টিকিট সে কিনেছে। তাড়া করে বাঁধা আছে এখনও।
‘না, না, ফেলতে হবে না।’
‘কী হবে! খেলা তো কবে হয়ে গেছে!’
‘হয়তো তুমি জান না তোমার নম্বরটাই উঠেছিল। কিন্তু তুমি লক্ষ করোনি। কিংবা হয়তো রেজাল্ট ভুল ছাপা হয়েছে-পরে ধরা পড়ে যদি ঠিক নম্বরকে প্রাইজ দিতে যায়…বলা যায় না হয়তো সেটা তোমারই নম্বর, ওগুলো রেখে দিতে ক্ষতি কী।’
তিমিরই তুলে রেখেছে। খুঁটে অনেক কিছুই ও রেখে দিয়েছে…দেরাজের হাতল, ইলেকট্রিকের ভাঙা সুইচ, ছেঁড়া চটি, ভাঙা কাঁচি, শাড়ির পাড়, পুরোনো ব্লেড ও প্রচুর স্মৃতি সতর্কতা এবং উদবেগ।
‘কিছুই নেবেন না?…মধ্যপ্রদেশ নিন না, ডেইলি খেলা, প্রথম পুরস্কার পাঁচ হাজার। নাগাল্যান্ড প্রথম প্রাইজ লাখ টাকা, মিনি খেলায় দশ হাজার…ত্রিপুরার তিনটে ফার্স্ট প্রাইজ লাখ টাকার, রয়্যাল ভুটানের সাপ্তাহিক খেলা এক লাখ কুড়ি হাজার, তিনটে সেকেন্ড দশ হাজার করে, আয়কর মুক্ত।’
