‘কী বলল?’
গীতা এবং বেলা দু-জনেই ঘেঁষে এল অর্চনার কাছে।
‘গীতাদি বলব কী তোমায়, যা যা বলল সব মিলে যাচ্ছিল। বাঁ হাতের মাঝের আঙুলে নীলপাথর বসানো রুপোর আংটি, বাঁ কানের নীচে তিল, চ্যাপটা নেপালি-নেপালি মুখ, ঘাড় পর্যন্ত চুল, ফর্সা ছিপছিপে, আমাদের থেকেও আধ ফুট লম্বা। বিশ্বাস করবে না, যে শাড়ির কথা বলল, ঠিক সেই রকমই মুর্শিদাবাদি সিল্ক পরে ও ক-দিন আগেই স্কুলে এসেছিল।’
‘কালোর ওপর ছাই-ছাই আর সাদা নকশা?’
‘হ্যাঁ ওটাই। তবে ব্যাগটা মেলেনি…বলল লালব্যাগ হাতে ছিল, হয়তো দু-তিনটে আছে।’
দেবিকা দু-মাস স্কুলে এসেছে। সব টিচারের থেকে বয়স কম সাতাশ-আটাশ, বাসকেটবল খেলেছে বাংলার হয়ে, বিয়ে হয়নি। সকলের মতো বেলারও প্রথমেই চোখে পড়ে ওর উচ্চচতা।
‘খুব লম্বা তো তুমি, বাঙালিদের মধ্যে বড়ো একটা চোখে পড়ে না।”
বেলা এইভাবেই প্রথম আলাপ করেছিল।
‘আপনি হলেন সাতশো ছাপ্পান্নতম যিনি আমাকে এই কথাটা বললেন।’
দেবিকা তারপর হেসে উঠেছিল। চমৎকার সাজানো দাঁত।
‘উঁচু তাক কী আলমারির মাথা থেকে কিছু পাড়তে হলে ডাকবেন…মুশকিল কি জানেন, নিজেকে কোথাও লুকোতে পারি না। ‘ওই যে ঢ্যাঙা মেয়েটা’ ব্যস সবাই বুঝে যায় কে মেয়েটা। আচ্ছা, খুব কী লম্বা? দাঁড়ান তো পাশে…কই, কতটা আর।’
বেলার মাথাটা হাত দিয়ে নিজের কাঁধের কাছে চেপে ধরে দেবিকা তাকিয়ে থাকা গীতাকে বলেছি: ‘বলুন তো কতটা?’
‘আমাদের সবার মধ্যে বেলাই লম্বা, তুমি তার থেকেও এক মাথা, কী আর একটু বেশিই হবে।’
‘বেলাদি, আপনার হাইট কত?’
বিব্রত হয়েছিল বেলা। নিজের উচ্চচতা সে জানে না, কখনো মাপায়নি। তিমিরের বুকের কাছে তার মাথা পড়ে। বিয়ের দিন-দশেক পর, ছাদের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে চুমু খেয়ে তিমির বলেছিল : ‘আর একটু লম্বা হলে ভালো হয়। হাইট কত?’
বেলা অস্বস্তি বোধ করেছিল। দাঁড়িয়ে চুমু খাওয়ার মতো কোনোরকম অবস্থা যাতে তৈরি না হয় সেদিকে সজাগ থাকত। তবে বছরখানেক পরই তিমির নিস্পৃহ হয়ে গেছল। গত তিন-চার বছরে সে কদাচিৎ চুমু খেয়েছে।
‘ইনি তো দেবিকাকে দেখেননি, তাহলে এত মিলন কী করে? নামটাও বলেছিল।’
বেলার চোখ পড়ল ট্রাম রাস্তার ওপরে আনাজের বাজারে নানান মাপের ফুটবলের মতো তরমুজের স্তূপ। এক বুড়ি উবু হয়ে বাছাবাছি করছে।
‘যদি সত্যি হয় তাহলে এমন মেয়েকে টিচার রাখা উচিত নয়। এতে স্কুলের বদনাম হয়।’
‘উনিও তাই বলছেন, ধরো যদি কোনো গার্জেন চিঠি দেয়! বাচ্চচারা যদি শোনে তাদের টিচার পার্ক স্ট্রিটের রেস্টুরেন্টে গিয়ে…’
‘রেস্টুরেন্ট বলে না বার বলে? বইয়ে তো বার-ই পড়ি।’
‘ওই হল, পাঁচ-ছজন পুরুষমানুষ নিয়ে মাঝরাত পর্যন্ত বসে মদ খাচ্ছে; এটা যদি বাচ্চচারা শোনে ওদের মনের ওপর কী এর প্রভাব পড়বে না?’
অর্চনার রক্তশূন্য পাণ্ডুর মুখ ক্রমশ লালচে হয়ে উঠছে। গরমে কিংবা উত্তেজনায়। কথা বলছে দ্রুত চড়া স্বরে। চোখের মণি বড়ো হয়ে চশমার কাঁচ জুড়ে ফেলেছে।
গভীর চিন্তার মধ্য থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার মতো শ্লথ-কণ্ঠে গীতা বলল: ‘না না, ওরা অতটা হয়তো বুঝবে না, কিন্তু বদনাম হবে আমাদেরই। লোকে ভাববে আমরাও হয়তো…’
গীতা চ্যাটার্জির চোখ ছিল বেলার উপর। সে দেখল বেলার ঠোঁট ফাঁক হয়ে একটা পাতলা হাসি বেরিয়ে আসছে।
‘অবশ্য বদনাম পাবার মতো বয়স কী চেহারা আর আমার নেই, সে বরং তোমাদেরই আছে।’
অর্চনার লম্বাটে তোবড়ানো গাল আবার পাণ্ডুর হল।
‘আর ঠাট্টা কোর না আমাকে নিয়ে। বরং বেলারই ছেলেপুলে নেই, বাঁধনছাঁদন ঠিক রেখেছে।’
দু-জনে তার দিকে তাকিয়ে। বেলার মনে হল অনেকক্ষণ সে কথা বলেনি, এবার কিছু একটা বলা দরকার যাতে এরা খুশি হয়।
‘আমার বাঁধনছাঁদনটা কোথায় দেখলে! তোমাদের কারোর মতোই তো আমার রং নয়, চোখ মুখ নাকও নয়। গায়ে মাংসও এমন কিছু নেই, তাহলে?’
গীতা মুখটিপে হাসল। অর্চনা মুখে একটা শব্দ করল বেলার বুক পেটের উপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে।
কী আছে তার শরীরে বা এদের ঈর্ষার কারণ? সাধারণ, অতিসাধারণ তাকে দেখতে এটা বেলা জানে। তার বয়স এখন তেত্রিশ, অগাস্টে চৌত্রিশে পড়বে। অর্চনা তার থেকে ছ-মাসের ছোটো। এখনও তার বুক শক্ত, তলপেটে চর্বি জমেনি, চামড়া মসৃণ, কুঞ্চন বা দাগ নেই, কাঁধ কি বাহু ডৌল হারায়নি, হালকা গোল চওড়া পাছা বেমানান নয় কোমরের সঙ্গে।
শরীর নিয়ে সে খুব ভাবে না। আলাদা যত্ন নেয় না। তার শরীর এইভাবেই বেড়ে উঠেছে শৈশব থেকে বাল্য, কৈশোর, যৌবন…এখনও তার যৌবন চলছে। কিন্তু কীভাবে? বাইরে বেরোলে পুরুষরা তাকে কী লক্ষ করে? যদিইবা করে তাতে কী?
‘তবে দেবিকার থেকে আমার কিন্তু বেলার গড়নই ভালো লাগে। দেবিকা কীরকম যেন কেঠো কেঠো, পুরুষালি ধরনটাই বেশি, তাই না গীতাদি?’
দেবিকার শরীরে এক মিলিগ্রামও বাড়তি মেদ নেই তাই ওকে উচ্চচতার থেকে লম্বা দেখায়। মুখশ্রী ভালো নয়, হাঁ-মুখ বড়ো, ঠোঁট পুরু, গোঁফের ক্ষীণ আভাস দেখা যায়, কাঁধটা পুরুষের মতো চওড়া। বেলা নিজেই একবার অর্চনাকে বলেছিল, ‘প্যান্ট শার্ট পরলে ওকে ছেলে মনে হবে।’
অথচ ভালো লাগে। একটা স্ফূর্তি উদ্ধত ভঙ্গিতে দেবিকার কাঠামোর মধ্যে নড়াচড়া করে। সবসময়ই তাজা খটখটে। বেলা এটাই পছন্দ করে। কোনোরকম বিষণ্ণতা ছড়ায় না ওর শরীর! সবল আস্থা।
