ওরা কথা বলতে বলতে স্কুল থেকে বেরোয়। কিছু কথা ওদের থাকেই যেটা টিচার্স রুমে অন্যদের সামনে আলোচনা করতে চায় না। এই মোড়ে দাঁড়িয়ে, ট্রামে-বাসে ওঠার বা হেঁটে রওনা হওয়ার আগে সেই কথাগুলো ওরা বলে এবং শোনে। অবশেষে প্রায়শই বিষয়টি অসম্পূর্ণ রেখে, কিছু প্রশ্ন, বিস্ময় বা সিদ্ধান্ত সঙ্গে নিয়ে ওরা তিন দিকে চলে যায়। গীতা উলটোডাঙায়, অর্চনা পাইকপাড়ায় এবং বেলা আহিরিটোলায়।
একসময় ওদের প্রিয় বিষয় ছিল হেডমিস্ট্রেস অরুণা পোদ্দার। স্বল্পবাক, কটুজিহ্বা, মধ্যবয়সি এই মহিলা বেলেঘাটায় সি আই টি ফ্ল্যাটে একা কেন থাকেন এবং তিনি স্বামী-পরিত্যক্তা। কুমারী, তাই নিয়ে ওরা বাদানুবাদ করেছিল এই মোড়ে দাঁড়িয়ে।
অরুণা পোদ্দার নামের আগে মিসেস অথবা মিস না লিখে শ্রীমতী লেখেন। এতদ্দ্বারা কিছু বোঝায় কী?
‘কুমারী মেয়েদের নামের আগেও শ্রীমতী লেখা যায়।’
‘যায় না। শুধু বিবাহিতাদের বেলায়ই লেখা হয়, তাই হয়ে আসছে… এটা তফাত বোঝাবার জন্য, রবীন্দ্রনাথ তাই-ই বলেছেন।’
রবীন্দ্রনাথের নাম হতেই গীতা চুপ করে যায়। অর্চনার স্বামী একসময় কলেজে বাংলা পড়াত। এখন বিরাট এক চামড়া রপ্তানি প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ বিভাগে তিন নম্বর পদে রয়েছে।
গীতা আর জিজ্ঞাসা করল না কবে কোথায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন।
বেলা মুখচোরা, লাজুক ধরনের। এই সব তর্কে সে অস্বস্তি বোধ করে। ছোটোবেলা থেকেই সে ঝগড়া বা তর্ক এড়িয়ে চলেছে। এটা জন্ম থেকেই ওর চরিত্রে ছিল, আরও বিকশিত হয় বাড়ির পরিবেশের জন্য। গীতা বা অর্চনা যখন কথা বলে সে প্রায়শই চুপ করে থাকে।
আজ তাদের বিষয় নতুন শিক্ষয়িত্রী দেবিকা দাশগুপ্ত।
এপ্রিলের মাঝামাঝি, দশটাতেই রোদ অসহনীয় চিড়বিড়ে হয়ে ওঠে। দরদর ঘাম গড়ায় গাড়িবারান্দার নীচে ছায়াতে দাঁড়িয়েও। ওরা মিনিট চারেক হেঁটে স্কুল থেকে এখানে পৌঁছেছে এবং ঘামছে। এখন কলকাতা নেমে পড়েছে ঊর্ধ্বশ্বাস কাজে।
অথচ সকাল ছ-টায় বেলা যখন এই জায়গাতেই বাস থেকে নামে তখন শান্ত, প্রায় নির্জনই থাকে। স্টেশনারি আর মিষ্টির দোকানগুলো খুলে যায়। বাচ্চচাদের স্কুলে পৌঁছে দেবার পথে বাবা কিংবা মা চট করে খাতা বা কেক কিনে নেয় কিংবা সন্দেশ। চায়ের দোকানে কিছু লোক খবরের কাগজ পড়ায় ব্যস্ত থাকে। দুধের ডিপোয় লাইন, লুঙ্গি বা পাজামা পরা লোকেরা থলি হাতে বাজারে যাচ্ছে, তখনও চোখে ঘুম। খবরের কাগজের ডাঁই বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে রেখে বা ফুটপাথের রেলিংয়ে ঝুলিয়ে বিক্রি করে যাচ্ছে কাগজওয়ালা। স্তূপাকার ডাব নিয়ে কাটারি হাতে রোজই ফুটপাথে বসে থাকে দু-তিনজন। বেলা দ্রুত স্কুলের দিকে যেতে যেতে রোজ এই সবই দেখতে পায়। প্রায় একই দৃশ্য। সে এখন আর কিছু লক্ষ করে না। শুধু সতর্ক থাকে তখনও যারা ফুটপাথে ঘুমিয়ে তাদের গায়ে যেন পা না লাগে।
কিন্তু চার ঘণ্টার মধ্যেই পাঁচমাথার মোড়টা বেগবান ভারী মোটা একটা চাকার মতো ঘুরতে থাকে। থিকথিকে জনতা, প্রত্যেকেই ব্যস্ত। অধিকাংশের তিরিক্ষে মেজাজ, প্রত্যেকেরই মাথার মধ্যে একটা কিছু উদ্দেশ্য বা প্রয়োজন, কেউই দরকার ছাড়া স্থাণু নয়। এদের মাঝে বেলা নিজেকে এই সময় বেমানান বোধ করে। তবু ভালো লাগে এই পরিবেশটা। ধাতব বা মনুষ্য নানান মারুতি, রং, ভঙ্গি, গতি এবং ব্যস্ততার একটানা শব্দ আর অজস্র মুখের আসা-যাওয়ার, ঝকঝকে রোদের, ট্রাম বাস মোটর থেকে রিকশা বা ঠেলাগাড়ির ক্রমশ এগিয়ে আসা ও চলে যেতে যেতে বাড়ির আড়াল পড়ার… এর মধ্যে বেলা এক ধরনের উৎকণ্ঠিত চাঞ্চল্য বোধ করে।
শিব দত্ত লেনে একতলা বাড়ির একখানা ঘর আর ছাদের জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা জগৎ যার খানিকটা নিয়ে সে রোজ বাড়ি ফেরার চেষ্টা করে। কিন্তু তিমিরের কোনো আগ্রহ বা ঔৎসুক্য নেই। নিজের ছোট্ট জগৎটাকে কিছুতেই বিব্রত করতে ও যেন রাজি নয়। যেমন-
‘আজ দেখলাম, একটা পকেটমারকে বাস থেকে নামিয়ে কী মার মারলো।’
‘ঠিকই করেছে।’
‘মরে যেতে পারে…রক্ত বমি করছিল। দেখে গাটা যা করে উঠল।’
‘দ্যাখো কেন!’
তিমির নিরাসক্ত স্বরে কথাগুলো বলেই গভীর মনোযোগে কাচা পর্দাগুলোয় জল ছিটোতে থাকে ইস্ত্রি করার জন্য।
গীতার থলথলে বাহু থেকে ঘাম গড়িয়ে কনুই পৌঁছে গেছে। আঁচল দিয়ে মুছে নিল। সপসপ করছে ব্লাউজ, সুতোর মতো পাউডার গলার চামড়ার ভাঁজে, পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স।
‘আজ গরমটা যেন আরও বেশি। পরশু তো একশো দুই ছিল। কাল কত ছিল কে জানে।’
‘কাগজ থেকে দেখে নিলেই তো হয়।’
অর্চনা পত্রিকা সাজানো দোকানটার দিকে এগিয়ে গেল। শোনার দূরত্বের বাইরে সে পৌঁছতেই গীতা গলা নামিয়ে বলল:
‘আমার কিন্তু মনে হয় বীরেনবাবু ঠিকই দেখেছে, ওইসব জায়গায় ভদ্রলোক রেগুলারই যান…অর্চনা যতই চাপার চেষ্টা করুক না। ওদের ফ্ল্যাটে অনেক খালি বোতল দেখেছি। ফুর্তিটুর্তি করবে না কেন, উপরি আয় আছে তো।’
‘কিন্তু খুব ভালো করে না জেনে একজন টিচারের নামে এ ধরনের কথা বলা উচিত নয়, বীরেনবাবু কি দেবিকা দাশগুপ্তকে চেনেন?’
ততক্ষণে বেলা আরও কিছু বলত, কিন্তু অর্চনা ফিরে এসেছে। বেলার শেষ বাক্যটি তার কানে গেছে।
‘কাল একশো পয়েন্ট চার…ওঁর সঙ্গে যে বন্ধু ছিল সে দেবিকাকে চেনে…চেনে মানে এক পাড়াতেই থাকে। আমি অবশ্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেরা করেছি, আমাদের কলিগের নামে যা-তা বললে অমনি মেনে নেব?’
