‘বল হরি, হরি বোল।’
আচমকা, ধীর গম্ভীর স্বরে, তারকের অদূরেই কারা ধ্বনি দিল। তারক সঙ্গে সঙ্গে জমাট বেঁধে গেল। হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন দ্রুত। ভয় এঁকেবেঁকে শিরদাঁড়ায় ওঠানামা করছে। অন্ধকারের মধ্যে একটা সাদা ছায়া তার চোখের সামনে দিয়ে ভেসে যেতেই তারক ইউক্যালিপটাসের গন্ধ পেল। শববাহকরা তাকে দেখতে পায়নি। গন্ধটা হঠাৎ মনে পড়িয়ে দিল মাকে। তারক পুরো একটা শিশি মা-র গায়ে ঢেলে দিয়েছিল। শ্মশানে যাবার সারা পথটায় এই গন্ধটা তার ভালো লেগেছিল। মা একবার বলেছিল, ‘তোর খেলা একদিনও তো দেখলুম না।’
‘বল হরি, হরি বোল।’
অনেকটা এগিয়ে গেছে, তাই ওদের ধীর গম্ভীর সমবেত কণ্ঠ বিষণ্ণ বিলাপধ্বনির মতো তারকের কানে আঘাত করল। অভিভূতের মতো সে রেলিংয়ের ফাঁক দিয়ে গলে রাস্তায় নামল। এইবার? টি. সিনহা এইবার তুমি কী করবে? ওরা চলে যাচ্ছে, অনুসরণ করবে? তাহলে দাঁড়িয়ে থেকোনা। মৃতেরা অত্যন্ত সাহসী হয়। যদি ভয় পেয়ে থাক তাহলে ওর সঙ্গ নাও। তারপর তারক ভাবল, কিন্তু আমি ভয় পাব কাকে বা কি জন্য! এগারোজনের মধ্যে আসার সব সুযোগই আজ হারিয়েছি। সকাল থেকে মিস-ফিল্ড করে গেছি শুধু। অনিতা, বঙ্কুবিহারী, রেণু, সলিল, গৌরী বহু রান তুলে নিয়েছে, ইঞ্জেকশন নেওয়াও ফসকেছি। এখন আমার ভয় পাওয়ার কোনো অর্থ হয় না। কিন্তু ইউক্যালিপটাসের গন্ধটা বড়ো ভালো।
তারকের মনে হল এগিয়ে গেলে গন্ধটা আবার সে ফিরে পাবে, তাই হাঁটতে শুরু করল। বহুদূরে পুলিশ অথবা মিলিটারি ট্রাকের হেডলাইটের আলো দু-ধারের বাড়িগুলোকে একবার অস্বচ্ছভাবে ফুটিয়ে তুলেই নিভে গেল। অনেকদূরে আকাশের কিছুটায় পাটকেল রঙ ধরেছে। সামনের দিক থেকে চাপা গোলমালের শব্দ আসছে। কিন্তু তারক কিছুতেই গন্ধটা আর পাচ্ছে না। ক্রমশ সে দিশাহারা এলোমেলো বোধ করতে শুরু করল। কোথায় গেল ওরা? হেডলাইটের আলো যতটুকু জ্বলেছিল তার মধ্যে সামনের রাস্তায় কোনো গতিশীল ঘনত্ব দৃষ্টিতে আসেনি।
টি. সিনহা তাহলে! যদি তখনই ওদের সঙ্গ নিতে তাহলে ইউক্যালিপটাসের গন্ধ অনুসরণ করে বিপজ্জনক এলাকাটি পার হয়ে যেতে পারতে। পুলিশ বা মিলিটারি নিশ্চয়, শবদেহ বা তার বাহকদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামবে না। কিন্তু টি. সিনহা তখন তুমি ইতস্তত করলে কেন? মৃতের দেহে ছড়ানো এই গন্ধ কি তুমি কখনো পাওনি? তারক মাথা ঝুঁকিয়ে বিষণ্ণ কণ্ঠে নিজেকে বলল, অন্ধকারে ওদের ‘হরি বোল’ ধ্বনি আমায় অভিভূত করেছিল।
হেডলাইটের সন্ধানী আলো আবার জ্বলে উঠল। তারক থমকে দাঁড়িয়েই ছুটে গিয়ে একটি বাড়ির দেওয়াল ঘেঁষে আশ্রয় নিল। চোখ তুলে বারান্দায় জানলায়, ছাদে আবছা আবছা মুখ দেখতে পেল। মাঠের মাঝখান থেকে গ্যালারিতে সারিবদ্ধ মুখের মতো দেখাচ্ছে। সেই মুহূর্তে পরপর দুটো বিস্ফোরণ ঘটল তার দুশো গজ দূরে।
‘অ্যাই, অ্যাই মশাই পালান। এখানে দাঁড়িয়ে কী কচ্ছেন?’ উপর থেকে একজন চিৎকার করে উঠল। তারক মুখ তুলে কাতর স্বরে বলল, কোথায়? প্যাভেলিয়নে!
‘আরে মশাই আপনাকে দেখতে পেলে যে ওরা এদিকেই ছুটে আসবে, বাড়ি বাড়ি হামলা করবে! পাশের গলিটা দিয়ে পালান। হাতজোড় করে বলছি, পালান।’ তারকের পিছনেই জানলার একটা পাল্লা ফাঁক করে একজন বলল। তারক সেখান থেকে সরে যেতে যেতে হতাশস্বরে বলল, কিন্তু সেকেন্ড ইনিংস আমি আর পাব না।
ইঞ্জিন চালু হবার শব্দ হল। তারক হাত তুলে তালুর রেখাগুলো পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে এখন। ট্রাকের চাকা ভাঙাচোরা রাস্তায় আলোটাকে কাঁপাচ্ছে। কে একজন সামনের ছাদ থেকে বলল, ‘ইট মার ব্যাটাকে। মেরে ভাগা, নয়তো নড়বে না।’
তারক থমকে দাঁড়াল। এইমাত্র ইটের একটা বড়ো খণ্ড তার সামনে পড়ে ভেঙে ছড়িয়ে গেছে। একটা টুকরো ছিটকে দেওয়ালে লেগে তার ছুঁচলো কোণটি তুলে পায়ের কাছে স্থির হয়ে। সেই তীক্ষ্নতার দিকে তাকিয়ে তারক কেঁপে উঠে বলল, টি. সিনহা কোথাও তোমার রেহাই নেই। তাহলে অসুখ সারিয়ে কী লাভ!
তারপর তারক পাশের অন্ধকার গলিতে ঢুকল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় আলোজ্বলা একটা রাস্তায় পৌঁছল। তার দু-ধারের বাড়িগুলো জীর্ণ, হতশ্রী, দরিদ্র। কিন্তু রাস্তাটা নিরুদবিগ্ন, জনহীন, শব্দবিহীন। বোঝাই যায় না কিছুদূরেই ভয় দাপাদাপি করছে। মোড় ঘুরতেই টিউবওয়েল দেখে তারকের তৃষ্ণা পেল। প্রচুর জল খেয়ে তৃপ্ত হয়ে, রুমালে মুখ মুছতে মুছতে দেখল, টিনের চাল দেওয়া একটি বাড়ির দরজায় তিনজন স্ত্রীলোক দাঁড়িয়ে। তাদের দিকে এগিয়ে গেল সে। তখন তাদের একজন সাদামাটাভাবে বলল, ‘আসবে নাকি গো?’
তারক শোনামাত্র প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে নোটগুলো স্পর্শ করল। যা টাকা আছে তাতে তিন-চার কোটির পেনিসিলিন ইঞ্জেকশন নেওয়া যায়। আশ্বস্ত হয়ে সে বলল, ‘নিশ্চয়। কিন্তু বড্ড খিদে পেয়েছে, আগে কিছু খেতে হবে। পাওয়া-টাওয়া যাবে তো?’
নীলথলি – মতি নন্দী – উপন্যাস
কাল পৌনে দশটা থেকে দশটার মধ্যে তিনজন একসঙ্গে আসবে। দশটা পনেরোয় ওরা যে যার বাড়ির দিকে রওনা হয়ে যাবে। প্রতিদিনই এমন, অবশ্য স্কুলের ছুটির দিনগুলো বাদে।
শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের যে মাথাটা থেকে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের ধড়টা দক্ষিণে শেয়ালদার দিকে প্রসারিত, সেই মাথায় এসে প্রতিদিন ওরা গাড়িবারান্দার নীচে দাঁড়ায়-নরেন্দ্র বালিকা শিক্ষা নিকেতনের প্রাথমিক বিভাগের তিন শিক্ষয়িত্রী: গীতা চ্যাটার্জি, অর্চনা মাইতি আর বেলা দাস। তিনজনেই বিবাহিতা।
