‘মুরগি নয়, পেনিসিলিন চাই। নয়তো তোমার মাথাতেও কাঁকর ঢুকিয়ে দেব।’ তারক শাসানি দেবার যাবতীয় চেষ্টা স্বরনালি এবং মুখভঙ্গিতে প্রয়োগ করল। গৌরী পিছনে তাকিয়ে খুঁজল চাকরটি কোথায়। দোতলায় ওঠার সিঁড়ির ধারে বড়ো ছেলের ক্রিকেট ব্যাটটি দেখতে পেয়েই ছুটে গিয়ে সেটা হাতে নিল।
তারক ঘর থেকেই দেখল স্কোয়্যার-কাট করার ভঙ্গিতে গৌরী ব্যাটটা তুলে অপেক্ষা করছে। শ্রান্ত পদক্ষেপে সে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। গৌরী উঁচু করে ব্যাট তুলে চাপা গলায় হুঁশিয়ারি দিল-‘এখনি বেরিয়ে যাও, নয়তো মাথা ফাটিয়ে দেব।’
ধীরে এগিয়ে এসে গৌরীর থেকে দু-হাত তফাতে দাঁড়িয়ে খুবই ক্লান্তস্বরে তারক বলল, ‘পাঁচলাখের একটা পেনিসিলিন কি জোগাড় করে দিরে পারোনা? তাহলে অসুখটা সারিয়ে ফেলতে পারি।’
ব্যাটটা তুলেই রয়েছে গৌরী। কিন্তু ওর চোখে স্পষ্টই বিভ্রান্তি। তারক হাত বাড়িয়ে ওর হাত থেকে আলতো করে ব্যাটটা নিয়ে যত্ন ভরে দেওয়ালে হেলান দিয়ে রাখল। ‘বলের ছাপগুলো দেখছি ঠিক মাঝখানেই!’ অস্ফুটে এই বলে তারক আবার গৌরীর সামনে দাঁড়াল।
‘আমার চিঠিগুলো কি রেখে দিয়েছ?’ গৌরী উদবিগ্ন স্বরে বলল।
‘না। আমার বিয়ের দিনই পুড়িয়ে ফেলেছি।’
‘ভালোই করেছ,’ হাঁফ ছেড়ে স্নিগ্ধ হয়ে গেল গৌরী, ‘বউয়ের হাতে পড়লে তোমার সুখশান্তি চিরকালের মতো ঘুচে যেত। শুনেছি নাকি খুব সুন্দরী?’
‘গৌরী তোমার মাথাতেও কাঁকর ঢুকেছে।’
‘কথা ঘোরালে কী হবে, শুনেছি দারুণ দেখতে। একদিন নিয়ে এসো না।’
‘কিন্তু তুমি এখন আমায় একটা পাঁচলাখ পেনিসিলিন দেবে।’
‘ফাজলামো রাখো। এইভাবে বললে সত্যি সত্যিই কিন্তু মাথা ফাটিয়ে দেব বলছি।’
গৌরী হাসিহাসি মুখে চোখ পাকিয়ে মাথাটা ঈষৎ বাঁদিকে হেলিয়ে দেওয়ালের গায়ে দাঁড় করিয়ে রাখা ব্যাটটার কাছে সরে গেল। হাত বাড়ালেই এখন সেটি তার মুঠোয় এসে যাবে।
‘আমাকে কি সাহায্য করবে না গৌরী? এই হাঙ্গামার মধ্যেও তোমার কাছে এসেছি যখন, বুঝতেই পারছ তোমাকে কতখানি মনে রেখেছি! কিন্তু তুমি কি একদমই ভুলে গেলে?’
‘ওসব কথা কী কেউ চিরকাল মনে করে রাখে নাকি? নাহ, তোমার মাথায় ঠিকই কাঁকর ঢুকেছে নয়তো পেনিসিলিন চাইতে শেষে আমার কাছে এলে?’
‘একদমই মনে নেই? একটুখানিও?’
‘না, সত্যিই মনে পড়ে না। প্রথম প্রথম দু-চারদিন মনে পড়েছিল। তখন কিন্তু কষ্ট হত তোমার জন্য, একটুও মিথ্যে বলছি না।’
‘কিন্তু এখন যদি এমন কিছু করি যাতে তুমি আর আমায় জীবনে ভুলতে পারবে না, যদি আমার অসুখটা তোমার মধ্যে ঢুকিয়ে দি?’
‘তার মানে!’ গৌরী অস্বাভাবিক চেঁচিয়ে উঠল এবং হাত বাড়িয়ে ব্যাটটা তুলে নিল। তারক ব্যাটটার দিকে তাকিয়ে তখন মনে মনে আবার বলল, ঠিক মাঝখান দিয়েই বলগুলো খেলেছে।
‘আমার কী এমন দায় পড়েছে যে তোমার মতো একটা লোককে মনে করে রাখতে হবে? তোমার মতো লক্ষ লক্ষ লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে এই শহরে। তোমার কী এমন পরিচয় আছে যেজন্য তাদের থেকে আলাদা করে দেখব, মনে করে রাখব? তুমি কে?’ গৌরী ব্যাটটা দু-হাতে আঁকড়ে ধীরে ধীরে তুলল।
‘আমি জানি, আমি কে।’ এই বলে তখন তারক মাথাটা সামনে ঝোঁকাল এবং পতনরত বঙ্কুবিহারীর মতো হাসিতে ঠোঁট দুটি মুচড়ে ক্রমশ আরও ঝুঁকে পড়ল। কিন্তু যা চেয়েছে ঘটল না। অক্ষত মাথাটা তুলে সে দেখতে পেল, গৌরী চর্বিভরা বস্তার মতো নিতম্ব দুটি টানতে টানতে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে যাচ্ছে আর সিঁড়ির মাথায় একটি বেঁটে মোটা লাঠি হাতে চাকরটি নির্নিমেষে তার দিকে তাকিয়ে।
সদর দরজা পার হয়ে রাস্তার পা দেওয়ামাত্র তারকের একবার ইচ্ছে হল গৌরীকে ডেকে বলতে, তোমার ছেলের হাতে খেলা আছে, ওকে উৎসাহিত কোরো। তারপর অনেক দূর এগিয়ে তারক একবার পিছু ফিরে তাকাল। রাস্তার মাঝখানে একটা লোক পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে। তার হাতে একটা লাঠি। শূন্য রান করে প্যাভেলিয়ানে ফিরে আসার মতো হাঁটতে হাঁটতে তারক টালা ব্রিজের দিকে চলল।
এগারো
টি. সিনহা এইবার তুমি কী করবে, এখন তুমি কোথায় যাবে? নিজেকে এই প্রশ্ন করে তারক ব্রিজের ঠিক মাঝখানে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আবার পিছনে তাকাল। টালার জলের ট্যাঙ্কটা গাঢ়তর অন্ধকার হয়ে আকাশে খানিকটা গহ্বর সৃষ্টি করে রয়েছে। দূরের রাস্তার আলো টিমটিমে অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সামনে গ্যালিফ স্ট্রিটের মোড়ের দিকে শুধুই অন্ধকার। একটু আগেই ওদিকে দপ করে সাদা আলো ঝলসে উঠে তিন-চারটি বিস্ফোরণ ঘটে গেছে। ফটাস-ফটাস রাইফেলের শব্দও তারক পেয়েছে। আর এগোবে কি না, সে বুঝে উঠতে পারছে না। এখন ওই অঞ্চলটি নিশ্চয় পুলিশের রাইফেলের আওতায়। ওইখান দিয়েই বাড়ি ফিরতে হবে এবং তখন টি. সিনহার গুলিবিদ্ধ মৃতদেহটির রাস্তায় পড়ে যাওয়ার শতকরা আটানব্বই ভাগ সম্ভাবনা আছে।
তাহলে আমি কি সারারাত এইখানেই দাঁড়িয়ে থাকব? তারক মুখ ফিরিয়ে গৌরীর বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটার দিকে তাকাল। আলোগুলো দেখা যাচ্ছে, রাস্তাটা জনশূন্য। টি. সিনহা তুমি টেকনিক জানোনা। জানলে মুরগির মাংসে পাকস্থলী ভরিয়ে গৌরীর বাড়িতেই আজ নিরাপদে রাত কাটাতে পারতে। এমনকী গৌরীর বিছানাতে একশো রানও হাঁকাতে পারতে। কিন্তু তোমার মাথায় ছিল কাঁকরের চিন্তাটা। ভুল ব্যাট চালিয়ে এখন টালা ব্রিজের উপর ক্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে তুমি ভাবছ কেমন করে বাড়ি ফিরবে। তারক ভাবল, ব্র্যাডম্যান হলে কি গৌরী বার করে দিত?
