গৌরী অবসন্নের মতো ঘরে ঢুকল। মুখে উদবেগ। সোফায় বসে হতাশ স্বরে বলল, ‘মিস্টার ভাদুড়িকে ফোন করলাম। উনি প্রায়ই ছুটির পর তাস টাস খেলতে ওর বাড়িতে যান, আজ যাননি। আশ্চর্য, তাহলে কোথায় গিয়ে কী যে কচ্ছেন!’
‘কে মিস্টার ভাদুড়ি?’ তারক প্রশ্নটি করে তিন সেকেন্ড থেমে একই স্বরে, হেলান দেওয়া অবস্থাতেই বলল, ‘আমাদের আগের কথা মনে পড়ে গৌরী?’
ধাক্কা সামলে ওঠার পরই, গৌরীর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। অস্ফুটে বলল, ‘মনে পড়ার মতো কোনো কথা আছে নাকি!’
‘তা অবশ্য নেই, তবু মাঝে মাঝে আমার মনে পড়ে। হয়তো আর বছর দশেক পর একদমই মনে পড়বে না। সংসার, অফিস, অসুখবিসুখ নিয়েই ব্যস্ত থাকব। একটা বয়স পর্যন্তই এসব মনে থাকে। কিন্তু তোমার মনে আছে কিনা এটা জানতে ভীষণ কৌতূহল হয়।’
‘কেন মনে থাকবে না। তবে এখন তুমি ওগুলো নিয়ে নতুন করে নিশ্চয় সম্পর্ক ঝালাতে চাইবে না!’ গৌরীকে আবার উদবিগ্ন দেখাল।
তারক মাথা নাড়ল। ‘তার কোনো উপায়ই আর নেই। কিন্তু মুশকিল কী জান, একটা কাঁকর আমার মাথার মধ্যে ঢুকে রয়েছে। সেটা অনবরত খচখচ করে।’
‘কী করে ঢুকল? অ্যাকসিডেন্টে?’ গৌরী উদবিগ্ন স্বরে বলল।
ক্লান্ত ভঙ্গিতে পিছনে মাথা হেলিয়ে তারক বলল, ‘আমি জানিনা কী করে ঢুকল। জেনে এখন কোনো লাভও নেই।’
‘কিন্তু একটা কাঁকর মাথায় নিয়ে কি মানুষ বাঁচতে পারে? তুমি অপারেশান করাও।’
‘কত লোকই তো এভাবে বেঁচে রয়েছে, লক্ষ লক্ষ লোক!’
‘বাজে কথা রাখো। কাঁকর লক্ষ লক্ষ লোকের মাথায় ঢোকে না। এগুলো অদ্ভুত ঘটনা, দু-একটাই ঘটে।’
‘তোমার মাথাতেও আছে, গৌরী, কিন্তু তুমি তা জান না।’
‘তাহলে ঠাট্টা হচ্ছিল এতক্ষণ! ব্যাপার কী, ডাক্তারের কাছে এসেছিলে বললে না?’
তারক জবাব দিতে যাচ্ছিল, একটি আধবুড়ো লোককে ঘরে ঢুকতে দেখে থেমে গেল। লোকটি গৌরীকে বলল, ‘বাবু ফোনে আপনাকে ডাকছেন।’
শোনামাত্র হাঁসফাঁস করে উঠে প্রায় ছুটে গৌরী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তারক ভাবল, আমি কী সৌভাগ্যবান, এই মেয়েমানুষটিকে বিয়ে করতে হয়নি। এবার আমি চলে যেতে পারি এখান থেকে। গৌরী এখন চমৎকার ফিল্ডিং দিচ্ছে। হাততালি পাবার জন্য ও উদবিগ্ন। কিন্তু আমারও উদবিগ্ন হবার মতো অনেক ব্যাপার রয়েছে অথচ বহুক্ষণ ধরেই তা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। আশ্চর্য!
গৌরী ফিরে এল মুখে হাসি নিয়ে। ‘ছেলেমেয়েদের আজ আর আনছে না। কলকাতা জুড়ে দারুণ গোলমাল চলছে। বাব্বাঃ, যা চিন্তায় পড়েছিলাম।’
‘তোমার স্বামী আজ ফিরবেন তো?’
‘না। এই হাঙ্গামার মধ্যে গাড়ি নিয়ে কেউ আসতে পারে নাকি? কোথাও রয়ে যাবে। রাত কাটাবার অনেক জায়গাই ওর আছে।’
গৌরীর মুচকি হাসিটা তারক লক্ষ করল। তার মনে হল যেন সামান্য অভাববোধ গৌরীর মধ্যে রয়েছে, যেজন্য ও নিশ্চিন্তে ফিল্ডিং দিতে পারে না। অবশ্য এক সময় আর বুঝতেই পারবে না যে ওর কিছু নিজস্ব চাহিদা আছে। তখন ষোলোআনা সুখী বোধ করতে ওর বিন্দুমাত্রও অসুবিধা হবে না।
‘এই গোলমালের মধ্যে তুমি বাড়ি যাবে কী করে?’ গৌরী আবার উদবিগ্ন হল।
‘ভাবছি তোমার এখানেই থেকে যাব।’ হালকা চালে হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে তারক বোঝাতে চাইল এটা মজা করার জন্যই বলা।
‘কিন্তু চাকরটা রয়েছে যে?’ সামনে ঝুঁকে চাপাস্বরে গৌরী বলল। ‘উনি কাল বাড়ি ফিরলে হয়তো কথাপ্রসঙ্গে ওকে বলে দিতে পারে।’
‘কী বলবে!’
‘তুমি এখানে রাতে ছিলে।’
‘কিন্তু এরকম হাঙ্গামার মধ্যে কোনো লোক এসে পড়লে, রাতে তার থেকে যাওয়াটাইতো স্বাভাবিক। তা ছাড়া, তোমার স্বামী তো জানেই না আমি কে! তাহলে অত ঘাবড়াবার কী আছে?’
‘কিন্তু তোমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে, বলব কী?’
তারক দেখল গৌরী আবার উদবিগ্ন হয়েছে। এবার সে আর মজা বোধ করল না। গম্ভীর হয়ে বলল, ‘এক সময় আমার প্রেমিক ছিল, একথা নিশ্চয় বলতে পারবে না বা দাদার বন্ধু বললেও অনেক রকম সন্দেহ করতে পারে। তার থেকে বরং তুমিই বলো, আমাকে দেখে কী মনে হয় অর্থাৎ যা বললে তোমার চাকর পর্যন্ত অবিশ্বাস করবে না?’
‘কিন্তু তুমি কি সত্যিই রাতে থাকবে!’ গৌরী বিব্রত চোখ মুখ নিয়ে বলল এবং দ্রুত প্রশ্ন করল, ‘কেন?’
‘আচ্ছা আমাকে প্রাইভেট টিউটর কিংবা বাজার সরকার বলে চালানো যায় কী?’
‘কিন্তু তুমি এতদিন পরে, এইরকম একটা সময়ে হঠাৎ এলে কেন, মতলবটা কী?’
তারক এইবার গৌরীর চোখে সত্যিকারের ভয় দেখল। কাল ঠিক এই সময়ই অনিতার চোখেও সে এইরকম চাহনি দেখেছিল। তারকের মাথাটা মুহূর্তে গরম হয়ে উঠল। কঠিন এবং তীক্ষ্ন স্বরে বলল, ‘আমি এখনি পাঁচলাখের পেনিসিলিন চাই। আমার অসুখ হয়েছে।’
‘কী চাই?’
গৌরী হতভম্ব হওয়ায় তারক আবার বলল, ‘পাঁচলাখের একটা পেনিসিলিন পেলে আমি এখানে রাতে থাকব না।’
‘কোথায় পাব আমি? কোনো সুস্থ লোকের কাছে কি শুধু শুধু পেনিসিলিন থাকে! সত্যিই তোমার মাথার মধ্যে কাঁকর ঢুকেছে।’ আশ্বস্ত হয়ে গৌরী এবার হাসল। ওর মুখ থেকে উৎকণ্ঠার দাগগুলো মুছে গেছে। অল্প আমোদ ঝকমক করে উঠল চোখে। এমনকী প্রগাঢ় স্বরে সে বলেও ফেলল, ‘এখানেই আজ খেয়ে যাও বরং। মুরগি কিনেছিলাম সকালে।’
এই বলে গৌরী দরজার দিকে এগোতেই তারকও উঠে দাঁড়াল। তাইতে গৌরী ফিরে তাকাল এবং একপা একপা করে পিছু হটে দরজার ওধারে পৌঁছে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
