গৌরীদের দোতালার বারান্দায় আবার এসে দাঁড়িয়েছে। তারক মন্থর হতে হতে বারান্দার তলায়ই দাঁড়িয়ে পড়ল। তাকে ঝুঁকে দেখছে। তারক মুখ তুলে তাকাল এবং অবিলম্বেই জেনে গেল গৌরীই। তারক পরিচিতের ভঙ্গিতে হাসল। হাত তুলে তাকে অপেক্ষা করতে বলে গৌরী বারান্দা থেকে সরে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সদর দরজা খুলে গৌরী বলল, ‘একটু আগে দেখলাম তুমি পায়চারি করছিলে। ঠিক বুঝতে পারছিলাম না তুমিই না অন্য কেউ।’
‘এদিকেই এসেছিলাম ডাক্তারের কাছে। বাড়ি নেই, তাই ভাবলাম ঘরে বসে কেন আর অপেক্ষা করি। তোমরা এখানেই থাক সেটা নারানের কাছে শুনেছিলাম। ও প্রায়ই আমার কাছে আসে চাকরির জন্য।’
‘ভেতরে এসে বসো। উনি সেই সকালে বেরিয়েছেন। চারদিকে যা শুরু হয়েছে, ভেবে মরছি বিকেল থেকে।’
গৌরীর সঙ্গে বৈঠকখানায় এল তারক। ছিপছিপে গৌরী স্থূল শ্লথ হয়েছে। কণ্ঠস্বর চালে ভারিক্কি। গায়ের রঙ একটু ফ্যাকাসে পরনে গৃহিণীসুলভ তাঁতের শাদা শাড়ি। হাতে কানে নাকে গলায় কিছু সোনার গহনা। অবয়বে অলস স্বচ্ছলতা। তারক কিঞ্চিৎ দমে গেল।
‘অনেকদিন পর দেখা হল। বাড়ির সবাই কেমন, ক-টি ছেলে পুলে?’ গৌরী একটি সোফায় তারকের মুখোমুখি বসে বলল।
‘ভালোই আছে। ছেলে এখন দুটি। তোমার কটি?’
‘তিনটি। দুই ছেলে এক মেয়ে। কালকেই ওরা পিসির বাড়ি বেড়াতে গেছে। কথা ছিল উনি আজকে ওদের নিয়ে আসবেন। কিন্তু ওরা এখনও যে কেন আসছে না। ভীষণ ভাবনায় পড়ে গেছি।’
‘পিসির বাড়িতে ফোন করে দেখনা, ফোন নেই তোমাদের?’
‘আমার আছে কিন্তু ননদের নেই। ওরা বাড়ি করে এই সেদিন যাদবপুরে উঠে গেছে, এখনও ফোন পায়নি।’
তারকের মনে হল, কথা বলতে বলতে গৌরী তাকে যেন খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করছে। তারক আড়ষ্ট হয়ে গিয়ে ভাবল, কী দেখছে? আকৃতি, পোশাক না মানসিকতা? চেহারা, যতদূর মনে হয়, এই বয়সে যেমন হওয়া উচিত-পাতলা চুল, কোমরে ও তলপেটে চর্বি, দাঁতে পানের ছোপ, গলায় ও ঘাড়ে চর্বির দাগ, প্রভৃতি দ্বারা বয়সোচিত। তবে দু-দিন দাড়ি কামানো হয়নি। মনে হওয়া মাত্র তারক তালু দিয়ে গাল ঘষল এবং ভাবল, তবে শার্ট এবং প্যান্ট যথেষ্ট ময়লাই। ঘরের এইসব আসবাব অর্থাৎ সোফা, দেওয়ালে টাঙানো কয়েকটি নিসর্গ চিত্র, দুটি আলমারিতে কিছু মাটির ও পিতলের পুতুল এবং ঝকঝকে বই, উজ্জ্বল সাদা দেয়াল, বিচিত্র নকশার পর্দা ও কার্পেট এবং এসবের সঙ্গে মানানসই একটি স্ত্রীলোকের সঙ্গে অবস্থান তার পক্ষে এখন কিছুটা অপ্রতিভকর মনে হচ্ছে।
‘আজকাল নতুন টেলিফোন পাওয়া খুব শক্ত। আমি চার বছর আগে অ্যাপ্লাই করেছি, এখনও পাইনি।’ বলেই তারকের মনে হল, এইসব বলার জন্যই কি এতদিন পরে আমি এখানে এসেছি!
‘তুমি কিন্তু একইরকম রয়েছ অথচ আমি কত মোটা হয়ে গেছি।’
‘কই!’ তারক অবাক হবার চেষ্টা করে বলল, ‘একইরকম তো রয়েছ, বরং আমিই তো মোটা হয়েছি।’ বলার পর স্পষ্টই বুঝল, গৌরী বিশ্বাস করেনি। কিন্তু ওর মুখের উপর আরামের আস্তরণ পড়ল। তবে কি এই দেখার জন্যই এতদিন পরে এলাম!
‘ডাক্তারের কাছে এসেছিলে বললে, কী হয়েছে?’
‘অসুখ।’ বলেই কথা ঘুরিয়ে তারক জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি বোধহয় অনেকদিন বাপের বাড়ি যাওনি।’
‘যাই, বিজয়ায় মাকে প্রণাম করতে। তা ছাড়া আর সময় কোথায়? তোমার বউ বছরে ক-বার বাপের বাড়ি যায় বল তো? তাওতো আমার পাঁচ বছর পর তোমার বিয়ে হয়েছে। তোমার ছেলেরাও নিশ্চয় স্কুলে যায় না।’
‘এইবার ভরতি করাব। আমাদের ওদিকে একটা ভালো স্কুলও নেই। যে দু-একটা আছে, তাতে এমন ভিড়, চেনাশোনা না থাকলে ভরতি করানোই যায় না। তোমার জানাশোনা কেউ আছে?’
‘ওনার থাকতে পারে। কিন্তু দেখতো, আমি এখন কী করি! ছেলেমেয়েদের নিয়ে কখন যে আসার কথা, ক-টা বাজল?’
হাতঘড়ি দেখে পনেরো মিনিট কমিয়ে তারক সময় বলল।
‘এখন ওদের শুয়ে পড়ার সময়। আচ্ছা, খুব হাঙ্গামা হচ্ছে কী? চাকরটা বলল, শ্যামবাজারের দিকে নাকি খুব গুলি চলেছে। ওইখান দিয়েই তো ওদের আসতে হবে। কী যে করব এখন ভেবে পাচ্ছি না। ওরা তো গাড়িটাড়ি পুড়িয়ে দেয়?’
‘লাল ক্রশ চিহ্ন থাকলে ছেড়ে দেয়। ডাক্তারদের কিছু বলে না।’
‘উনিতো ডাক্তার নন, তা ছাড়া মুখে যদি গন্ধটন্ধ পায় তাহলে তো মারধোরও করতে পারে। কতবার বারণ করেছি তবু একদিনও কথা শোনে না।’ অধৈর্য হয়ে গৌরী উঠে দাঁড়াল। রাস্তার জানলার পর্দা তুলে এধার ওধার তাকিয়ে ফিরে এসে আর সোফায় বসল না। ‘চা খাবে, কিংবা কফি?’
‘নাহ। সকাল থেকে অনেক খেয়েছি।’
হঠাৎ ঘর থেকে গৌরী বেরিয়ে গেল। ছেলেমেয়েরা না ফেরায় উদবিগ্ন, ব্যস্ত। অথচ আমি! তারক ভাবল, বাবা-বউয়ের সামনে আজীবন আমাকে দাঁড়াতে হবে। সলিল গুহের বাবা অফিসে গিয়ে যে সব কথা বলে আসবে, তার সামনে আরও কুড়ি বছর বসতে হবে। রোগ সারাতে ইঞ্জেকশন নিতে হবে। অথচ আমি এইসব ভাবনা মাথায় নিয়ে, এখানে বসে গৌরীর সঙ্গে সদ্য পরিচিত প্রতিবেশীর মতো আলাপ করছি। এখন বোধহয় আমরা অনায়াসেই জিজ্ঞাসা করতে পারি-আজ কী রান্না হল? বা তোমরা কি এবার বড়ি দিয়েছ? অথচ বছর বারো আগে একেই আমি ভীষণ ভালোবাসতাম!
অথচ, তারক সোফায় হেলান দিয়ে দেওয়ালে ঝোলা একটি বাগানের নিসর্গ চিত্রের দিকে তাকিয়ে ভাবল, গৌরী আমার সঙ্গে পালাতে রাজি ছিল। যদি সেদিন পালাতাম দুজনে! এতবছর পর তাহলে এই ঢঙেই আমাদের কথাবার্তা হত কী? প্রেম তো ওই ছবিটার ফুলগাছগুলোর মতো, প্রেমিক-প্রেমিকা দুজন শুধুই মালি! তাদের কাজ তো গাছকে জিইয়ে রাখা। যত ভালো সার জল রোদ হাওয়া দিয়ে পরিচর্যা হবে তত ভালো ফুল ফুটবে। সেজন্যই কি প্রেমের কাণ্ডকারখানায় ফুল দেখানো হয়, পাশে রাখা হয়, বিনিময় করে হুঁশ করিয়ে দেওয়া হয়? কিন্তু কী সার, কী জল দিতে হবে রেণু তা জানে না। আমার মানসিকতা অনুযায়ী রেণু রোদ হাওয়া খেলাতে পারে না। কিন্তু গৌরীই কি পারত? শুধুই আবেগ আর শরীর আর রূপ দিয়ে কি প্রেম টিঁকে থাকতে পারে?
