তারক পায়চারির ভঙ্গিতে হাঁটতে শুরু করল। এইভাবে এখন কোথাও বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাটা নিরাপদ নয়। ঘড়িতে দেখল আটটা বেজে দশ। বহুদূরে শব্দ হচ্ছে। কোনটা রাইফেলের কোনটা বোমার, তারক পার্থক্য করতে পারল না। বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে থমকে দাঁড়াল। কে যেন বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। গৌরী কী? ইঞ্জেকশন নেওয়া হয়নি এখনও তার। একটাও ডাক্তারখানা খোলা পায়নি। স্ত্রীলোকটি বারান্দা থেকে ঝুঁকে দেখছে রাস্তাটা। তারকের মনে হল বোধ হয় গৌরী নয়। যদিও বেশ কয়েক বছর সে গৌরীকে দেখেনি, তাহলেও এরমধ্যে নিশ্চয় এত মোটা হয়ে যেতে পারে না।
কিন্তু ডাক্তারখানা খুঁজতে খুঁজতে গৌরীর বাড়ির সামনে এসে পায়চারি করছি কেন? সমস্যা তো ইঞ্জেকশন নেওয়ার! গৌরী মোটা হয়েছে কী হয়নি, সেটা জানার জন্যই প্রাণ হাতে করে কী এখানে এসেছি? তারক এইসব চিন্তার মধ্যে পড়ে গিয়ে নিজের উপর বিরক্ত হয়ে উঠল। এবং প্রাণপণে সিদ্ধান্ত নিল গৌরী নয়, ইঞ্জেকশন নেওয়াটাই জরুরি। কিন্তু পরিস্থিতি বাদ সেধেছে। এইসব ঝামেলা ঠিক এইদিনেই বাধাবার কী দরকার ছিল? তারক নিজেকে ছেড়ে তার চোখের সামনে যা কিছু পড়ছে, সেগুলির উপরই বিরক্ত হতে শুরু করল। তার মনে হল, লক্ষ লক্ষের সমস্যার যোগফল এই হাঙ্গামা, এর মধ্যে আমার কোনোই অবদান নেই বা এইসব বোমা গুলি আগুন টিয়ারগ্যাস দিয়ে আমার সমস্যার সমাধান হবে না। সুতরাং আমি যখন লক্ষ লক্ষের সমস্যার সঙ্গে জড়িত নই বা জড়াবার প্রয়োজন হচ্ছে না, তখন আমায় রেহাই দেওয়া হোক। এখন আমার দরকার পাঁচ লক্ষের একটা পেনিসিলিন ইঞ্জেকশন। না হলে কোর্সের মধ্যে ছেদ পড়বে। তাহলেই কেঁচে গণ্ডূষ।
কিন্তু কাকে বলব আমায় রেহাই দেওয়ার জন্য? তারক ঘুঁটে লাগানো দেওয়ালের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবল, লক্ষ লক্ষের জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িত এই বিপ্লবের এবং রক্তপাতের বিরুদ্ধে আমার একার সমস্যাটাকে কোনোমতেই দাঁড় করানো যায় না। ভাবতেই কেমন হাসি পাচ্ছে। যদি পালাবার কোনো উপায় বার করা যায়। হিরণ্ময়, বঙ্কুবিহারী, প্রণব, রেণু, নারান, সলিল প্রভৃতি এদের সবাইয়ের কাছে যদি যথাযথ থাকতে পারি! ওরা যেভাবে আমায় দেখতে চায়, সেইভাবে যদি দ্বাদশ ব্যক্তি হয়ে আজীবন ফিল্ডিং খেটে যাই তাহলে আমার, শুধুই আমার, বলতে কোনো সমস্যাই আর থাকবে না। তাহলে হয়তো মুক্তি পাব। তখন নিশ্চয় বলতে পারব-সইতে পারি, সব সইতে পারি। কিন্তু আমার দ্বারা চমৎকার একটা দ্বাদশ ব্যক্তি হওয়াও বোধহয় সম্ভব হবে না। ঠিকই ক্যাচ ফেলব, দু-পায়ের মধ্য দিয়ে ঠিকই বল গলে যাবে। জেতা ম্যাচ হারব আমারই জন্য। আর গ্যালারিতে বসা লোকেরা গালাগাল দেবে-বেরিয়ে যা ব্যাটা, বেরিয়ে যা। উত্তেজিত মুখগুলোয়, শ্লোগান দিতে থাকা বিমল মান্নার মতো গ্যাঁজলা উঠবে। ক্রুদ্ধ হাতগুলো, প্যাভেলিয়ানের দরজা দেখাবে বঙ্কুবিহারীর মতো। আর আমি তখন ভাবব, বোলারকে থামিয়ে কেন দেখে নিলাম না পিচের উপর কোনো কাঁকর রয়েছে কিনা।
থমকে দাঁড়াল তারক। তিন গজ দূরেই, সদর দরজার লাগোয়া দেওয়ালে ওই কাঠের তক্তায় কী লেখা? নামের পরে, ডি-ফিল, এলএলবি, না এমবিবিএস? তারক একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। দু-পা এগোলেই সাদা অক্ষরগুলো দৃষ্টির সীমানায় এসে যাবে কিন্তু তারক এগোতে পারছে না। পা দুটো জমিতে সিমেন্ট দিয়ে গাঁথা মনে হচ্ছে তার। ছমছম করছে বুক। যদি ডাক্তারের নামই লেখা হয়! ওদের কাছে কি পেনিসিলিন থাকে? স্যাম্পল দেয় না কি পেনিসিলিন কোম্পানিরা?
‘কে? কাকে চাই?’
তারক চমকে উপরে তাকাল। বারান্দা থেকে একটা ভারী জবরদস্ত মুখ ঝুঁকে দেখছে। তারকের স্বরনালি থেকে আলতো হয়ে বেরিয়ে এল, ‘ডাক্তারবাবু আছেন?’
‘কী দরকার? এখন কোথাও যেতে টেতে পারব না।’
‘আজ্ঞে, কোথাও নিয়ে যাবার জন্য আসিনি।’ তারক মুখ তুলে গলা চড়িয়ে বিনীত কণ্ঠে বলল, ‘একবার নীচে আসবেন?’
‘কেন?’
‘একটা ইঞ্জেকশন নেব। পেনিসিলিন।’
‘সঙ্গে এনেছেন?’
‘না।’
‘তবে?’
‘আপনার কাছে পাওয়া যাবে না?’
‘না।’
তারক হাঁফ ছেফে বাঁচল। উপর থেকে ফেলে দেওয়া স্বরধারা হুবহু গগন বসুমল্লিকের মতো। শোনামাত্রই তারকের ভিতরটা কাঁচমাচু হয়ে গেছে। একবার গোপালকে ডাকতে গিয়ে এইরকম ভাবে তাকে কথা বলতে হয়েছিল। দোতলা থেকে গগন বসুমল্লিক বলেছিল, ‘কী দরকার এখন?’ তারপর, ‘এখন ওর পড়ার সময়। এখন খেলতে যাবে না।’ তখন তিনতলার ছাদের পাঁচিলের কিনার থেকে গৌরী হাত নেড়ে একটা চিঠি দেখাচ্ছিল দেবার জন্য। কিন্তু তারক তখন লজ্জায় মরে যাচ্ছিল। গৌরীর চিঠিতো সে নিলই না, নিজের লেখা চিঠিটাও পকেটে নিয়ে ফিরে আসে। তারপর দিন চার-পাঁচ ওমুখো আর হয়নি।
দূর থেকে মোটর হেডলাইটের আলো আসছে। তারকের মনে হল, এভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে হাঁটা উচিত। যদিও এখানে হাঙ্গামা হচ্ছে না এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার মতো জনতাও ত্রিসীমানায় নেই। তবু এই নির্জনতা, ছিনতাইকারি এবং উত্তেজিত প্রেমিক যুগলের অনুকূল চতুষ্পার্শ্বের অন্ধকার, একক লোকের পক্ষে নিরাপদ বোধ হচ্ছে না। তারক হাঁটতে শুরু করল এবং একটি মোটর পিছন থেকে তাকে অতিক্রম করে ধীরে চলে গেল। তখন সে একপলক তাকিয়ে দেখতে পায়, ড্রাইভার আসনে বসা পুরুষটির কাঁধে মাথা রেখে একটি স্ত্রীলোক। এতে সে অন্যদিনের মতো আমোদ পেল না, বরং একটু অবাক হল। এমন সময়েও এরা বেরিয়েছে! নিশ্চয় অহীনের মতো কোনো উল্লুক। এরপর তার মনে হল, এবার আমি কি বাড়ি ফিরব?
