‘এই বাড়িতে আমাদের অফিসের একটি ছেলে থাকে তার খোঁজে এসেছি।’ তারক কণ্ঠস্বরের দ্বারা বোঝাবার চেষ্টা করল এইবার আমাকে রেহাই দাও। যে কাজে তুমি যাচ্ছিলে, যাও।
‘কী নাম বলুন তো?’ নারানের সঙ্গী এতক্ষণে মুখ খুলল।
‘সলিল গুহ।’
‘আরে! সলিলদাকে তো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আফিম খেয়েছেন দুপুরে।’
তারক কিছুক্ষণের জন্য ঝাপসা দেখল মুখটা। কিছুক্ষণ নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ ছাড়া আর কিছু তার কানে ঢুকল না। কিছুক্ষণ ধরে তার মনে হল, মাথা নীচু করে তাকে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অবশেষে এইরকম অবস্থা থেকে সামলে উঠে কোনোক্রমে তারক বলল, ‘কেন?’
‘তা ঠিক বলতে পারব না। আমি ওদের পিছনের বাড়িতেই থাকি।’ নারানের সঙ্গী ও সলিলের প্রতিবেশী ভারিক্কি চালে বলল। ‘আজ সকালে ওদের বাড়িতে ঝগড়া হচ্ছিল খুব।’
ওকে থামিয়ে তারক বলে উঠল, ‘ক-টার সময়?’
‘দশটা-সাড়ে দশটা হবে। একজন বুড়ো মতোন লোক সঙ্গে একজন মেয়েছেলেকে এনে ঝগড়া করছিল।’
তারক আবার থামাল, ‘মেয়েছেলেটা বিবাহিতা না অবিবাহিতা?’
‘সেটা লক্ষ করিনি। তবে বোধহয় ঘোমটা ছিল।’
‘কী রঙের শাড়ি পরেছিল?’
‘বোধহয় খয়েরি।’
‘কী নিয়ে ঝগড়া হচ্ছিল?’
‘ঠিক বুঝতে পারলুম না। তবে আমাদের ঝি বলছিল, ওদের বাড়িতে অনিতা নামে একটা মেয়ে আসত, তাকে নিয়েই নাকি গণ্ডগোল। বুড়ো লোকটা জানতে চাইছিল, সলিলদার সঙ্গে অনিতার বিয়ে ঠিক হয়েছে কিনা। সলিলদা নাকি বলে, ওসব বাজে কথা। তখন বুড়োটা বলে, বাজে কথাই যদি হয় তাহলে মেয়েটা বলছে কেন ওর পেটে বাচ্চচা রয়েছে তোমার? সলিলদা বলে, মিথ্যে কথা। বাচ্চচা থাকতে পারে কিন্তু আমার নয়, অন্য কোনো লোকের। অনিতা নাকি আরও অনেক লোকের সঙ্গে মেলামেশা করত। ওদের অফিসেরই একজন, কী একটা নাম বলল যেন সলিলদা, তরুণ না তারা, তার সঙ্গেও নাকি অনিতার ব্যাপার-স্যাপার আছে।’
‘তারপর?’
‘তারপর সলিলদার বাবা-মা ওদের বার করে দেয় বাড়ি থেকে। বুড়োটা যাবার সময় নাকি শাসিয়েছে অনিতাকে নিয়ে এসে পাড়ায় সকলের সামনে ওর মুখ দিয়ে বলাবে ওই বাচ্চচা কার।’
‘অনিতাকে নিয়ে এসেছিল কি তারপর?’
নারানের সঙ্গী উত্তর দিতে গিয়ে থেমে গেল। সলিলদের বাড়ি থেকে এক প্রৌঢ় বেরোচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে নারানের সঙ্গী বলল, ‘জ্যাঠামশাই সলিলদার খবর পেলেন?’
‘পটল এইমাত্র হাসপাতাল থেকে ফোন করে বলল, ডেঞ্জার পার হয়ে গেছে আর ভয়ের কিছু নেই। আধঘণ্টা দেরি করে হাসপাতালে আনলে নাকি কোনো আশা থাকত না।’
‘সলিলদার খোঁজ নিতে এই ভদ্রলোক এসেছেন।’
তারকের দিকে হাত তুলে দেখাল নারানের সঙ্গী। এই সময় বড়ো রাস্তার দিকে চাঞ্চল্য দেখা দিল। গলির মুখ থেকে কিছু লোক ত্রস্তে ভিতরে ঢুকে আসছে। পর পর সদর দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হচ্ছে। চিৎকার করে বারান্দা থেকে ছেলেকে ডাকাডাকি করছে এক স্ত্রীলোক। কোনো এক বাড়ির ছাদ থেকে কেউ গম্ভীর গলায় কার প্রশ্নের উত্তরে বলল, ‘বোধহয় মানিকতলার দিকে আগুন দিয়েছে।’
‘আমি আর সলিল একই অফিসে কাজ করি। আজ অফিস যায়নি, তাই ভাবলুম ফেরার পথে একবার খোঁজ নিই।’ তারক এগিয়ে এসে বলল। প্রৌঢ়কে অত্যন্ত বিচলিত দেখাচ্ছে। ইনিই যে সলিলের বাবা সেটা বুঝতে তারককে মাথা ঘামাতে হল না।
‘দেখুন তো সলিলকে বিপদে ফেলার জন্য কী জঘন্য চক্রান্ত শুরু হয়েছে। আচ্ছা আপনাদের অফিসে তারক বলে কেউ আছে কি?’
তারক সঙ্গে সঙ্গে পাথর হয়ে গেল গলা পর্যন্ত। শুধু আড়চোখে দেখল নারানের চোখে বিস্ময় ও কৌতূহল। আপনা থেকেই ওর মুখ দিয়ে বেরোল, ‘কেন বলুন তো?’
‘সেই লোকটাই এর মূলে। আপনি চেনেন কি এই তারক সিংহকে?’
‘নাঃ। বোধহয় অ্যাকাউন্টস কী ব্রাঞ্চ সেকশানে কাজ করে। তিন-চারশো লোকের অফিস তো।’ তারক অবিচলিত স্বরে বলল এবং লক্ষ করল নারানের চোখ বিস্ফারিত হয়েছে।
‘আপনার নাম?’
‘হিরণ্ময়,’ এক মুহূর্ত থমকে তারক যোগ করল, ‘মান্না।’ বলেই সে ঘুরে দাঁড়াল। দুড়দাড় করে লোকেরা ছুটে আসছে গলির মধ্যে। ট্রাকের এঞ্জিনের গোঁ গোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেশ দূরে দুটো মাঝারি ধরনের পটকা ফাটার শব্দ হল।
‘জানেন হিরণ্ময়বাবু, ওই তারক সিংহের জন্য আজ আমার ছেলে মরতে বসেছে। জানেন, এই লোকটা একটা আইবুড়ো মেয়েকে ফাঁসিয়ে আমার ছেলের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে। তার বাবা-বউ আজ এসে ব্ল্যাকমেল করতে চেয়েছে। আর খোকা লজ্জায় অপমানে-‘ ফুঁপিয়ে উঠল প্রৌঢ়।
‘পালান, পালান, পুলিশ ঢুকছে। হাতে রাইফেল।’ বলতে বলতে কয়েকটি যুবক ছুটে আসছে।
ভীত স্বরে নারান বলল, ‘তারকদা আর দাঁড়াবেন না।’
‘জানলেন হিরণ্ময়বাবু-‘
‘তারকদা বিপদ হবে, এবার পালান।’
‘ওই তারক সিংহকে আমি দেখে নেব। আপনাদের অফিসে কালই যাব। সবাইকে খুলে বলব। আর-‘
তখন ছুটতে শুরু করেছে তারক। গলির ভিতরের দিকে নয় বড়ো রাস্তার দিকে। রাস্তার আলো নেভানো। মোড়ে পৌঁছে দেখল অন্ধকার খাঁ খাঁ করছে। এবার কী করব? তারক অসহায়ের মতো সামনে পিছনে তাকাল এবং এবার ইঞ্জেকশন নিতে হবে, মনে পড়ে যাওয়ায় তখনি আশ্বস্ত হল। একটা উদ্দেশ্য আপাতত পেয়ে মন দিয়ে অন্ধকারের মধ্যে সে হাঁটতে শুরু করল।
দশ
রাস্তার আলোগুলো দূরে দূরে। দু-ধারের বাড়িগুলোয় কোনো প্রকার ব্যস্ততা নেই। রাস্তাটা হাত পঁচিশেক চওড়া। তার দু-পাশে ঘাসের পাড়। তারক দাঁড়িয়ে থেকে একবার দূরের ব্রিজটা দেখে কাছের টালা ট্যাঙ্কের দিকে চোখ তুলল। ব্রিজটা অন্ধকার। রেল ইয়ার্ডের ওধারের বাড়িগুলোর আলো দেখা যাচ্ছে। ইয়ার্ডের দেয়ালে ঘুঁটে দেওয়া। শুকনো গোবরের গন্ধ ছাড়া আর কিছু নাকে লাগছে না। রাতের এই সময় রোজই এইরকম নির্জন থাকে রাস্তাটা। মাঝেমধ্যে প্রাইভেট মোটর যায়। ছোটোবেলায় টালাপার্কে ক্রিকেট খেলতে আসার জন্য এই রাস্তাটা তারক ব্যবহার করত। এখানে তখন ছিল মিলিটারিদের আস্তানা। পরে হয় আর্ম পুলিশদের। তখন টালা ব্রিজে ফুটপাথ ছিল দেড় হাত।
