পার্ক থেকে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়ানো কিশোরীটির দিকে তারক আবার তাকাল। রেলিংয়ে গাল রেখে একদৃষ্টে অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে। চুলের গোছা ঝুলছে। ঠিক এইভাবেই গৌরী কখনো কখনো দাঁড়িয়ে থাকত। ফুটপাথের ধারে উনুন ধরাচ্ছে এক বিহারি-বউ। দূর থেকে মোটর ট্রাকের শব্দ আসতেই ভয়ে উঠে দাঁড়াল। সিগারেটের দোকানের পাল্লা ফাঁক করে বিক্রি চলেছে। ধূমপানের ইচ্ছা হল তারকের। দুটো সিগারেট কিনল। দোকানিকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আজ হয়েছে কিছু?’
‘মিলিটারি নেমেছে।’
‘তাহলে বেশ ঘোরালো হয়েছে। চলবে কিছুদিন।’
‘হ্যাঁ। শুধু এই সবই চলুক, আর দোকান বন্ধ রেখে ছেলে বউ নিয়ে আমি কোমরে গামছা বাঁধি।’
দোকানির বিরক্তি দেখে সান্ত্বনা দেবার জন্য তারক বলল, ‘নেশার জিনিস, লোকে ঠিকই কিনবে। যতই গুলিগোলা চলুক আর দাঙ্গা যুদ্ধ হোক না, আপনার কেনাবেচা বন্ধ হবে না।’
লোকটি হঠাৎ ফিক করে হেসে বলল, ‘হরতালেও।’
তারকও হেসে বলল, ‘নেশা এমনই জিনিস।’
‘আমি কিন্তু বিড়ি সিগারেট এমনকী চা পর্যন্ত ছুঁইনা। এসব খেলে ফুসফুসের রোগ হয়।’ দোকানি হঠাৎ বিজ্ঞ এবং গম্ভীর হয়ে উঠল।
‘তাহলে আপনি এসব খারাপ জিনিস বিক্রি করেন কেন!’
‘কী করব, পেট চালাতে হবে তো।’ হঠাৎ তিরিক্ষে হয়ে গেল লোকটা। তারক সঙ্গে সঙ্গে স্থান ত্যাগ করল।
সলিলদের বাড়ি যাবার গলিতে বেশ ভিড়। কিছুলোক জটলা পাকিয়ে আজকের নানাবিধ ঘটনা সম্পর্কে কথা বলছে।
তারক দাঁড়িয়ে পড়ল। বছর কুড়ি-বাইশের একটি ছেলে তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। তাই থেকে তারক বুঝল, আজ সারা কলকাতা বিপ্লবের পথে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ করেছে। পথে পথে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির মোকাবিলা করতে ব্যারিকেড রচিত হয়েছে। ক্ষুধার্ত মানুষের রক্তে লাল হয়ে উঠছে কলকাতার রাস্তা। এখন আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তারক হঠাৎ দেখল নারান গলির মধ্য দিয়ে আসছে। সঙ্গে আর একজন। তখুনি উলটোদিকে হাঁটতে শুরু করবে কিনা ভাবতে ভাবতে শুনতে পেল-‘আরে তারকদা! কাল যে আপনার খোঁজে বাড়িতে গেছলাম।’
যাক আজতো যায়নি! তারক প্রাথমিকভাবে স্বস্তি অনুভব করল এবং মুখখানি অমায়িক করে বলল, ‘তাই নাকি! যা ব্যাপার কাল থেকে শুরু হয়েছে, কখন গেছলে?’
‘সন্ধে নাগাদ। আপনার বাবা বললেন এখনও ফেরেনি।’
‘হ্যাঁ, কাল একটা শোকসভায় যেতে হয়েছিল। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কলেজে একসঙ্গে একই ক্লাসে পড়েছি, নিশ্চয় নাম শুনেছ, পরিমল ভট্টাচার্য, কবি ছিল।’
‘পরিমল! আপনার বন্ধু ছিলেন পরিমল ভট্টাচার্য?’
তারক দেখল নারানের চোখে শ্রদ্ধা বিস্ময় ইত্যাদি উথলে উঠেছে। সেটা পরিমল না তারকের উদ্দেশ্যে বুঝতে পারল না সে। তবে বুঝল, নারানের কাছে তার দাম বেড়ে গেল। এতদিনে পরিমল এই উপকারটুকু তার করল। আর একটা ব্যাপার সে লক্ষ করল, নারান প্রথমে শুধু পরিমল বলল। যে রবীন্দ্রনাথ বলা হয়। যদি সে ব্র্যাডম্যান হত তাহলে নারান বলত-তারক!
তাহলে অত্যন্ত বিশ্রী শোনাবে। নিজের নামটা কোনোদিনই তারক পছন্দ করেনি। কয়েক বছর আগে কেউ জিজ্ঞাসা করলে বলত টি. সিনহা। ‘টি’-কে চাপ দিয়ে আধসেকেন্ড প্রায় ধরে রেখে ‘সিনহা’-টা ফলো-থ্রুর মতো পিছনে টেনে আনত। কিন্তু এখন দেখছে কেউই সিংহ বলেনা, বলে সিঙ্গি আর তারককে দুমড়ে মুচড়ে, তার্কা। কিন্তু ব্র্যাডম্যানের মতো হলে? অন্তত পরিমলের মতো হলেও-
‘আমার খুব প্রিয় কবি ছিলেন। ওঁনার অটোগ্রাফ আমার কাছে আছে।’ নারান হাতদুটো পিছনে রেখে পদস্থ অফিসারের সামনে দাঁড়িয়ে যেন কথা বলছে। এটা ভালো লাগলেও তারকের মনে হল পরিমলের জন্যই নারান এসব করছে।
‘তুমি কি পদ্য লেখ নাকি?’
‘এই সামান্য এক আধটা-‘ বলতে বলতে নারান লাজুক হয়ে গেল।
‘তোমার ইংরিজি পেপারে ফেল হওয়ার ব্যাপারটা আবার ওরা তুলছে! বলছে এত কম নম্বর, পেলে তাকে কী করে অন্যদের টপকে ইন্টারভিউয়ে ডাকা যায়।’
তারক যা চেয়েছিল তাই হল। নারানের চোখ এবং দেহভঙ্গি থেকে পরিমলের জন্য ভক্তি শ্রদ্ধা সমীহ প্রভৃতি ব্যাপারগুলি সঙ্গে খসে পড়ল। হাতদুটো পিছন থেকে সামনে এল। কচলাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। মন্থর গতিতে তারক এগোল। নারান পিছু নিল।
‘ওটা ম্যানেজ করা যায় না তারকদা?’ নারান নীচুস্বরে বলল যাতে ওর সঙ্গী শুনতে না পায়।
তারক ভাবল, আগাগোড়াইতো মিথ্যের উপর দিয়ে চালাচ্ছি। মন্দ পাওনা হচ্ছে না। কিন্তু এটাতো এখন আমার সমস্যা নয়। আমাকে এখন দেখতে হবে সলিল কী করল।
‘সেই চেষ্টাই তো ক-দিন ধরে করছি। কাল ওই শোকসভায় না যেতে হলে, অনেকদূর এগোতে পারতুম। একজনকে ধরার চান্স কাল পেয়েছিলুম।’ ঘাড় ফিরিয়ে তারক দেখল নারানের মুখের ভাব কেমন হল। ‘তবে জানো, পরিমলের মধ্যে বরাবরই দেখেছি এক ধরনের বিদ্রোহী কৌতুক ছিল, তাই না? ওর পদ্যের মধ্য দিয়ে, নারান তুমি নিশ্চয় লক্ষ করেছ, একটা অদ্ভুত নিঃসঙ্গ পৃথিবীর ছবি ফুটে ওঠে।’
‘আপনি কি আর একবার চেষ্টা করবেন তারকদা?’ নারান যেন প্রাণপণে বিরক্তি চেপে রেখে বলল। তারক ভাবল, আর ওকে নিয়ে খেলা করা ঠিক হবে না। তাহলে হয়তো বিদ্রোহী হয়ে পরিমলেরই আনুগত্য নিয়ে ফেলবে। সলিলের বাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছে দেখে তারক দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘আমি কালই আবার লোকটাকে ধরব। চেষ্টা আমি করে যাবই। আফটার অল আই অ্যাম এ ক্রিকেটার।’ তারক ভরসা দিতে নারানের কাঁধে দুটো চাপড়ও মারল। নারান বোকার মতো হাসল।
