‘আসুন এই পার্কটায় বসি।’
সলিল এগিয়ে গেল। তারক ইতস্তত করে ভাবল, বসলেই দেরি হয়ে যাবে। ওদিকে কী ঘটছে কে জানে। ব্যস্ত হয়ে সে বলল, ‘বসার দরকার কী, কথা তো শেষ হয়ে এল। এখন তোমায় গিয়ে অনিতার কী হল দেখে আসতে হবে, আর-‘
তারক থেমে গেল। সলিল পিছিয়ে গেছে। তারক চোখে চোখ রাখতে পারছে না। সলিলের চোখে ভয়, জিজ্ঞাসা, সন্দেহ।
‘তুমি গিয়ে বলবে অনিতার সঙ্গে তোমার বিয়ের সব ঠিকঠাক।’
‘না। কিছুতেই আমি বলতে পারব না।’ হঠাৎ হিংস্র দেখাল সলিলকে। তারক সাবধান হয়ে গেল।
‘কেন পারবে না, তুমি তো আর অনিতাকে বলছ না, বলবে আমার বউকে আমার বাবাকে।’
‘না, কাউকেই বলতে পারব না। অনিতা কাল শাসিয়েছে, বিয়ে নাকি করতেই হবে, দরকার হলে কোর্টেও যাবে। আমি যদি নিজে মুখে স্বীকার করি তাহলে ওরাই তো কোর্টে গিয়ে সাক্ষি দেবে।’
‘দেবে না, আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি।’
‘বেশ দিল না, তাতেই বা আপনার সুবিধে কী। মামলা হলেই ওরা জানবে আমি ধাপ্পা দিয়েছি আসলে অনিতার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আজ বেঁচে গেলেন কিন্তু দু-দিন পর ওরা তখন আপনাকেই সন্দেহ করবে।’
‘আহা, তুমি ভুল করছ গুহ। মামলা করা অনিতার পক্ষে সম্ভব নয় সেজন্য টাকাপয়সা লাগে, ও পাবে কোথায়? আর অন্য যে ব্যাপারটা, সেটাও ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করাব।’
‘করাবেন যে তার গ্যারান্টি কী? আপনি নিজেকে বাঁচাবার জন্যই এইসব করবেন বলছেন, বেঁচে যাওয়ার পর যদি না করেন?’
‘গুহ তুমি এমন কথা কী করে বলতে পারলে। তিনদিন আগেও আমি অনিতাকে চিনতাম না। তুমি আমার পায়ে পর্যন্ত ধরলে উদ্ধার করে দেবার জন্য। কী দরকার ছিল আমার ডাক্তারের ব্যবস্থা করার জন্য ছোটাছুটির, তোমার মুখ চেয়েই তো? বল, বল, তোমার জন্যই আজ আমার এই অবস্থা, তুমিই তো ওই অখাদ্য পেতনিটাকে এনেছিলে। না আনলে এসব কথা তোমায় বলতে আসতুম না। আমার সর্বনাশ তো তুমিই করেছ।’
‘আমি করেছি! বাজে কথা, আপনি প্রথম দিনই ওকে খেদিয়ে দিলেন না কেন? কেন আশকারা দিলেন? রাতে ও কেন রইল? এখন আমার ঘাড়ে দোষ চাপানো?’
‘তুমি বলতে চাও কী?’
‘যা বলতে চাই ঠিকই বুঝেছেন।’
‘তোমায় আমি মারব, প্রচণ্ড মারব।’
তারক এগিয়ে এল। মাথার মধ্যে ঝনঝনানি শুরু হয়ে গেছে। গুমোট হয়ে আসছে চারিদিক। তার মনে হচ্ছে নিশ্বাস নেবার জন্য একটা ছেঁদাও শরীরে নেই। এবার সে মারা যাবে। এখন গুহ যদি আঙুল দিয়ে খুঁচিয়ে দেয়!
‘আমি মামলা করাব অনিতাকে দিয়ে। তুমি ওকে বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলাৎকার করেছ। পাশবিক অত্যাচার করেছ। আমি সাক্ষি দেব। ভেবেছ পালাবে? কোথায়, কোথায়? যেখানেই যাও পুলিশ তোমায় ধরে আনবেই।’
এমন সুযোগ আর পাবে না সলিল গুহ, তারকের চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করল, এইবার তুমি আমার ছেঁদাগুলো আঙুল ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে পরিষ্কার করে দাও।
‘তারকদা করবেন না, এসব করবেন না।’ বলতে বলতে সলিল পিছু হটে যাচ্ছে দেখে, খপ করে তারক ওর হাত ধরল।
‘আমি এই পার্কে বসে রইলুম। তুমি এসে খবর দেবে কী ঘটেছে। অনিতাকে ওখান থেকে নিয়ে আসা চাই। নইলে-‘
ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে সলিল ছুটে পালাচ্ছে। দেখতে দেখতে তারকের অবসাদ এল। ভারী লাগছে শরীর। দুলতে দুলতে পার্কের মধ্যে ঢুকে সে ঘাসে শুয়ে পড়ল।
তারক ঘুমিয়ে পড়েছিল। শিশুকণ্ঠের কাকলিতে জেগে উঠল। দুটি বাচ্চচা ওকে ঘিরে ছোটাছুটি করছে। তারক উঠে বসায় ওদের অসুবিধা হল, ওরা ইলেকট্রিক থামটার দিকে চলে গেল। পার্কে লোক কখন এল? বিকেল পর্যন্ত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছি ভেবে, তারকের খানিকটা অবাক বোধ হল। তারপরই মনে পড়ল গুহর আসবার কথা।
দাঁড়িয়ে সে চারধারে তাকাল। কোথায় গুহ! রাস্তাটা ফাঁকা-ফাঁকা। লোকেরা দ্রুত চলাফেরা করছে। এই দুটি ছাড়া পার্কে আর কোনো বাচ্চচা নেই। লক্ষ করে বুঝল এরা ভিখারির ছেলে। এতক্ষণে একটিও বাস যেতে দেখেনি। মনোহারি দোকানটা বন্ধ। তার পাশের মিষ্টির দোকানের একটা পাল্লা খোলা, একজনের শুকনো মুখ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু গুহ কই?
তারক পায়চারি করতে করতে রাস্তার দিকে নজর রাখল। তারপর একটা বেঞ্চে বসে রইল। ক্রমশ বিকেল পড়ে এল। পার্কটা একইরকম ফাঁকা পড়ে আছে। রাস্তাটা এখন একদমই জনহীন। চারদিক থমথমে হয়ে উঠেছে। তারক দূরের একটা বাড়ির বারান্দায় একটি কিশোরীকে দেখতে পেল! ভিতর থেকে এক বৃদ্ধা এসে যেন বকুনি দিচ্ছে। গোঁয়ারের মতো মাথা নেড়ে কিশোরীটি দাঁড়িয়ে থাকল। এত দূর থেকে তারকের ওকে গৌরীর মতো মনে হল। তারপর দেখল সশস্ত্র পুলিশ বোঝাই একটা ট্রাক দাপিয়ে যাচ্ছে।
গুহ কি এসে ঘুরে গেছে! হয়তো বাইরে থেকে উঁকি দিয়েছে। শোয়া মানুষকে দেখতে পায়নি। তারক অনুমান করতে চেষ্টা করল। যদি না এসে থাকে, তাহলে কিছু একটা ঘটেছে। রেণুর দাদা অনিতাকে মারধোর করতে পারে কি? করার কোনো যুক্তি নেই। অনিতা গলায় দড়ি দেবে বলেছিল, দিয়েছে কী? সময় লাগে দড়ির ব্যবস্থা করতে, তার আগেই রেণু এসে পড়েছে। তাহলে গুহ কি পালাল?
তারক স্থির করল এখন সলিলের বাড়িতে যাবে। সকালের ব্যাপারটা কতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে জানতে হবে। তবে একটা সন্দেহ আছে, সলিল আদৌ গেছে কিনা! অত্যন্ত ভীতু, হয়তো গঙ্গার ধারে গিয়ে বসে আছে। তাহলে গুহর বাড়ির কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই বোঝা যাবে পরিস্থিতিটা কী। গুহ যদি গিয়ে থাকে এবং বলে আসে অনিতার সঙ্গে তার বিয়ে হচ্ছে, তাহলে রেণুকে (ওকেই এখন ভয়) বোঝানো যাবে, পুরোটাই বঙ্কুবিহারীর কারসাজি। যে মেয়ে একজনকে ভালোবাসে, তার পক্ষে কি সম্ভব আর একজনের সঙ্গে খারাপ উদ্দেশ্যে রাত কাটানো? তুমি কি পারো? এইভাবে বলে রেণুকে ঘায়েল করতে হবে। কিন্তু সলিল যদি না গিয়ে থাকে?
