ওরা এলে ফয়শালা হবে। তারক অন্যমনস্ক হয়ে ভাবল, কীসের ফয়শালা হবে? অনিতাকে অসদুদ্দেশ্যে বাড়িতে আনিনি। সলিলকে দিয়ে ভজিয়ে দিলেই চলবে। তা করা এমন কিছু শক্ত হবে না।
‘খরচ-টরচ করতে হবে?’
‘না না, সে টাইপই নয়।’
এখন আমার হাতের মুঠোয় সলিল। ওর কীর্তির কথা ফাঁস হোক নিশ্চয় তা চাইবে না। কিন্তু বঙ্কুবিহারী এমন একটা পরিস্থিতি পাকিয়েছে, সেটা এখন কী করে ছাড়ানো যায়? অনিতাকে হাতে নাতে ধরিয়ে দিলে কি করব? কী বলব রেণুকে তখন?
‘হ্যাঁরে নামটা কী?’
‘রেণু।’
‘উঠছিস কেন, বোস না আর একটু। চা খাবি? শুধু রেণু না রেণুকা? একটু সেকেলে ধরনের যেন, তাই না?’
‘আমায় একটা পেনিসিলিন নিতে হবে। বোস, চট করে তোর কম্পাউন্ডারের কাছ থেকে আগে নিয়ে আসি, তারপর বলছি।’
অহীনকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তারক ছিটকে খুপরি থেকে বেরোল। কম্পাউন্ডার তখন এক রোগীকে বলছিল-‘চালের বদলে গুলি দিয়ে কি ক্ষুধার্ত মানুষকে ঠান্ডা করা যায়, বলুন?’ তারককে কাছে আসতে দেখে সে থেমে গেল।
ইঞ্জেকশন নেবার সময় ঘড়ি দেখে তারক অধৈর্য হয়ে উঠল। ছুতোরের কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। খুপরির মধ্যে আর না ঢুকে এখান থেকেই ছুতোরকে নিয়ে চলে যাবে স্থির করল। অহীন বেরিয়ে এল। জামার হাতা নামিয়ে তারক ওর কাছে এসে দাঁড়াতেই অহীন ফুটপাথের কিনারে টেনে নিয়ে বলল, ‘রোগটোগ থাকলে কিন্তু চলবে না।’
‘কার?’
‘যার কথা বললি।’
‘কোথায় বললুম!’
নিজেকে ঝরঝরে তাজা লাগায় তারক বিরক্তি প্রকাশ করল নির্ভয়ে। তাইতে অহীন থতমতো হল।
‘বাঃ আলাপ করিয়ে দিবি বললি না?’
‘আরে দূর, সে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে। ভালো ফিগার থাকা চাই, হ্যান্ডসাম হওয়া চাই, কিছু একটা গুণও থাকা চাই, এসব কি তোর আছে? রোগীর নাড়ি টেপা ছাড়া আর পারিস কি?’
ছুতোরের কাজ শেষ হয়ে গেছে দেখে তারক আবার বলল, ‘তোর দোকানে পেনিসিলিনের দাম পাঁচ পয়সা বেশি নিল। এইভাবে লোককে ঠকিয়েই তো গাড়ি করেছিস।’
অহীন কিছুক্ষণ ওর দিকে পাংশু হয়ে তাকিয়ে থেকে, তাড়া খাওয়ার মতো অবস্থায় খুপরিতে ঢুকে গেল।
ছুতোরকে সঙ্গে নিয়ে তারক হনহনিয়ে বাড়ির দিকে চলল। কিছুক্ষণ অহীনের অদ্ভুত মুখটা চোখে ভেসে ছিল, এখন অনিতা, রেণু, বঙ্কুবিহারীর মুখ। ঘড়ি দেখে হিসাব করল। বঙ্কুবিহারী পৌঁছনোর কতক্ষণের মধ্যে রেণু রওনা হবে সেটা নির্ভর করছে কীভাবে বঙ্কুবিহারী খবরটা জানাবে। সেই অনুযায়ী সময় লাগবে। ধাক্কা সামলে উঠে, গোছগাছ করে, দুই ছেলেকে নিয়ে রওনা হতে। তারকের মনে হল, এজন্য আধঘণ্টা সময় যেতে পারে। ট্যাক্সি পাওয়া, সেটা বরাত। দুই থেকে পঞ্চাশ মিনিট এজন্য বরাদ্দ করা যায়। হিসাবটা সামলাতে সামলাতে মোড় ঘুরে সামনে তাকিয়েই সে পাথর হয়ে গেল।
ট্যাক্সিটা সবে থেমেছে। আধময়লা খয়েরি শাড়ি-পরা রেণুই প্রথম নামল। কোনো দিকে না তাকিয়ে হন্তদন্ত হয়ে সে চলল বাড়ির উদ্দেশ্যে। আর এক দরজা দিয়ে বঙ্কুবিহারী আর গেঞ্জিগায়ে লুঙ্গিপরা রেণুর দাদা নামল। ট্যাক্সির ভাড়া চুকিয়ে দিল বঙ্কুবিহারী। এরাও ব্যস্ত হয়ে গলি দিয়ে এগোল। ছেলেরা বা তোরঙ্গ সুটকেশ আনারও সময় দেয়নি।
এবার আমি কী করব?
তারক ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। বঙ্কুবিহারী কী বলে ওদের নিয়ে এসেছে তা অনুমান করে লাভ নেই। অনিতার ভাগ্যে কী আছে, তা ভেবেও লাভ নেই। তারক শুধু ভাবল, এখনও তিরিশ-চল্লিশ বছর হয়তো বাঁচব, কিন্তু কীভাবে?
‘চলুন বাবু দাঁড়ালেন কেন!’
ছুতোর মিস্ত্রি কিছুটা অবাক হয়ে গেছে। ট্যাক্সিটা পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। তাকিয়ে ঢোঁক গিলল তারক। স্কোরবোর্ডে শূন্য রানে নয় উইকেট। এখন তাকে ব্যাট করতে যেতে হবে। তলপেটে গুড়গুড় করছে। হাঁটু দুটো অবশ লাগছে। সে এখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মাঠের এগারোজন তাকিয়ে রয়েছে একাদশ ব্যাটসম্যানের অপেক্ষায়। চতুর্দিকে গুঞ্জন-টি সিনহা, টি সিনহা, টি সিনহা।
হঠাৎ ছুটতে শুরু করল তারক।
নয়
সলিল সদর দরজায় এসে দাঁড়াতেই তারক ওকে হাত ধরে রাস্তার দেয়ালের ধারে টেনে আনল।
‘গুহ তোমাকে একটা কাজ করতে হবে ভাই। এক্ষুনি। খুব বিপদে পড়ে গেছি।’
‘আপনি বাইরের ঘরে এসে বসুন, আজ অফিস যাবেন না?’
‘না না, আগে কথা দাও, করবে।’
‘আগে শুনি তারপর তো বলব।’
‘ওঃ তুমি দেখছি বদলে গেছ একদিনেই। আগে তো এমন ছিলে না, কী ব্যাপার আমার উপর রেগে আছ?’
‘রাগ করব কেন!’
‘তাহলে কথা দিচ্ছ না কেন? খুবই সামান্য ব্যাপার। তার বদলে তুমি যা করতে বলবে, করব। অনিতার ওই ব্যাপারটা যাতে হয়, কথা দিচ্ছি করিয়ে দেব। এবার বল কাজটা করবে?’
সলিলের নিরাসক্ত ভাবটা এতক্ষণে বদলাতে দেখে তারকের আশা হল। ওপরের বারান্দায় একজন প্রৌঢ়া এসে দাঁড়িয়েছে। রাস্তায় ক্রিকেট খেলছে ছেলেরা। সলিল বার কয়েক উপরে তাকিয়ে বলল, ‘চলুন হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যাবে।’
মিনিটখানেক পরই তারক শুরু করল।
‘কাল রাতে অনিতা এসে হাজির। ওকে বাড়ি থেকে মেরে তাড়িয়ে দিয়েছে।’
‘সে কি!’ সলিল চাপা গলায় বলল। হাঁটার বেগ কমে এল।
‘তুমি কাল গেছলে ওদের বাড়ি। তোমাদের মধ্যে যা কথা হয়েছে বাড়ির লোক জেনে গেছে। তারপরই এই ব্যাপার। রাত্রে আমাদের বাড়িতেই ছিল। বাবা আপত্তি করে, কেননা তোমার বউদি নেই। সে ক্ষেত্রে একটি মেয়ে রাতে থাকবে, আপত্তি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এই গোলমালের সময় অত রাতে ওকে চলে যেতে বলাটাও স্বাভাবিক হত না। তাই নিয়ে বাবার সঙ্গে ঝগড়া হয়। আজ ভোরে বাবা, যে ঘরে অনিতা রয়েছে সেই ঘরে তালা দিয়ে, তোমার বউদিকে নিয়ে এসেছে। আমি এই পর্যন্তই জানি।’
