‘আপনি একটু ঘুরে আসুন বাবু ততক্ষণ।’ তারকের অসহায় ভাব দেখে ছুতোর গাঢ়স্বরে বলল। ‘আমি আপনার জন্য থাকব’খন।’
শুনে ভালো লাগল তারকের। লোকটা এখন তো আমার ভগবান, বিপদ থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা একমাত্র ওই রাখে। এখন ওকে ছেড়ে যাওয়া উচিত হবে না বলেই তার মনে হল। কেউ এসে ধরে নিয়ে যায় যদি।
তারক ফুটপাথে পায়চারি শুরু করল। প্রতি পদক্ষেপে সে উত্তেজিত হয়ে উঠতে লাগল। অহীন যদি ইলেকশনে দাঁড়ায়, তাহলে বিরোধীপক্ষকে প্রাণ দিয়ে সমর্থন করবার প্রতিজ্ঞা তখনই সে নিল। মাঝে মাঝে সে ছুতোরের কাছে এসে দাঁড়ায়, আবার অস্থির হয়ে দূরে সরে যায়। এই সময় রোগীটিকে বিদায় করে অহীন দরজায় এসে দাঁড়াতে, তারকের হঠাৎ মনে হল, ওর কোনো বন্ধু নেই, ও তুই-তোকারি ভুলে গেছে।
‘ঘরে আটকা পড়েছে বলছিলে যেন?’
অহীন অনাগ্রহ প্রকাশের চেষ্টায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করল ওপারের খাকি পুলিশদের উপর। প্যান্টের পকেটে দেশলাই খুঁজছে।
‘আমার এক বান্ধবী। কাল রাতে এসে পড়ে হঠাৎ।’
‘বান্ধবী!’
অহীন পকেট থেকে হাত বার করতে পারল না। বাল্যকালের মতো করে চোখ দুটো সরিয়ে এনে তারকের উপর রাখল।
‘রাতে ছিল! বউ কিছু বলল না?’
‘বউ এখন বাপের বাড়ি।’
‘তাই বল।’
অহীনের চাপা হাসি শুরু হল। দেশলাইয়ে সিগারেট ঠুকতে ঠুকতে হঠাৎ যেন মনে পড়ল, সিগারেটটা এগিয়ে ধরল, ‘নে, তুই খা।’
তারকের সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে অহীন বলল, ‘রাস্তায় কতক্ষণ দাঁড়াবি ভেতরে এসে বোস।’
স্প্রিংয়ের দরজা দেওয়া খুপরির মধ্যে তারক ঢুকতেই অহীন জিজ্ঞাসা করল, ‘পেলি কী করে?’
তারক লক্ষ করল উত্তেজনা, অহীনের গালের থুতনির এবং চোখের কোলের চর্বিগুলোকে নিয়ে চটকাতে শুরু করেছে ফলে চোখদুটো উপচে উপচে উঠছে। দেখে কষ্ট হল তারকের। তাড়াতাড়ি বলল, ‘আমাদের অফিসেরই এক কলিগের ফিঁয়াসি।’
বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে অহীন কথাগুলোর সঙ্গে ধাতস্থ হল। তারপরই আবার সারামুখে চর্বির ডলাই মলাই শুরু হল। ‘আর তুই তাল বুঝে অমনি ভাগিয়ে আনলি! সাব্বাশ! এ চিকি সিঙ্গল রান চুরি। তোর পেটে পেটে অ্যাত্তো! কাল কি তোদের প্রথম হল? আরে শালা বলনা সব। দেখতে কেমন? উফ এলেম আছে বটে তোর।’
তারক দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে শুনে গেল। জবাব না দিয়ে অহীনের অধৈর্যতা চাগিয়ে তুলতে তুলতে ভাবল, শালা ছুতোরটাকে ছাড়লি না কেন। পনেরো কুড়ি মিনিট তো মোটে লাগত, তাতে কী এমন তোর সর্বনাশটা হয়ে যেত?
‘কিরে চুপচাপ যে? বল না?’
‘কী আর বলব। দেখতে অবশ্য তেমন ভালো নয়, তবে ফিগারখানা ভালোই! থার্টিসিক্স, হ্যাঁ আমি শ্যিওর, থার্টিসিক্সের বেশি তো কম হবে না, টোয়েন্টিফোর অ্যান্ড-তা প্রায় থার্টি এইটইতো মনে হয়। ভীষণ হট। একজনের সঙ্গে বেশিদিন থাকে না। বড়োজোর ছ-মাস। আমার আগে আরও চারজনের সঙ্গে ওর-‘
‘বাঃ বাঃ দারুণ তো! এইরকমই ভালো। একজনের সঙ্গে কি বেশিদিন থাকা যায়, কেমন বাসি বাসি লাগে। তোর লাগে না?’
‘কাকে, বউকে?’
অহীন থতমত হয়েই সামলে ওঠার জন্য বখাটের মতো হেসে চোখ মারল। ‘আমারও একজনের সঙ্গে একবার জমে গেছল।’
তারকের মনে হল অহীন এবার একটা মিথ্যা গল্প বানিয়ে বলবে। ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছে পাল্লা দিতে চায়। সদ্য গোঁপ ওঠা ছেলেরা যেসব কথাবার্তা বলে সম্ভ্রম কাড়তে চায় বন্ধুমহলে, অহীন এখন তাই শুরু করবে। ঘড়ি দেখে তারক হাই তুলল। ডান পা-টা টেবিলের উপর তুলে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। অহীন গ্রাহ্য করল না পা-টাকে। ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, ‘ম্যারেড। হাতে একজিমা হওয়ায় ট্রিটমেন্ট করাতে এসেছিল। স্বামীটা ডিগডিগে ক্ষয়া রুগির মতো আর ওর স্বাস্থ্য, মাইরি কী বলব। দেখেই বুঝেছিলেম এই স্বামীর পক্ষে ওকে স্যাটিসফাই করা অসম্ভব।’
‘তুই কী করলি?’
‘আমি?’ অহীন কিছুক্ষণ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘একদিন গাড়িতে নিয়ে গঙ্গার ধারে বেড়াতে গেছলুম। একটা চুমু খেয়েছিলুম মোটে। আর কিছু নয়।’
অহীনের স্বর বিষাদে মুহ্যমান হয়ে যাওয়ায় তারকের মনে হল বোধহয় ও সত্যিকথাই বলছে। সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে, কণ্ঠস্বর কোমল করে সে বলল, ‘আমাকে বললি না কেন ব্যবস্থা করে দিতুম। আমাদের একতলার ঘরটাতো খালিই পড়ে আছে।’
অহীন কথা বলল না। তারক দেখল ওর কণ্ঠনালী পিপাসার্তের জল খাওয়ার মতো ওঠানামা করল। মুখ দেখে মনে হচ্ছে কেঁদে ফেলবে। নিশ্বাসের দু-চারবার করাত টানার শব্দ হল। কাঁধ দুটো ঝুলে পড়েছে। পা নামিয়ে সিধে হয়ে বসে তারক দুম করে টেবলে ঘুঁষি মেরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ঠিক আছে, তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।’
‘আস্তে বল আস্তে, কম্পাউন্ডার এসে গেছে। ও আবার বাড়িতেও যায় কিনা।’ অহীন তটস্থ হয়ে সুইংডোরের তলা দিয়ে তাকাল। কয়েক জোড়া পা দেখা যাচ্ছে। রোগীদের বোধহয়।
‘কার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিবি, তোর সঙ্গে যার চলছে?’
‘হ্যাঁ।’ তারক ঘড়ি দেখে ভাবল, শালা, কালও তো আমায় দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলি। ছুতোরটার কাজ কি এখনও শেষ হল না! ইঞ্জেকশনটা এখনই তো নিয়ে নিতে পারি! ছুতোর নিয়ে গিয়ে কড়া খুলে অনিতাকে বার করে দিয়ে বঙ্কুবিহারী আর রেণুর জন্য তারপর অপেক্ষা করতে হবে।
‘বয়স কত রে?’
‘পঁচিশ ছাব্বিশ।’
