ফাঁক দিয়ে চাবি গলিয়ে দিল তারক। রাস্তার দিকের একটা জানলা খুলে যেতেই অনিতাকে দেখতে পেল সে। ফ্যাল ফ্যাল করে বন্ধ দরজাটার দিকে তাকিয়ে। তারক অধৈর্য হয়ে বলল, ‘আগে টাকা বের করে দাও। খুললেই ড্রয়ার দেখবে। তার মধ্যে একটা সিগারেটের কৌটোয় আছে। যা আছে সব আনো।’
অনিতা কথামতো কাজ করল। নোটগুলো পকেটে ভরতে ভরতে তারক বলল, ‘আমি ছুতোর মিস্ত্রি ডেকে আনছি। পাল্লা থেকে কড়া দুটো খুলে ফেললেই হবে। ভয়ের কিছু নেই। গায়ে এখনও ব্যথা আছে কি?’
‘তারকদা যেভাবে পারুন খুলে দিন। কী লজ্জা, কী লজ্জা, আমি গলায় দড়ি দেব। আপনার বউকে আনতে গেছে আপনার বাবা। ওরা এসে পড়ার আগে যদি না আমায় বার করতে পারেন তাহলে ঠিক গলায় দড়ি দেব।’ বলতে বলতে অনিতা উপুড় হয়ে ফোঁপাতে শুরু করল।
তারক প্রায় দশ সেকেন্ড জমাট বেঁধে রইল। তারপর গায়ের সবটুকু জোর জড়ো করে তালাটা ধরে টানল। কপালে চিটচিটে ঘাম ফুটছে। তালাটায় বার কয়েক হ্যাঁচকা টান দিল। ছুটে এসে দরজার উপর আছড়ে পড়ার উদ্যোগ করছে, দেখল দেবাশিস নীচে থেকে বিস্মিত মুখ নিয়ে উঠে এসেছে, শব্দ শুনে। ওকে মজা দেবার চেষ্টা না করে তারক দুড়দাড়িয়ে নীচে নামল। বাড়ি থেকে বেরোবার সময় শুনল দেবাশিস পিছন থেকে বলছে, ‘আজ অফিসে যাবেন তো?’
বড়ো রাস্তার মোড়ে পৌঁছে সে চারধারে তাকাল। কাঁধের উপর মুখবাঁধা থলি থেকে করাতের ডগা বা তুরপুনের হাতল বেরিয়ে আছে এমন একটা লোক দেখা যায় কি না খোঁজ করতে থাকল। জনাপাঁচ খাঁকি পুলিশ রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে। অন্য সময় তারক নিশ্চয় খোঁজ করত, কোথায় কীসের গোলমাল বেধেছে বা রায়ট শুরু হয়েছে কি না। চায়ের দোকানে যথারীতি ভিড়, বগলে থলি চেপে লোকেরা বাজার যাচ্ছে, ট্রাম স্টপে দু-একজন, ফুটপাথে কাগজওলা, সেলুনে দাড়ি কামাচ্ছে দুটো লোক, রিকশায় বাসিচোখে একটি বেশ্যা, মনোহারি দোকানটা আধখোলা, কিন্তু ছুতোর দেখতে পেল না তারক।
‘কাগজে লিখেছে, কাল শ্যামবাজারে ফায়ারিং হয়েছে।’ পাড়ারই এক প্রবীণ বাজার সেরে হন হন করে যেতে যেতে তারককে দেখে, না থেমেই বলল এবং অপেক্ষা না করেই আবার বলল, ‘বাজারে একদম মাছ নেই।’
লোকটার পিছনের দিকে তাকিয়ে তারক অস্ফুটে বলল, ‘তাই নাকি!’ এবং ভাবল তাহলে কি ছুতোর পাওয়া যাবে না? নাকি এত সকালে ওরা বেরোয় না। বরং কোনো কাঠগোলায় খোঁজ নিলে হয়।
তারক এলাকার সমস্ত রাস্তা দিয়ে, মনে মনে, দ্রুত হাঁটতে শুরু করল দু-ধারে তাকিয়ে। নেই, নেই, নেই। একটার পর একটা রাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে, চোখে পড়ছে না। সে ক্রমশই দমে যেতে শুরু করল। এভাবে খুঁজতে খুঁজতে সে কলকাতা কর্পোরেশন এলাকার কিনারায় পৌঁছে ভাবল, এখন যদি পাই তা হলে ধরে আনতে আনতেই তো এক ঘণ্টা কেটে যাবে। ততক্ষণে রেণুকে নিয়ে বাবা পৌঁছে যেতে পারে যদি ট্যাক্সিতে আসে।
রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে তারক ফিরতে শুরু করল অন্য পথ দিয়ে। পাঁচটা পুলিশ রাইফেল দেওয়ালে ঠেকা দিয়ে চা খাচ্ছে। সাদা পোশাকপরা অফিসারটি ফুটপাথে সম্ভবত চায়ের দোকানেরই চেয়ার পেতে বসে। তারক লক্ষ করল, লোকটা তাকে দেখছে। ভয় করল তার। গ্রেপ্তার করে যদি! মিছিলে শ্লোগান দিয়ে হাঁটার খবর হয়তো জানে। পায়খানায় যেতে পারছে না বলে হয়তো তিরিক্ষে হয়ে রয়েছে। যদি ধরে নিয়ে যায়, তাহলে অনিতাকে আর রক্ষে করা যাবে না। রেণু ওকে শেষ করে দেবে। তারপরই মনে হল, ইঞ্জেকশন নেওয়াই তো বন্ধ হয়ে যাবে!
মনে পড়া মাত্র অজান্তেই চোখ চলে গেল রাস্তার অপর পারে অহীনের ওষুধের দোকানটার দিকে।
অহীন দোকানের দরজায় দাঁড়িয়ে এমন একটা লোকের সঙ্গে কথা বলছে, যার পায়ের কাছে একটি থলি এবং সেটির দড়িবাঁধা মুখের থেকে করাতের ডগা বেরিয়ে।
‘একে কি তুই ডেকেছিস?’ তারক ছুটে রাস্তা পার হয়ে এসে বলল। ‘আমার ভাই ভীষণ দরকার, আমি নিয়ে যাই, পাঁচ মিনিটের কাজ, একটা কড়া খুলে দেবে দরজা থেকে, নইলে খুব মুশকিলে পড়ব।’
কাতর স্বরে তারক অনুনয় করল যথাসম্ভব এক নিশ্বাসে। অহীন আশ্চর্য হয়ে পড়ল বটে কিন্তু প্রভাবিত হয়েছে কি না বোঝা গেল না। ঠান্ডা, শুকনো গলায় সে বলল, ‘আমারও খুব দরকার। আগে আমারটা হয়ে যাক, তারপর নিয়ে যেয়ো।’
‘বিশ্বাস কর, আমার খুব বিপদ হবে যদি এক্ষুনি দরজা না খুলতে পারি। একটা মেয়ে আটকা পড়েছে ঘরে। পাঁচ মিনিট, মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য।’
অহীন ঈষৎ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কাল রাতে বই আর জুতোর দুটো দোকান লুঠ হয়েছে। আমার জানলার দুটো কবজা একদম ভাঙা।’
‘লুঠ হলে দিনে তো আর হবে না। আমি তো বলছি পাঁচ মিনিটের ব্যাপার। কিগো কতক্ষণ লাগবে একটা কড়া খুলতে?’
ছুতোর মিস্ত্রিটি একটি সামগ্রী হয়ে এতক্ষণ দুই খদ্দেরের কষাকষি শুনছিল। নিজেকে জাহির করার সুযোগ পেয়ে ভারিক্কি চালে দু-দিক বাঁচিয়ে বলল, ‘না দেখে কী করে বলি কতক্ষণ লাগবে। তবে এ বাবুর কাজ বেশিক্ষণ লাগবে না।’
‘আচ্ছা, আচ্ছা, তুমি কাজ শুরু কর তো।’ একজন রোগী আসতেই অহীন ঝামেলাটা শেষ করে দিতে চাইল, ‘আমার কাজটা হয়ে গেলেই তুমি নিয়ে যেয়ো।’
অহীন তুই ইলেকশনে দাঁড়া আমি তোর হয়ে দোরে দোরে গিয়ে ভোট চাইব, পোলিং এজেন্ট হব, পঁচাত্তরটা ফলস ভোট দোব। শুধু এই ছুতোরটাকে ছেড়ে দে পাঁচ মিনিটের জন্য-এই বলে যদি ওর পায়ে আছড়ে পড়ি! তারক ভাবল, তাহলে কেমন হয়!
