‘তুমি!’
‘তাহলে আমি বলছি, ও মেয়েটির এ বাড়িতে রাত কাটানো চলবে না। এরপর কোনো কথা আর শুনতে চাই না।’ বঙ্কুবিহারী হাত তুলে দরজা দেখিয়ে দিল।
‘বাড়ি তোমার ঠিকই, কিন্তু আমি টাকা দিয়েই বাস করি। আমার রাইট আছে যাকে খুশি আনার।’ তারক রাগে থরথরিয়ে কেঁপে উঠল।
‘রাইট! মাসে মাসে ক-টা টাকা দিলেই বুঝি রাইট জন্মায়? আমি যদি গলাধাক্কা দিয়ে বার করে দি, পারিস তুই আইনের সাহায্য নিয়ে এ বাড়িতে ঢুকতে? পারবি তোর ওই ক-টা টাকা মাইনেয় ঘর ভাড়া করে বউ-ছেলেদের নিয়ে থাকতে? দশদিনও তো কুলোবে না।’
‘কে বলেছিল আমার বিয়ে দিতে?’ তারক বুঝছে সে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। তাই প্রসঙ্গান্তরে যাবার সামান্য সুযোগ পেয়েই গলা চড়িয়ে নিজের উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বাইরে টেনে নিয়ে গিয়ে বলল, ‘কেন একটা আকাট নির্বোধের সঙ্গে বিয়ে দিলে? তুমি দায়ী, তুমিই বদমাইশি করে এই বিয়ে দিয়েছ।’
‘ছেলেমেয়ে যুগ্যিমন্ত হলে বাবা-মা তাদের বিয়ে দেয়, এটাই নিয়ম, এর মধ্যে বদমাইশির কী আছে! তুই কী কচিখোকা ছিলি? বছর ঘুরতে-না-ঘুরতেই তো বাবা হলি।’
তারক জবাব দেবার ভাষা খুঁজে পেল না বঙ্কুবিহারীর এই অকাট্য বিদ্রুপের। বিশৃঙ্খল আবেগ দপদপ করে উঠল তার মাথার মধ্যে। স্নায়ুগুলো পোড়া কাগজের মতো গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। নিজেকে অবিলম্বে সে স্তূপীকৃত ভস্মরাশিতে পরিণত হতে দেখছে। হতাশ ক্ষীণ কণ্ঠে সে বলল, ‘আমার কাছে ব্যাপারটা একদমই নতুন ছিল। বাবা, তুমি তো বিবাহিত, নিশ্চয় বুঝবে তখন কীরকম উত্তেজনা হয়। আমিতো একটা মানুষ, কত সামলাব, কীভাবে সম্ভব?’
ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে ছুটে এল বঙ্কুবিহারী। তারকের মুখের কাছে মুখ এনে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘মানুষ! তুই একটা মানুষ! তিনমাস কাছে বউ নেই আর অমনি একটা মেয়েকে এনে ঘরে তুলেছিস। মুরোদ যে কত জানা আছে। দ্যাখ, আমাকে দ্যাখ।’ বঙ্কুবিহারী টানটান হয়ে চিতিয়ে দাঁড়াল। ‘তোর মা মরার পর থেকে বারো বছর একইভাবে কাটিয়ে দিলুম। অথচ আমিও একটা পুরুষ। পারি, বুঝলি, অনেক সইতে পারি। আর তুই?’
‘আমি কী?’
উত্তর দেবার জন্য বঙ্কুবিহারী কয়েক মুহূর্ত সময় নিল। তারমধ্যেই তারকের ডান হাতটি ক্লান্ত ভঙ্গিতে উদ্যত হল এবং অশেষ শ্রম-সহকারে নামিয়ে এনে বঙ্কুবিহারীর মুখে জোরে আঘাত করল। তারপর মৃদু চাপাকণ্ঠে সে বলল, ‘আমি জানি, আমি কী।’ একথা বলার পর তার মনে পড়ল ঘুরে পড়ে যাবার সময় বঙ্কুবিহারীর মুখ চাপা হাসিতে উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তারক কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকল। তখন ধীরে ধীরে একটা অদ্ভুত অনুভব তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তার মনে হতে লাগল, প্যাড পরে যেন সে অপেক্ষা করছে। যেকোনো মুহূর্তে এবার তাকে মাঠে নামতে হবে। এখন সে এগারোজনের একজন। এখন সে স্টেডি ওয়ান ডাউন ব্যাটসম্যান টি. সিনহা।
তারক নিজের ঘরে ঢুকে দেখল খাটের বাজু ধরে অনিতা কাঠের মতো দাঁড়িয়ে। গম্ভীর স্বরে তারক বলল, ‘তোমার তো এখনও কিছু খাওয়া হয়নি।’
‘আমি চলে যাই বরং।’ ফিসফিস করে অনিতা বলল।
‘কেন?’
‘আমার এখানে আসা উচিত হয়নি। আমি জানতাম না যে-।’
‘কী জানার আছে তোমার?’ তারক ধমকে উঠল। ‘যা বলছি তাই করো। দরজায় খিল দিয়ে শুয়ে পড়ো। সকালে তোমায় সলিলের বাড়ি নিয়ে যাব। তারপর দেখা যাক কী হয়।’
ঘর থেকে বেরিয়ে তারক নিজেই দরজাটা বন্ধ করে দিল। নীচে নেমে এসে দেখল দেবাশিস ঘুমিয়ে পড়েছে। আলো নিভিয়ে চেয়ারে বসে তারক ছোটো টেবলটায় পা তুলে দিল। দরজাটা খোলা। নতুন রান্নাঘরের সদ্য কলি হওয়া দেওয়ালটা অন্ধকারে ওর চোখের সামনে ফ্যাকাসে আস্তরণ ধরে রেখেছে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে সে ভাবল, এই হচ্ছে বঙ্কু সিঙ্গির মুরোদ। শুধু ফিল্ডিংই খেটে যাবে, আর গলাবাজি করবে-সইতে পারি, অনেক সইতে পারি। একটিও ক্যাচ না ফেলে, লোকের হাততালি কুড়িয়ে, শেষমেশ, দারুণ এক টুয়েলফথম্যান হিসেবে নাম কিনে একদিন লক্ষ লক্ষের ভিড়ে বঙ্কু সিঙ্গি মিলিয়ে যাবে।
ভোরে দেবাশিস যখন ঘুম ভাঙাল তখনও তারকের ঠোঁটে হাসিটা লেগেছিল। কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে তারক লাফিয়ে উঠল। কাল থেকে জামাটা পর্যন্ত খোলা হয়নি। দেবাশিস খানিকটা ইতস্তত করে বলল, ‘বড়োবাবু এইমাত্র বেরিয়ে গেলেন। বললেন, দক্ষিণেশ্বর যাচ্ছি বউদিকে আনতে। আর আপনার ঘরে তালা দিয়ে গেছেন।’
কথা না বলে তারক কলঘরে ঢুকল। এবং বেরিয়ে এসে ভাবল ইঞ্জেকশনটা এক্ষুনি নিয়ে নিলে কেমন হয়! তারপরই মনে হল, আমার ঘরে তালা দিয়ে যাবে কেন? অনিতা এত সকালেই চলে গেল না জানিয়ে? কিন্তু সেরকম তো হবার কথা নয়। তাহলে কি ওকে তালা দিয়ে আটকে রেখে গেছে!
ছুটে উপরে এল তারক। প্রায় আড়াই সের ওজনের একটা তালা বন্ধ দরজার কড়ায় লাগানো। দরজাটা ধাক্কা দিয়ে ঠেলতেই আঙুল গলে যাওয়ার মতো পাল্লা দুটি ফাঁক হল। চোখ রেখে তারক শুধু অন্ধকার দেখল। ঘরের সবকটা জানলা বন্ধ।
‘অনিতা, অনিতা।’ তারক চাপা গলায় ডাকল।
‘কী হবে তারকদা?’ ঘরের মধ্যে থেকে অনিতার ভয়ার্ত স্বর শোনা গেল।
‘জানলাগুলো খুলে দাও, কোনো ভয় নেই। তালা এখুনি খুলে ফেলব। তোমায় চাবি দিচ্ছি আগে আলমারি খুলে টাকা বার করে দাও।’
