‘আমার সর্বাঙ্গে ব্যথা তারকদা, বাবা ভীষণ মেরেছে।’ অনিতা কাতর স্বরে ভিক্ষা চাওয়ার মতো ভঙ্গি করল দেহের। তারক চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, ‘ওপরে চলো।’
অনিতা একইভাবে দাঁড়িয়ে। তারক বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কী হল!’
‘আমি সলিলকে এখনও ভালোবাসি।’
‘বেশ তো। কিন্তু তাই বলে সারারাত কি এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। এ ঘরে দেবু ঘুমোয়। তোমার জন্য কী সে ঘুমোতে পারবে না?’
অনিতা আর কথা না বলে তারকের সঙ্গে উপরে এল। বারান্দায় বঙ্কুবিহারী দাঁড়িয়ে।
‘কী ব্যাপার। ও বাড়ি গেলনা যে?’ বঙ্কুবিহারী রীতিমতো বিরক্তি প্রকাশ করল অনিতাকে দেখিয়েই।
‘বাবা আজ এ থাকবে।’
উত্তর না দিয়ে বঙ্কুবিহারী নিজের ঘরে ঢুকে গেল। তারক অপ্রতিভ মুখে অনিতার দিকে তাকাতেই সে বলল, ‘আমি বরং যাই।’
‘কেন?’
‘বোধহয় আপনার বাবা-‘
‘তাতে কী হয়েছে? তুমি আমার ঘরে এস।’
তারক হাত চেপে ধরল অনিতার। বোধহয় হাতে ব্যথা তাই অনিতা যন্ত্রণাসূচক কাতর ধ্বনি করল। তারক গ্রাহ্য না করে ওকে হাত ধরে টেনে নিয়ে এল নিজের ঘরে। আলো জ্বালল।
‘তুমি হঠাৎ ও কথাটা বললে কেন?’ তারক ক্রোধে থরথর কেঁপে উঠল।
‘কোন কথা!’
‘সলিলকে ভালোবাস, এটা বলার কি দরকার ছিল? তুমি আমাকে কী ভাব? দুশ্চরিত্র, পাজি, শয়তান? তোমার এই দুরবস্থার সুযোগ নিতে চাই? অ্যাঁ, জবাব দিচ্ছনা কেন? অ্যাঁ, সবাইকে কি সলিল ভাব নাকি?’
‘তারকদা আপনি ভুল বুঝছেন, আপনি আমায়-‘
‘থাক থাক আর সাফাই গাইতে হবে না। কিন্তু এখন যদি আমি তোমায় কিছু করি, পারবে তুমি আটকাতে আমায়?’
‘কী বলছেন আপনি! আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেল? আমি বরং চলেই যাই।’ অনিতা গম্ভীর হয়ে দরজার দিকে এগোতেই তারক ওর সামনে এসে পথ আটকে দাঁড়াল।
‘তুমি আমায় অপমান করেছ। তোমার মতো একটা কুচ্ছিত থার্ডক্লাশ মেয়ে, ফাঁদ পেতে ছেলে ধরার চেষ্টা করে যে, সে করবে অপমান আর আমি সহ্য করব! কেন কেন বললে গায়ে ব্যথা? ভেবেছ আমি ন্যাকা, কিছু বুঝিনা!’
‘পথ ছাড়ুন। নয়তো আমি চেঁচাব। আমি লোকজড়ো করব।’
‘করো তুমি। আমায় সলিল গুহ পাওনি।’
‘আপনি সলিলের থেকেও জঘন্য। ভেবেছেন কিছু বুঝিনা? যেকোনো মেয়েই মতলব বুঝতে পারে গায়ে হাত দেওয়ার ধরন থেকে। আপনাকে দেখে বিশ্বাস হয়েছিল তাই ভরসা করে এসেছি। কিন্তু আপনি যে এমন লোক সেটা বুঝতে পারিনি। আপনার এখানে থাকা আর নিরাপদ নয়।’
অনিতা কথা শেষ করে তারকের পাশ কাটিয়ে ঘর থেকে বেরোতে যাবে, দু-হাত ছড়িয়ে ওকে বুকের উপর তারক টেনে আনল। তারপর ওর হালকা দেহটি অবলীলায় তুলে এনে খাটের উপর নামিয়ে দিয়ে সিধে হয়ে দাঁড়াল।
অনিতা স্থির চোখে তাকিয়ে রয়েছে। দেহ কঠিন এবং সংকুচিত। তারক উত্তেজনা লুকোবার জন্য নিশ্বাস বন্ধ করেছিল এইবার ধীরে ধীরে ত্যাগ করতে গিয়ে এমন অদ্ভুত একটা শব্দ করল নাক দিয়ে, অন্য কোনো পরিস্থিতিতে যেটা হাসির কারণ হত অনিতার। কিন্তু এখন তার দু-চোখে ভয় ফুটে উঠল। খাট থেকে হুমড়ি খেয়ে তারকের পায়ের উপর পড়ে বলল, ‘তারকদা আমি পারব না। আমায় ছেড়ে দিন, আপনার পায়ে ধরছি, আমি আপনার ছোটোবোন হই তারকদা।’
বিরক্তিতে সারা মুখ দুমড়ে তারক বলল, ‘চুপ করো। যাত্রার হিরোইন সাজতে হবে না আর।’
এইবলে সে মাথানীচু করে অনিতার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ প্রচণ্ড সুখ অনুভব করল। এই মুহূর্তে সে আর লক্ষ লক্ষ লোকের একজন নই, এই বোধ তার মধ্যে সঞ্চারিত হতে শুরু করেছে। এই বোধকে দীর্ঘায়ত করতে হলে অনিতাকে এই ভঙ্গিতে রেখে দিতে হবে। ওকে দয়ার প্রত্যাশী করে রাখতে হবে এবং তা করতে হলে ওকে মুঠোর মধ্যে রাখতে হবে। সেজন্য ওর দুর্বলতম স্থানটিতে কর্তৃত্ব স্থাপন করতে হবে এবং সেটি হচ্ছে সলিলের জন্য ওর ভালোবাসা। দ্রুত এই সব ভেবে নিয়ে তারক গম্ভীর স্বরে, অনেকটা অনুতপ্ত লাঞ্ছনাকারীর অনুকরণে বলল, ‘ওঠো এবার। কাল তোমায় সলিলের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে ওর মা-র সঙ্গে কথা বলব।’
অনিতা মুখ তুলে তাকাল। দু-চোখের ভয় এখন বিস্ময়ের দিকে এগোচ্ছে। এই সময়ই পাশের ঘর থেকে বঙ্কুবিহারী চেঁচিয়ে তারককে ডাকল।
‘ব্যাপার কী?’ তারক ঘরে ঢোকামাত্র বঙ্কুবিহারী মাত্রাতিরিক্ত ঠান্ডা গলায় প্রশ্নটা করল।
তারক সাবধান হয়ে গেল মনে মনে। এই স্বর প্রচণ্ড রাগ চেপে রাখারই ছদ্মবেশ। নিরাসক্ত কণ্ঠে তারক বলল, ‘যা বিপদে পড়ে এসেছে, কী আর করা যায়, থাকুক আজ রাতটা। কাল সকালে পৌঁছে দিয়ে আসব।’
‘থাকবে মানে?’ বঙ্কুবিহারী খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। ‘বাড়িতে একটা মেয়েমানুষ নেই, আর সোমত্থ মেয়ে কিনা রাত কাটাবে! বিদেয় কর, এখুনি বিদেয় কর। ট্রাম বাস এখনও হয়তো বন্ধ হয়নি।’
‘আগে শোন ব্যাপারটা।’ তারক রাগ চাপতে চাপতে ঠিক করল প্রথমেই বঙ্কুবিহারীর কণ্ঠস্বর নামিয়ে আনতে হবে। অনিতা নিশ্চয়ই পাশের ঘরে উৎকর্ণ হয়ে উঠেছে। গলা নামিয়ে তারক বলল, ‘মেয়েটি সত্যিই বিপদে পড়ে এসেছে। নয়তো এত রাতে কেউ এভাবে আসে, নাকি আমিই ওকে রাতে থাকতে বলি। ও আমার ঘরে শুক, আমি বৈঠকখানায় শুচ্ছি।’
‘এ বাড়ি কার?’ বঙ্কুবিহারী ঈষৎ কুঁজো হয়ে শিকার দেখা জন্তুর মতো স্থির চোখে তাকিয়ে, দাঁত চেপে আবার বলল, ‘কে মালিক এ বাড়ির?’
