শোনামাত্র তারক ভাবল পার্কে গিয়ে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে আসি, কতক্ষণ আর অপেক্ষা করবে। যা বলবে তাতো জানিই। কিন্তু গুহকে কিছুতেই বলতে পারব না, বিয়ে করো। বলাবলি করা আমার কাজ নয়। যা পারো নিজেরাই ঠিক করে নাও। আমাকে আর জড়িয়ো না।
‘গোলমাল হয়েছে নাকি শেয়ালদার দিকে?’
‘কোথায়! ট্রাম-বাস তো চলছে।’
‘আর দেরি করিসনি, ওকে তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে বল, রাত হয়েছে। দেবুকেও তো শুতে হবে।’
তারক মুখে বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে বাড়ি ঢুকল। বৈঠকখানার দরজা থেকেই সে দেখতে পেল টেবলে রাখা বাহুতে কপাল ঠেকিয়ে অনিতা কুঁজো হয়ে বসে। ওর পিছনে এসে তারক বলল, ‘কী ব্যাপার, এত রাতে আবার কী দরকার পড়ল?’
চমকে অনিতা উঠে দাঁড়াল। তারকের হাবভাবে অভ্যর্থনার লেশ না পেয়ে হাসবার চেষ্টা করল কোনোক্রমে।
‘দরকার একটু পড়েছে তারকদা। আমি ভীষণ মুশকিলে পড়ে গেছি, কী করব ভেবে পাচ্ছি না।’
ওর গলার স্বরে তারকের অস্বস্তি হল। মুশকিলে যাতে না জড়াতে হয় সেজন্য সাবধান হবার চেষ্টায় কবজিটা তুলে ঘড়িতে চোখ রেখে বলল, ‘বলে ফেল।’
‘আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।’
‘কে?’
‘বাবা মা, সবাই।’
তারক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মাত্র। গুহ পরশু দিন ঠিক এইরকমই ধাক্কা দিয়েছিল উপরের ঘরে। ঠিক এইভাবেই তখন সে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
‘কেন?’ কোনোক্রমে তারক বলতে পারল।
‘সলিল বিকেলে গেছল। আমাকে বলল বিয়ে হতে পারে না, তুমি বরং অন্য কাউকে বিয়ে কর!’ দ্রুত উত্তেজিত কথাগুলো অনিতার মুখ থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল। ‘শুনে থ হয়ে গেলুম। ও যে মুখের ওপর স্পষ্ট একথা বলবে ভাবতে পারিনি। কারণ জানতে চাইলুম, বলল তোমার সম্পর্কে আমার কোনো আগ্রহ নেই, বিরক্ত বোধ করি, বিয়ে হলে কেউই সুখী হব না তাই দুজনের স্বার্থেই এ বিয়ে হওয়া উচিত নয়। শুনে আমার ভীষণ রাগ হয়ে গেল, বললুম তাহলে আমার এই অবস্থা করলে কেন? ও কী বলল জানেন?’
অনিতা এমনভাবে তাকাল যেন, আশা করছে তারক বলে দেবে বা অন্তত ঘাড় নেড়েও জানাবে সলিল কী বলেছিল। কিন্তু তারক গোটা শরীরটাকে জিজ্ঞাসা করে দাঁড়িয়ে থাকল।
‘এই অবস্থা যে আমিই করেছি তার প্রমাণ কী, অন্য কেউও তো করতে পারে। ঠিক এই কথাই ও বলল, ঠিক এই কথাগুলো।’
অনিতা হাঁপাচ্ছে। তারক ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে ধাক্কা সামলাতে। বিমূঢ় না হয়ে বরং তার মাথা গরম হয়ে উঠতে লাগল সলিলের এই কথাটায়। রান নেবার জন্য ডাক দিয়ে তারপর রান আউট করে দেবার মতো ব্যাপার।
‘এমন নোংরা কথা ও বলবে আমি ভাবতেও পারিনি তারকদা। আজ চার বছর আমাদের পরিচয়। কত কথা, কত চিঠি। ওকে ছাড়া আমি আর কিছু জানি না, পৃথিবীর আর কাউকে জানি না, সত্যি বলছি, অথচ এমন জঘন্য অপবাদ দিল! আমার কাছে ওর সব চিঠিই আছে এই দেখুন।’
চামড়ার থলিটা খুলছে দেখে তারক নিষেধ করল, কিন্তু শুনল না। দোমড়ানো একটা চিঠি বার করে অনিতা বলল, ‘আপনি পড়ে দেখুন কী লিখেছিল। মাত্র দেড় বছর আগের চিঠি-তোমায় বিয়ে করব, যত বাধাই আসুক না; আমরা ঘর বাঁধব আলাদা, দুটির বেশি ছেলেমেয়ে আমাদের হবে না, এমনকী তাদের নাম পর্যন্ত কী রাখা হবে তাও, তাও ওতে লেখা আছে।’
অনিতার চোখ দিয়ে টপটপ জল পড়ল। তারক সমবেদনায় ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। বুকের মধ্যে গর্ত খোঁড়া চলেছে। গাঢ় স্বরে বলল ‘একটা বদমাস।’
‘বলেছিল আমায় না পেলে বাঁচবে না।’
চিঠি এগিয়ে ধরা অনিতার হাতটা তারককে বাধ্য করল স্পর্শ করতে। তার মনে হল ভারী কোমল এবং উষ্ণ এই হাত যার ছোঁয়ায় প্রথম যৌবন বিচ্ছুরিত হয়। দরজার বাইরে দিয়ে কে চলে গেল। অনিতার হাত ছেড়ে তারক বলল, ‘তাড়িয়ে দিয়েছে, কেন?’
‘আমাদের কথা সবই আড়াল থেকে বড়দি শুনেছিল! ওর জন্য এক পাত্র পাওয়া গেছে, দোজবরে। বাবা অফিস থেকে ফিরতেই তাকে সব বলে দেয়?’
‘কী বলে দেয়?’
‘সলিল বলেছিল প্রুভ করতে পারবে না আমিই এর জন্য দায়ী। তাইতে বলি, অ্যাবোর্সন আমি করাব না, তোমাকে বিয়ে করতেই হবে। আমারও মাথার ঠিক ছিল না, আরও অনেক কিছু তখন বলেছিলুম। ও চলে যাবার পরই বড়দি মেজদি আর মা আমাকে ঘিরে ধরে। শেষপর্যন্ত সব কথা খুলে বলতেই হয়। বড়দি কাঁদতে শুরু করে, জানাজানি হলে তো ওর বিয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। বাবা অফিস থেকে ফিরে আমাকে-‘
অনিতা মুখে হাত চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল। তারক ওর পিঠে হাতের বেড়া দিয়ে কাছে টেনে বলল, ‘কেঁদো না।’ আর কী বলবে সে ভেবে পাচ্ছে না। চুলের গন্ধ আসছে। মাথাটা বুকে ঠেকানো। নিশ্বাসের সঙ্গে দেহটাও কাঁদছে।
ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন হতে শুরু করল তারক। ওর মনে হল অনিতা এইবার পড়ে যাবে অতএব ওর নিতম্বের পিছনে উরু দ্বারা একটা আগল তৈরি করা দরকার। এবং ওর শিরদাঁড়ার সেই ফুলে ওঠা গ্রন্থিটিকে পিটিয়ে গুঁড়ো করে ফেলতে হবে মিহি পাউডারের মতো। একটা কাঁকরও যেন না থাকে।
‘তারকদা, আমি-‘
অনিতা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল তারকের মুখের দিকে। তারক হাতটা কোমর থেকে তুলে নিল।
‘আমার সর্বাঙ্গে ব্যথা। দরজা বন্ধ করে মুখ বেঁধে বাবা মেরেছে। আমি শুধু আজ রাতটুকু থাকব। শুধু রাতের মতো আশ্রয় চাই। কাল ভোরেই চলে যাব।’
‘কোথায় যাবে?’ তারকের কণ্ঠস্বর উত্তেজনায় ঘড়ঘড় করছে।
